রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতকে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলিগের মহৎ দায়িত্ব অর্পণ করে গেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন—‘তোমরা আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও, যদিও তা একটি আয়াত হয়।’ (বুখারি, ৩৪৬১)। মুখে বয়াদন কিংবা লেখনীর শক্তি—উভয় মাধ্যমে মানুষ দাওয়াত পৌঁছে দিতে পারে। তবে প্রচলিত মাধ্যমগুলোর পরিসর অনেক সময় সীমিত থাকে; সব শ্রেণির মানুষের কাছে দ্রুত ও বিস্তৃতভাবে পৌঁছানো সব সময় সম্ভব হয় না। এই প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়া আধুনিক বিশ্বের এক বিস্ময়কর উপহার। যা যোগাযোগব্যবস্থাকে করেছে গতিশীল, শিক্ষা-উপকরণকে করেছে সহজলভ্য।
বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে সংবাদ, জ্ঞান ও তথ্য অতি সহজে পৌঁছে যাচ্ছে। গ্রাম-গঞ্জ থেকে শহর-পল্লী—স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে সবাই এখন অনলাইনমুখী। খবরের কাগজ উল্টানোর দিন যেন অনেকটাই পিছনে পড়ে গেছে; মুহূর্তেই আপডেট পাওয়া যায় সোশ্যাল মিডিয়ার অনন্ত প্রবাহে। এই বাস্তবতায় সোশ্যাল মিডিয়া নিঃসন্দেহে দাওয়াত ও তাবলিগের জন্য এক অসাধারণ সুযোগ। যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া ভরপুর ইসলামবিদ্বেষ, বিকৃত ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিকর ধারণায়— সেখানে নীরব থাকার সুযোগ নেই। বরং হিকমত, সহিষ্ণুতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। তথ্যপ্রবাহের এই দ্রুতগতির যুগে সোশ্যাল মিডিয়াকে দাওয়াতের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করাই একজন সচেতন দায়ীর সঠিক মনোভাব।
তবে সুযোগের পাশাপাশি রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা—
১. অহেতুক সময় নষ্ট না করা: সময় মহান আল্লাহর অমূল্য দান। তিনি শপথ করে বলেছেন—‘শপথ সময়ের! নিশ্চয় মানুষ মহা ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আসর, ১-২)। কেয়ামতের দিন মানুষ সময় কীভাবে ব্যয় করেছে তার হিসাব দিতে হবে। অথচ সোশ্যাল মিডিয়ায় অকারণে বহু সময় হারিয়ে যায়। তাই এর ব্যবহার হতে হবে সচেতনভাবে ও উদ্দেশ্যভিত্তিক।
২. গিবত, পরনিন্দা ও দোষচর্চা থেকে দূরে থাকা: আল্লাহতায়ালা গিবতকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন—‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?’ (সুরা হুজরাত: ১২)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—‘যে মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (বুখারি, ২৪৪২)। সহজলভ্যতার কারণে সোশ্যাল মিডিয়া আজ গিবত ও পরনিন্দার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এখানে ভুল মুহূর্তেই ভাইরাল হয়, আর কিছু লাইক–ভিউয়ের আশায় মানুষ দ্বিধাহীনভাবে তা ছড়িয়ে দেয়। দাওয়াতি কাজে এ আচরণ সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য।
৩. বিবাদ-বিতর্ক এড়িয়ে চলা: সোশ্যাল মিডিয়া এখন মতের অমিলে উত্তপ্ত বিতর্কের মঞ্চ। অথচ আল্লাহতায়ালা বলেন—‘তুমি নিজ প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকবে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে আর (যদি কখনো বিতর্কের দরকার পড়ে, তবে) তাদের সঙ্গে বিতর্ক করবে উৎকৃষ্ট পন্থায়।’ (সুরা নাহল: ১২৫)। নবিজির আচরণের মূল ছিল কোমলতা। আল্লাহ বলেন— ‘তুমি যদি কঠোর হৃদয়ের হতে, তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা আল ইমরান: ১৫৯)। তাই দাওয়াত কখনো রূঢ়তা, বিদ্বেষ বা তর্কের রূপ নিতে পারে না।
৪. তথ্য প্রচারের আগে যাচাই করা: সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এখানে খুব দ্রুত যাচাই-বাছাই ছাড়া ভুল তথ্য, মিথ্যা সংবাদ, মনগড়া বক্তব্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে। অথচ আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই (তাকে সত্য মনে করে) তার পিছনে পড়ো না। জেনে রেখ- কান, চোখ ও অন্তরের প্রতিটি সম্পর্কে (তোমাদেরকে) জিজ্ঞেস করা হবে।’ (সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ! কোন ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়।’ (সুরা হুজরাত, আয়াত: ৬)
৫. দাওয়াতে একনিষ্ঠতা ও ইখলাস: সোশ্যাল মিডিয়ার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেলিব্রিটি ফিতনা। জনপ্রিয়তা লাভের এই মোহে জড়িয়ে পড়লে দ্বীন প্রচারের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। কাজ করতে হবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, শরয়ী সীমারেখা মেনে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদেরকে কেবল এই আদেশই করা হয়েছিল যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে, আনুগত্যকে একনিষ্ঠভাবে তাঁরই জন্য খালেস রেখে।’ (সুরা বাইয়িনাহ, আয়াত: ৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি লোক শোনানো ইবাদত করে; আল্লাহ এর বিনিময়ে তার লোক শোনানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানো ইবাদত করবে, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার লোক দেখানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন।’ (বুখারি, ৬৪৯৯)
নিঃসন্দেহে দ্বীন প্রচার একটি ইবাদত। তাই এক্ষেত্রেও পূর্ণমাত্রায় ইখলাস ও একনিষ্ঠতা অপরিহার্য।
৬. পর্দা ও দৃষ্টি হেফাজত: আজকের সোশ্যাল মিডিয়া অনেক ক্ষেত্রে অশ্লীলতা, দৃষ্টির গুনাহ ও নারী-পুরুষের অনাবশ্যক যোগাযোগের উৎস হয়ে উঠেছে। তাই প্রয়োজনীয় কাজেই সীমাবদ্ধ থেকে, নিজেকে সতর্ক রাখা আবশ্যকীয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য শুদ্ধতর। তারা যা-কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত।’ (সুরা নূর, ৩০)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক