আমাদের দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে যৌথ উদ্যোগে পশুপালন একটি অতিপরিচিত দৃশ্য। একজন অর্থ বিনিয়োগ করেন, অন্যজন পশুপালনে শ্রম দেন, আর প্রাপ্ত লাভ উভয়ের মধ্যে বণ্টিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সহজ ও উপকারী পদ্ধতি মনে হলেও, ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিতে এর কিছু শর্ত ও নিয়ম রয়েছে। শরিয়াহসম্মত উপায়ে যৌথ পশুপালনের বৈধ পদ্ধতিগুলো আলোচনা করা হলো-
প্রচলিত দুই পদ্ধতির শরয়ী বিশ্লেষণ
যৌথ পশুপালনের যে দুটি পদ্ধতি সমাজে প্রচলিত তা হলো: প্রথম পদ্ধতি: অর্থ ও শ্রমের যৌথ উদ্যোগ এই পদ্ধতিতে একজন পশুর মূল্য দেন এবং অন্যজন শ্রম দেন। এর পর পশুর খাবার ও অন্যান্য খরচ উভয়ে সমানভাবে বহন করেন। পশু বিক্রির পর মূল পুঁজি প্রথম পক্ষকে ফেরত দেওয়া হয় এবং অবশিষ্ট লাভ চুক্তি অনুযায়ী সমানভাবে ভাগ করা হয়।
শরয়ী বিধান: হানাফি মাযহাব অনুসারে, এই পদ্ধতিটি বৈধ নয়। কারণ, এখানে একজন কেবল পুঁজি দিচ্ছে, আর অন্যজন কেবল শ্রম দিচ্ছে, কিন্তু লভ্যাংশ সমানভাবে ভাগ হচ্ছে। এটাকে এক ধরনের ‘ফাসিদ ইজারাহ’ বা ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি বলা হয়। ইসলামের নিয়ম হলো, কেউ যদি কেবল শ্রম দেয়, তা হলে সে তার শ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাবে। লাভের ভাগীদার তখনই হতে পারবে, যখন তারও পুঁজি বা মালিকানা থাকবে।
এর বিকল্প পদ্ধতি: যদি এই পদ্ধতিতে বৈধতা আনতে চান, তা হলে একটি বিকল্প উপায় আছে। প্রথমে যিনি পশুটি কিনবেন, তিনি তার অর্ধেকাংশ অন্যজনের কাছে বিক্রি করে দেবেন। এতে দুজনেই পশুর সমান অংশীদার হয়ে যাবেন। এর পর তারা উভয়ে মিলে চুক্তির মাধ্যমে পশুটি লালন-পালন করবেন এবং প্রাপ্ত লাভ সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। এই পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ বৈধ।
দ্বিতীয় পদ্ধতি: খরচ ও শ্রমের বিনিময়ে সুবিধা গ্রহণ। এই পদ্ধতিতে একজন পশুর মূল্য দেবেন, আর অন্যজন পশুর খাবার ও দেখাশোনার দায়িত্ব নেবেন। এর বিনিময়ে তিনি পশুর দুধ বা তার থেকে পাওয়া অন্য সুবিধা, যেমন চাষবাসের কাজ, ব্যবহার করতে পারবেন।
শরয়ী বিধান: এই পদ্ধতিটি শর্তসাপেক্ষে শরিয়াতে অনুমোদিত। শর্ত হলো, পশুটিকে অবশ্যই ব্যবহার উপযোগী হতে হবে। এই চুক্তিতে খরচ এবং সুবিধার পরিমাণের মধ্যে সামান্য অস্পষ্টতা থাকতে পারে, কিন্তু সমাজে যেহেতু এ নিয়ে তেমন কোনো ঝগড়া-বিবাদ হয় না, তাই শরিয়াহ এটাকে মানুষের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ রেখে অনুমোদন দিয়েছে। এর একটি উদাহরণ পাওয়া যায় বন্ধক-সংক্রান্ত হাদিসে। রাসুল (সা.) বলেছেন, বাহনের পশু বন্ধক থাকলে তার খরচের পরিমাণ অনুসারে তাতে আরোহণ করা যাবে। তদ্রূপ দুধেল প্রাণী বন্ধক থাকলে তার খরচের পরিমাণ অনুসারে দুধ পান করা যাবে। (সহিহুল বুখারি)
তবে, যদি পশুটি ছোট বা ব্যবহার অনুপযোগী হয়, যেমন- ছোট বাছুর, তা হলে এই পদ্ধতি বৈধ হবে না। কারণ, যে ব্যক্তি খরচ করছে, সে কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। এতে ভারসাম্য নষ্ট হয়। এমন ক্ষেত্রে পশু ব্যবহার উপযোগী না হওয়া পর্যন্ত উভয়ে খরচ ভাগাভাগি করে নেবে।
হানাফি মাযহাবের অনুমোদিত পদ্ধতি
হানাফি মাযহাব অনুসারে পশুপালনে অংশীদারত্বের দুটি বৈধ পদ্ধতি রয়েছে: শ্রমিক-মালিক চুক্তি: একজন ব্যক্তি পশুর মালিক হবেন এবং অন্যজন তার শ্রমিক হিসেবে একটি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে পশুপালনের কাজ করবেন। এক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতির সব দায় মালিকের, আর শ্রমিক কেবল তার নির্ধারিত পারিশ্রমিক পাবেন।
যৌথ মালিকানা: দুজনই পশুর মালিক হবেন। প্রত্যেকে তার মালিকানার অংশ অনুযায়ী লাভ পাবেন। যিনি পশুপালনের কাজ করবেন, তিনি অতিরিক্ত হিসেবে তার শ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিকও গ্রহণ করবেন।
বাকি বা কিস্তিতে পণ্য বিক্রি: কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা প্রাসঙ্গিকভাবে, বাকিতে বা কিস্তিতে পণ্য বিক্রি নিয়ে একটি প্রশ্ন প্রায়ই আসে: দেরিতে মূল্য পরিশোধের কারণে পণ্যের দাম বেশি নেওয়া কি বৈধ?
ইসলামে নগদ ও বাকি উভয় পদ্ধতিতেই পণ্য কেনা-বেচা বৈধ। স্বয়ং নবিজি (সা.) নিজেও বাকিতে পণ্য কিনেছেন। তবে বাকি বা কিস্তিতে বিক্রির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া নিয়ে কিছু মতভেদ আছে।
কিছু ফকিহের মতে: এটি সুদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় হারাম। কারণ এখানে সময়ের বিনিময়ে মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
অধিকাংশ ফকিহের মতে: এটি বৈধ। কারণ, ক্রয়-বিক্রয়ের মূলনীতি হলো বৈধতা, যদি না কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকে। বিক্রেতার পণ্যের মূল্য বাড়ানোর অধিকার রয়েছে এবং এটি সুদ নয়। তবে অতিরিক্ত মূল্য যেন সীমাতিরিক্ত না হয়। ইমাম শাওকানি (রহ.)সহ অনেক ফকিহ এই মতকে সমর্থন করেছেন।
ইসলামি শরিয়াহ মানুষের জীবন সহজ করার জন্যই এসেছে। তাই পশুপালনের মতো লেনদেনেও শরিয়াহ কিছু নিয়ম-কানুন দিয়েছে, যাতে কোনো পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সঠিক নিয়ম মেনে চললে এসব লেনদেন যেমন বৈধ হবে, তেমনি সমাজে আস্থা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক