সময়ের যথার্থ মূল্যায়নই মানবজীবনে সাফল্যের সোপান। মহান আল্লাহ প্রদত্ত এই সময় এক বিশাল নেয়ামত। আখেরাতের চিরস্থায়ী সুখ ও সাফল্য নির্ভর করে দুনিয়ার সময়ের সঠিক বিনিয়োগের ওপর। বিশেষত মহিমান্বিত রমজান মাসে সময়ের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা রুটিন না থাকায়, আমাদের অনেকেরই রমজানের মূল্যবান সময় হেলায়-খেলায় কিংবা অনর্থক কাজে অতিবাহিত হয়। এ প্রসঙ্গে ইমাম গাজালি (রহ.) তার ‘বিদায়াতুল হিদায়া’ গ্রন্থে এক অমূল্য উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন—‘তোমার সময়কে অনর্থক কাজে ব্যয় করা উচিত নয়। বরং প্রতিটি সময়ের জন্য নির্দিষ্ট কাজ নির্ধারণ করা উচিত। এর মাধ্যমেই সময়ের বরকত প্রকাশ পায়।’
রমজানকে বরকতময় করতে এবং আমলের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে একজন মুমিনের জন্য প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল ‘নিযামুল আওকাত’ বা সময়সূচি। নিচে রমজানের চব্বিশ ঘণ্টার একটি আদর্শ রুটিন উপস্থাপন করা হলো:
রমজানের আদর্শ ডেইলি রুটিন
১. শেষ রাত ও সেহরি আধ্যাত্মিকতার শুরু
সেহরির অন্তত ২০-৩০ মিনিট আগে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ ও তওবা-ইস্তিগফারে মশগুল হওয়া। এটি দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়।
সুন্নাহ অনুযায়ী শেষ সময়ে সেহরি গ্রহণ করা।
আজানের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়।
২. সকালবেলায় কোরআনের সঙ্গে সময় কাটানো
ফজরের পর কিছুক্ষণ জিকির ও দোয়া শেষে সূর্যোদয়ের পর নফল নামাজ আদায়।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াত করা এবং সম্ভব হলে অর্থ ও তাফসির পড়া।
৩. দুপুর ও কর্মকালে ইবাদতের নিয়তে কাজ
সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অফিস বা ব্যবসায়িক দায়িত্ব পালন করা। মনে রাখতে হবে, হালাল উপার্জনও ইবাদত।
সময়মতো জামাতে নামাজ আদায়। বিরতির সময়টুকু অনর্থক গল্প না করে জিকিরে কাটানো।
৪. বিকেলবেলায় আত্মশুদ্ধি ও দ্বীনি শিক্ষা
আসরের পর থেকে ইফতারের আগ পর্যন্ত সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় কোনো ইসলামিক বই পড়া বা দ্বীনি আলোচনা শোনা যেতে পারে।
ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তটি দোয়া কবুলের সময়। দস্তরখানের সামনে বসে আল্লাহর কাছে নিজের ও উম্মাহর জন্য মোনাজাত করা।
৫. সন্ধ্যা ও রাত ইবাদতের বসন্তকাল
খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার করে দ্রুত জামাতে নামাজ আদায়।
ধীরস্থিরভাবে খতম তারাবিহ বা সুরা তারাবিহ আদায়ের মাধ্যমে কোরআন শোনার তৃপ্তি নেওয়া।
তারাবিহ শেষ করে দ্রুত রাতের খাবার খেয়ে ঘুমের প্রস্তুতি নেওয়া, যাতে শেষ রাতে সহজে ওঠা যায়। ঘুমানোর আগে সারা দিনের আমলের একটি হিসাব নেওয়া।
কেন রুটিন জরুরি?
বিখ্যাত আলেম রাফাত পাশা (রহ.) বলতেন, প্রত্যেক মুমিনের উচিত রাতে ঘুমানোর পূর্বে গত চব্বিশ ঘণ্টার হিসাব নেওয়া। হযরত রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী (রহ.) সময়ের ব্যাপারে এতটাই সচেতন ছিলেন যে, ইবাদতের সময় হলে তিনি বিন্দুমাত্র বিলম্ব করতেন না। বাস্তব সত্য হলো, রুটিন ছাড়া রমজান কাটালে ইবাদতে একাগ্রতা আসে না। যখন প্রতিটি কাজের জন্য সময় নির্দিষ্ট থাকবে, তখন অতিরিক্ত আড্ডা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় অপচয় হবে না। এই শৃঙ্খলাই একজন মুমিনকে সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা করে এবং তার আমলের পাল্লাকে ভারী করে।
তাই আসুন, এবারের রমজানে আমরা কেবল উপবাস না থেকে সময়ের সঠিক বণ্টনের মাধ্যমে নিজেদের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করি। একটি সঠিক রুটিনই হতে পারে আপনার জান্নাতের পথের দিশারি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক