পাপ ছোট হোক বা বড়, সব সময় বর্জনীয়। পাপের চূড়ান্ত শাস্তি আখেরাতে হলেও অনেক সময় দুনিয়াতেও আল্লাহতায়ালা শাস্তি দিয়ে থাকেন। পাপী তার পাপের শাস্তি ভোগ করবে—এটা ন্যায়বিচারের দাবি। কেউ যদি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে পাপকাজে লিপ্ত হয় এবং তার প্রসার ঘটায়; তবে দুনিয়া ও আখিরাতে তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। মহান আল্লাহ বলেন—‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্মন্তুদ শাস্তি এবং আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা নুর, ১৯)
কোরআন এবং হাদিসে হারাম ও পাপকর্মের ভয়াবহ শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার এই পাপের শাস্তি শুধু আখিরাতেই সীমাবদ্ধ নয়; কিছু কিছু পাপের শাস্তি আল্লাহতায়ালা দুনিয়াতেও দিয়ে থাকেন। দুনিয়ার শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য এক প্রকার সতর্কতা, যাতে মানুষ অনুতপ্ত হয়ে তার পথে ফিরে আসে। এমন কিছু পাপের বিবরণ তুলে ধরা হলো, যার শাস্তি পৃথিবীতে দেওয়ার কথা কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
ব্যভিচার: যে কোনো প্রকারের যৌন ক্রিয়াকলাপ, যা বৈধ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ব্যতীত সম্পাদিত হয়, সেগুলো জেনা বলে গণ্য হবে এবং তা পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য সমানভাবে শাস্তিযোগ্য। এ জন্য আল্লাহতায়ালা ব্যভিচারের কাছেও যেতে নিষেধ করেছেন। কোরআনে কারিমে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। তা একটি অশ্লীল কাজ এবং খারাপ পন্থা।’ (সুরা বানি ইসরাইল , ৩২) আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘(অবিবাহিত) ব্যভিচারী পুরুষ ও ব্যভিচারিণী নারী উভয়কে ১০০ করে বেত্রাঘাত করো।’ (সুরা নুর, ২)
ওজনে কম দেওয়া: আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ধ্বংস যারা পরিমাপে কম দেয় তাদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়।’ (সুরা আল-মুতাফফিফিন, ১-৩)
অন্য জায়গায় আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মেপে দেওয়ার সময় পূর্ণ মাপে দেবে এবং সঠিক পাল্লায় ওজন করবে। এটি উত্তম, এর পরিণাম শুভ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, ৩৫) আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা ওজনে বা মাপে কম দেয়, তখন শাস্তিস্বরূপ তাদের খাদ্য-শস্য উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দুর্ভিক্ষ তাদের গ্রাস করে।’ (আত-তারগিব, ৭৮৫) অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘যে জাতি মাপে ও ওজনে কম দেয়, তাদের রিজিক উঠিয়ে নেওয়া হয়।’ (মুয়াত্তা মালেক, ৫৩৭০)
অবিচার বা জুলুম: আল্লাহতায়ালা জালিমদের জন্য জাহান্নামে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। যা তাকে গ্রহণ করতেই হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি জালিমদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছি। যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে থাকবে। তারা পানি চাইলে তাদেরকে দেওয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানি। যা তাদের মুখমণ্ডল পুড়িয়ে দেবে। এটা কতই না নিকৃষ্ট পানীয় এবং সে জাহান্নাম কতই না নিকৃষ্ট আশ্রয়।’ (সুরা কাহফ , ২৯)। আল্লাহতায়ালা অত্যাচারী ও কারোর ওপর অন্যায়ভাবে আক্রমণকারীর শাস্তি দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। উপরন্তু আখিরাতের শাস্তি তো তার জন্য প্রস্তুত আছেই। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘দুটি গুনাহ ছাড়া এমন কোনো গুনাহ নেই যে গুনাহগারের শাস্তি আল্লাহতায়ালা দুনিয়াতেই দেবেন এবং তা দেওয়াই উচিত; উপরন্তু তার জন্য আখিরাতের শাস্তি তো আছেই। গুনাহ দুটি হচ্ছে, অত্যাচার তথা কারোর ওপর অন্যায়ভাবে আক্রমণ এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী।’ (তিরমিজি, ২৫১১)
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ: আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। অবশ্যই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা বানি ইসরাইল : ৩৪) কারও সঙ্গে কোনো ব্যাপারে চুক্তি বা ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করা আরেকটি কবিরা গুনাহ। তাই তো এ জাতীয় ব্যক্তিকে মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘চারটি দোষ যার মধ্যে থাকবে সে পরিপূর্ণ মুনাফিক। আর যার মধ্যে এসবের একটি দোষ থাকবে, তার মধ্যে মুনাফেকির একটি উপাদান থাকবে, যতক্ষণ সে তা বর্জন না করে; কথা বললে মিথ্যা বলে, আমানত রাখলে খেয়ানত করে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে এবং ঝগড়া করলে সীমা ছাড়িয়ে ফেলে।’ (বুখারি, ৩৪)
লেখক: খতিব, মেইন বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদ, ঝিনাইদহ