এক. আসওয়াদ আনাসী
এ ব্যক্তি নবি করিম (সা.)-এর যুগে ইয়ামেনে নবুঅতের দাবি করে। সে প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করলেও পরে মুরতাদ হয়ে যায় এবং তার মুমিনা স্ত্রীকে হত্যা করে। এ সংবাদ পেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইয়ামেনের মুসলমানদের নিকটে পত্র প্রেরণ করেন, যাতে তিনি ভণ্ড নবির বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। মুসলমানরা আসওয়াদ আনাসীর পরবর্তী স্ত্রীর সহায়তায় তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। সে নিহত হলে আল্লাহতায়ালা তাঁর নবিকে স্বপ্নে জানিয়ে দেন। (বুখারি, ৪৩৭৯; আহমদ, ২৩৭৩)
দুই. মুসায়লামা বিন হাবীব আল কাযযাব
সে মনে করত অন্ধকারে তার নিকট ওহি নাজিল হয়। সে নবুঅত ভাগাভাগি করার প্রস্তাব দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট পত্র পাঠিয়েছিল। একবার সে নিজে গিয়েও এই প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিল। ইবনু আববাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে একবার মিথ্যুক মুসায়লামা (মদিনায়) এসেছিল। সে বলতে লাগল, মুহাম্মাদ (সা.) যদি আমাকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিয়োগ করে যায়, তা হলে আমি তাঁর অনুগত হয়ে যাব। সে তার গোত্রের বহু লোকজনসহ এসেছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছাবিত ইবনু কায়স ইবনু শাম্মাসকে সঙ্গে নিয়ে তার দিকে অগ্রসর হলেন। সে সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে ছিল একটি খেজুরের ডাল। মুসায়লামা তার সাথিদের মধ্যে ছিল, এমতাবস্থায় তিনি তার কাছে পৌঁছে বললেন, যদি তুমি আমার কাছে এ তুচ্ছ ডালটিও চাও, তবে এটিও আমি তোমাকে দেব না। তোমার ব্যাপারে আল্লাহর ফায়সালা লঙ্ঘিত হতে পারে না। (বুখারি-৪৩৭৯; আহমদ-২৩৭৩)
তিন. তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদ আসাদী
সে প্রথমে নবুঅতের দাবি করে এবং খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। নবম হিজরিতে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মদিনা এসে ইসলাম কবুল করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুবরণ করলে সে আবার নবুঅতের দাবি করে। ফলে মুসলমানরা তার সঙ্গে একাধিকবার যুদ্ধ করেন। পরে সে ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়। তিনি ইসলামের বিধিবিধান পালন করতেন। মুসলমান সৈন্যদের সঙ্গে যোগদান করে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। পরে আলী (রা.)-এর আমলে খারেজিদের বিরুদ্ধে নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে তিনি শাহাদত বরণ করেন। (বায়হাকি, সুনানুল কুবরা-১৬৫০৪)
চার. সাজাহ বিনতে হারেছ তাগলিবী
সে আরবীয় খ্রিষ্টান নারী। সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর নবুঅতের দাবি করে। তার গোত্রসহ আশপাশের বহু মানুষ তার অনুসারী হয়ে যায়। সে ইয়ামামা এসে মুসায়লামা কাযযাবকে সত্যায়ন করে এবং তার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। মুসায়লামা ইয়ামামার যুদ্ধে মারা গেলে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করে। পরে মুআবিয়া (রা.)-এর আমলে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বসরায় হিজরত করেন। তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। (আল বিদায়া, ৬খ, ৩১৯পৃ)
পাচ. মুখতার বিন আবী ওবায়দ ছাক্বাফী
সে তাবেঈ যুগের ভণ্ড নবি। সে প্রথমে শীআ ও পরে নবুঅতের দাবি করে। সে মনে করত তার নিকট জিবরাইল (আ.) আগমন করেন। মুছআব বিন যুবায়ের তার বিরুদ্ধে একাধিকবার যুদ্ধ করেন। কোনো এক যুদ্ধে সে মারা যায়। [আল বিদায়া: ৮খ, ৩১৫পৃ.] রাসুলুল্লাহ (সা.) তার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, ‘ছাক্বীফ গোত্রে মিথ্যুক ও সন্ত্রাসী খুনি ব্যক্তির জন্ম হবে।’ ইমাম তিরমিজি (রহঃ) বলেন, কথিত আছে যে, এই মিথ্যাবাদী ব্যক্তিটি হলো মুখতার ইবন আবু ওবায়দ (সে দাবি করত যে, তার নিকট জিবরাইল আসেন) আর সন্ত্রাসী খুনি ব্যক্তিটি হলো হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। হিশাম ইবনু হাসসান (রহ.) বলেন, যে সমস্ত ব্যক্তির হাজ্জাজ বেঁধে এনে হত্যা করেছিল, তাদের সংখ্যা এক লাখ বিশ হাজারে পৌঁছে যায়। (তিরমিজি-২২২০, মিশকাত-৫৯৮৪)
ছয়. হারেক বিন সাঈদ আল কাযযাব
সে দিমাষ্কে নবুঅতের দাবি করে। সে যখন জানতে পারে যে, তার ভণ্ডামির কথা খলিফা আব্দুল মালেক বিন মারওয়ান জেনে ফেলেছেন। তখন সে আত্মগোপন করে। একজন বছরী তার অবস্থান জানতে পারলে বিষয়টি তিনি খলিফাকে জানিয়ে দেন। খলিফা আব্দুল মালেক তার বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করলে তারা তাকে আটক করে নিয়ে আসে। আব্দুল মালেক তাকে বোঝানোর জন্য একজন দক্ষ আলেম নিয়োগ করেন। কিন্তু সে কোনোমতেই ইসলামে ফিরে না আসায় তাকে হত্যা করা হয়। (যাহাবী তারিখুল ইসলাম, ৫ম খ, ৩৯০পৃ)
সাত. মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী
কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের উদ্ভব ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবের ‘কাদিয়ান’ শহরের জনৈক ভণ্ড নবি মির্যা গোলাম আহমাদ (১৮৩৫-১৯০৮)-এর মাধ্যমে। সে বর্তমান ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার ‘কাদিয়ান’ নামক উপশহরে জন্মগ্রহণ করে। ১৮৯১ সালের ২২ জানুয়ারি নিজেকে মসিহ ঈসা ও ১৮৯৪ সালের ১৭ মার্চ ইমাম মাহদী এবং ১৯০৮ সালের ৫ মার্চ নিজেকে নবি হিসেবে ঘোষণা করে। এই ভণ্ডের প্রতি বিশ্বাসী হওয়ার কারণে কাদিয়ানীরা নিঃসন্দেহে কাফের। এভাবে যুগে যুগে ভণ্ড নবিদের আগমন ঘটতে থাকবে। অবশেষে দাজ্জাল এসে ৩০তম সংখ্যা পূরণ করবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক