রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মধ্যে রয়েছে মুমিন-মুসলমানের উত্তম আদর্শ। আল্লাহকে পাওয়া এবং জান্নাতে যাওয়ার পাথেয়। একজন মুমিনের কথাবার্তা কেমন হবে, কেমন হবে তার সম্বোধন—তার উত্তম দৃষ্টান্ত রয়েছে তাঁর জীবনে। কথাবার্তার ক্ষেত্রে তার আদর্শই চূড়ান্ত আদর্শ। কারণ তিনি ছিলেন ‘জাওয়ামিউল কালিম’ (অর্থাৎ শব্দ কম অর্থ ব্যাপক এমনভাবে কথা বলতেন তিনি)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ধীরেসুস্থে কথা বলতেন। প্রতিটি শব্দ পৃথকভাবে বলতেন। বিরামহীন দ্রুতগতিতে কখনো কথা বলতেন না। তাঁর কথা ছিল স্পষ্ট। শ্রবণকারী প্রত্যেকে তাঁর কথা সহজে বুঝতে পারত। কারও কাছে দুর্বোধ্য বা গোলাটে লাগত না। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তোমাদের মতো দ্রুতগতিতে কথা বলতেন না; বরং তিনি ধীরেসুস্থে পৃথকভাবে স্পষ্ট করে কথা বলতেন। তাঁর কাছে বসা প্রত্যেকেই তা আয়ত্ত করতে সক্ষম হতো।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৩৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথায় কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ থাকত না। পৃথক পৃথক ও সুস্পষ্ট হওয়ার কারণে প্রত্যেকেই তা আয়ত্ত করতে সক্ষম হতো। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা ছিল পৃথক পৃথক; শ্রবণকারী প্রত্যেকেই বুঝতে সক্ষম হতো।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা শ্রোতার কাছে সুস্পষ্ট হতো এবং সে গুনতে চাইলে গুনতে পারত। এ জন্য তাঁর কথা মুখস্থ করা এবং আয়ত্ত করা সহজ ছিল। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) এমনভাবে কথা বলতেন, যদি গণনাকারী গুনতে চাইত, তা হলে গুনতে পারত।’(বুখারি, হাদিস: ৩৫৬৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্রুতগতিতে কথা বলতেন না। উরওয়া (রহ.) থেকে বর্ণিত, আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আবু হুরাইবার বিষয়টি তোমার কাছে আশ্চর্য লাগে না! সে আমার কামরার পাশে বসে আমাকে শুনিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করে। আমি নফল নামাজ পড়ছিলাম, আমার নামাজ শেষ হওয়ার আগেই সে উঠে চলে গেছে। না হলে আমি যদি তাকে পেতাম, প্রতিবাদ করতাম। নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ (সা.) তোমাদের মতো দ্রুতগতিতে কথা বলতেন না।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৪৯৩)
উল্লিখিত হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়, কথাবার্তার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ হলো, দ্রুতগতি পরিহার করে ধীরেসুস্থে পৃথকভাবে সুস্পষ্ট করে কথা বলা, যাতে প্রত্যেক শ্রবণকারীই তা সহজে আয়ত্ত করতে পারে। কেননা তার কথায় শব্দ কম হতো, অর্থ ব্যাপক হতো।
শায়খ ইবনে উসাইমিন (রহ.) বলেন, ‘খুতবা পাঠের সময়, কথা বলার সময় প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য উচিত ধীরেসুস্থে পৃথকভাবে সুস্পষ্ট করে কথা বলা; যেন শ্রবণকারী অনায়াসে বুঝতে সক্ষম হয়।’ (শামায়েলে তিরমিজি, ইমাম তিরমিজি, ব্যাখ্যা: মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩২০)
কঠিন অথবা দুর্লভ শব্দ হলে কিংবা শ্রোতার সংখ্যা বেশি হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায় কথা তিনবার বলতেন। দুইবার পুনরাবৃত্তি করতেন। প্রয়োজন ছাড়া তিনি কথার পুনরাবৃত্তি করতেন না। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো কথা তিনবার পুনরাবৃত্তি করতেন, যেন বুঝতে সহজ হয়।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৪০)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক