উনবিংশ শতকের শেষ প্রান্তে এসে বঙ্গভূমির চিন্তার দিগন্তে যখন গভীর সংশয়ের মেঘ ঘনিয়ে আসছিল, যখন জ্ঞানের প্রখর আলোকরশ্মি শুধু প্রতিষ্ঠিত মার্গ-সাহিত্যের শিখরকেই ছুঁয়ে যেত, ঠিক তখনই প্রাচ্যের এক নিভৃত জনপদ থেকে উঠে এলেন রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন- যার আবির্ভাব ছিল কালের নদীর বিপরীতে এক প্রবাহ-প্রতিরোধী বাঁধ রচনা। তার জন্ম যেন ছিল মাটির গভীরে প্রোথিত সহস্রাব্দের লুকানো ইতিহাসের কণ্ঠস্বর পুনরুদ্ধারের এক অলিখিত অঙ্গীকার। তিনি শুধু গবেষক ছিলেন না; ছিলেন লোকায়ত প্রাণের অমর স্থপতি, যিনি অন্তর্নিহিত আর্তি ও জীবনকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়ে, আধুনিক মননের জটিল জিজ্ঞাসার সঙ্গে যুক্ত করে দেন।
দীনেশচন্দ্র সেনের পথচলা শুরু হয় গতানুগতিক পেশাগত ধারা অনুসরণ করে, কিন্তু তার অন্তরজুড়ে ছিল এক ভিন্ন তপস্যা। তিনি পণ্ডিতদের তৈরি করা গ্রন্থের দুর্গে নিজেকে আবদ্ধ রাখলেন না। বরং কোমরে গামছা বেঁধে, পথে পথে ঘুরে বেড়ালেন। সেই যুগ ছিল অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, সংগ্রাহকদের অবিশ্বাস আর ঔপনিবেশিক আমলাদের উপহাসের যুগ। মাসের পর মাস তিনি লোকালয়ে ঘুরেছেন, বর্ষার কর্দমাক্ত পথ হেঁটেছেন, লোকমুখে ফেরা পুঁথি সংগ্রহের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছেন। তার বিশ্বাস ছিল, ইতিহাস সঞ্চিত আছে লোকমুখে ফেরা কিংবদন্তি আর লোকপুরাণের মধ্যে। তার এ কঠোর পরিশ্রম ছিল ঔপনিবেশিক প্রথাগত জ্ঞানের বিপরীতে এক শারীরিক ও দার্শনিক জেদ। এ তপস্যার ফল হিসেবে ১৮৯৬ সালে এল তার প্রথম আলোর রেখা- ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’। এ গ্রন্থে তিনি কেবল সাহিত্যক্রম সাজাননি, বরং ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে প্রমাণ করলেন যে, আমাদের বাংলা ভাষা সরাসরি সংস্কৃতের থেকে আসা কোনো ‘বিকৃত রূপ’ নয়; বরং এটি তার নিজস্ব ধারায় স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছে। রবীন্দ্রনাথ যখন এ গ্রন্থে ‘পুঁথি-পাথরের মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ করার শিল্পকর্ম দেখেছিলেন, তখন তিনি বুঝেছিলেন, দীনেশচন্দ্র ইতিহাসের নির্জীব কঙ্কালকে রক্ত-মাংসে জীবন্ত করে তুলেছেন।
তার মৌলিক সাহিত্যকর্মেও চিন্তার সেই বিদ্রোহের ছাপ সুস্পষ্ট। গবেষণা ও সংগ্রহের কঠিন কাজের বাইরে তিনি রচনা করেছেন বেশ কিছু উপন্যাস ও ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা, যা উচ্চ মার্গ-সাহিত্যের ছাঁচ থেকে বেরিয়ে এসে সামাজিক সত্যকে তুলে ধরে। তার রচিত কালজয়ী আত্মজীবনী ‘ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য’- যা কেবল স্মৃতিকথা নয়, বরং উনিশ শতকের শেষ প্রান্তের এক সমাজ ও মনন-ইতিহাসের দলিল হিসেবে বিবেচিত। এ ছাড়া, তার উপন্যাস ‘উপেক্ষিত পতিতা’ (১৯২৩)-এ সমাজের প্রান্তিক ও অদেখা নারীদের জীবন নিয়ে তিনি যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, তা তার প্রথা ভাঙার সাহস এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে প্রমাণ করে। এ মৌলিক সাহিত্যকর্মগুলো ছিল তার প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্রোহের আবেগিক প্রতিচ্ছবি, যা তাকে কেবল ইতিহাসবিদ নয়, একজন মৌলিক সমাজ-দ্রষ্টা হিসেবেও প্রতিষ্ঠা
তার কাজের মূল সুরটি ছিল অত্যন্ত রাজনৈতিক। তিনি অভিজাত সাহিত্যের বিপরীতে গিয়ে পূর্ববঙ্গীয় সংস্কৃতি ও তার স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরলেন। তিনি একদিকে ব্রিটিশ সরকারের ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি ধারণ করলেন, যা ছিল তার কৌশলগত মুখোশ, অন্যদিকে সেই ঔপনিবেশিক ক্ষমতার জ্ঞানকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানালেন। তার সমসাময়িক পণ্ডিতরা যখন উচ্চ সংস্কৃত সাহিত্য চর্চা করে সম্মান অর্জন করতেন, তখন লোকসাহিত্যের মতো ‘নিম্নবর্গের’ বিষয়ে কাজ করে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক তিরস্কারের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। এই আন্তঃসংঘাতের অন্তর্দহন সত্ত্বেও, এ কৌশল ব্যবহার করেই ১৯০৫ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকসাহিত্যকে ক্লাসিক্যাল মর্যাদা দিলেন- যা ছিল ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সুচিন্তিত প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্রোহ।
তবে দীনেশচন্দ্র সেনের অমরত্বের স্বাক্ষর হলো ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’ এবং ‘পূর্ববঙ্গ-গীতিকা’ উদ্ধার। তিনি এ লোকগাথাগুলোর সরলতা, প্রেম ও বিরহের গভীরতাকে পৃথিবীর বিখ্যাত মহাকাব্য ‘হোমারের মহাকাব্যে’র সঙ্গে তুলনা করলেন। এই কৌশলটি ছিল এক ধরনের বিপরীত প্রাচ্যবাদ- বিদেশি মানদণ্ড দিয়েই দেশীয় শিল্পের বিশ্বজনীন মূল্য প্রতিষ্ঠা করা। এই গাথাগুলোর মধ্যে যখন একতারার করুণ সুর এবং নৌকার পাল তুলে পালানো বিদ্রোহী নারী চরিত্রগুলোর (যেমন মহুয়া, মলুয়া) গল্প প্রকাশিত হলো, তখন তা কেবল বিদ্রোহ ছিল না; তা ছিল জীবনের মৌলিক সত্যের কাছে আত্মসমর্পণের কাব্য। হোমারের মহাকাব্য সময়ের সঙ্গে লড়েছে; কিন্তু এই গীতিকাগুলো লড়েছে মানুষের চিরন্তন হৃদয়ের দুঃখ-বেদনার সঙ্গে। তার এ সংকলন সম্পর্কে রোমাঁ রোলাঁর মতো ব্যক্তিত্ব মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘এই গাথাগুলোর বিরহ ও গভীরতা গ্রিক ট্র্যাজেডির মতোই মর্মস্পর্শী।’
দীনেশচন্দ্র সেনের এ অন্বেষণ আজকের দিনের Indigenous Knowledge Systems (IKS) বা আদিবাসী জ্ঞান ব্যবস্থার সংরক্ষণের বৈশ্বিক আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। তার দর্শন আমাদের শেখায় যে, প্রান্তিক মানুষের জ্ঞানও উচ্চ-একাডেমিক গবেষণার উপাদান হতে পারে। তার কাজ ‘পাঠ্যক্রমকে উপনিবেশমুক্ত করা' (Decolonizing the Curriculum) আন্দোলনেরও এক প্রাক্-আলো।
১৯৩৯ সালের ২০ নভেম্বর তার মহাপ্রয়াণ ঘটলেও, তার রেখে যাওয়া দর্শন আজও আমাদের পথ দেখায়। আজকের এ তথ্য ও খণ্ডনের যুগে যখন আমাদের সাংস্কৃতিক শেকড়গুলো প্রযুক্তির দ্রুত স্রোতে নড়ে যাচ্ছে, তখন দীনেশচন্দ্রের সেই আদিম ক্ষেত্র-গবেষণা এক স্মৃতির নোঙর হিসেবে কাজ করে। তার কাজটি কেবল অতীত নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের দিকে তাকানো এক গভীর আয়না। তার হাতে গড়া লোকায়ত ঐতিহ্যের অমর স্থাপত্যের দিকে তাকালে এক গভীর সত্য প্রতিধ্বনিত হয়। দীনেশচন্দ্র যে সরল একতারার সুরকে বিশ্বের মহাকাব্যের আসনে বসালেন, সেই আপন সুরের মহিমাকে জানার জন্য বহিরাগত স্বীকৃতির দ্বারস্থ হওয়ার আর প্রয়োজন নেই। আমাদের আত্মপরিচয় আমাদের নিজেদের গল্প বলার অধিকারের মধ্যেই চিরকাল সুরক্ষিত, আর মাটির প্রতি আমাদের অনাদায়ী ঋণ রয়েছে, যা পরিশোধের দায়িত্ব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বর্তায়।
লেখক: বাহাউদ্দিন গোলাপ, ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]