‘আমি কিছু বুঝি না। এমনিই আসি, ভালো লাগে তাই আসি।’ নিয়মিত পাঠচক্রে আসার কারণ জানতে চাইলে এভাবেই জবাব দিল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ফারহানা ইসলাম। পাঠচক্রের আরেক সদস্য বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সিরাজুম মুনিরা বুঝিয়ে বললেন বিষয়টি। বললেন- পাঠচক্রে যারা নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন, তাদের বেশির ভাগই ফারহানার তুলনায় বড়। বড়দের আলোচনায় উঠে আসা বই বা বিষয়গুলো তাই সে তেমন একটা বোঝে না। এদিকে তার বয়সী পাঠকরাও তেমন নিয়মিত নয়। তাই ফারহানার বয়স উপযোগী বই নিয়ে আলোচনা খুব একটা হয় না। যে কারণে সে বোঝে না। তবুও সে নিয়মিত পাঠচক্রে উপস্থিত থেকে বড়দের আলোচনা উপভোগ করে।
গত সোমবার সন্ধ্যায় শহিদ বাকী স্মৃতি পাঠাগারে বসে কথা হয় তাদের সঙ্গে। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের শহিদ বাকী সড়কে অবস্থিত পল্লীমা সংসদে এই পাঠাগার। সামাজিক সংগঠন পল্লীমা সংসদেরই একটি অঙ্গ এটি।
মালিবাগ আবুল হোটেল থেকে পূর্ব দিকের রাস্তার শেষ প্রান্ত থেকে বাম দিকে কয়েকটি ভবন পেরিয়ে গেলেই পল্লীমা সংসদ। এই বাম দিকে মোড় নেওয়া থেকে শুরু করে পল্লীমা সংসদ পর্যন্ত যেতে রাস্তার দুই পাশে খাবারের দোকান আছে ২৮টি। এভাবে আরও এগিয়ে তালতলা পর্যন্ত প্রায় একই অবস্থা, ভবনের চেয়ে খাবারের দোকানের সংখ্যাই বেশি। তা ছাড়া ফুটপাতের খাবারের দোকান তো আছেই। পাঠাগারের জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকালেই দেখা যায় সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে খাবারের দোকানগুলো জমে উঠছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমজমাট হতে থাকে দোকানগুলো। খোলা থাকে মাঝরাত পর্যন্ত। কিন্তু রাস্তার পাশের এই ভবনে অবস্থিত পাঠাগারে পাঠক আছেন হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। পাঁচ তলার এই পাঠাগারে ওঠার জন্য লিফটও আছে। বসার জায়গা আছে। আছে সারি সারি শেলফভর্তি বই। কিন্তু তারপরও পাঠকের এমন খরা কেন?
এমন প্রশ্নের জবাবে পাঠাগারের সম্পাদক আনিছুল হোসেন তারেক খবরের কাগজকে বললেন, ‘এই চিত্র সবসময়ই মোটামুটি একরকম। বইয়ের পাঠক এখন কম, আগে বেশি ছিল, তা নয়। সব সময়ই কম। আগে যদি পাঠক বেশি থাকত, তাহলে আজ আমাদের জাতীয় চিত্র এমন হতো না। জাতি আরও মেধাবী হতো।’
প্রায় একই যুক্তি দেখালেন এই পাঠাগারের আরেক পাঠক মারুফ হাওলাদার। পাঠচক্রের নিয়মিত এই পাঠক বললেন, ‘এখন বলা হয় যে, মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থেকে মানুষ বই পড়া কমিয়ে দিয়েছে। আসলে মোবাইল ফোন আসার আগে মানুষ অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত হয়তো। কিন্তু তখন বই পড়ার পাঠক আনুপাতিক হারে আরও বেশি ছিল- এমন নয়।’
তার কথায় এখন বরং প্রযুক্তির সহযোগিতায় অনেক দুর্লভ বইও সহজেই পড়া যায়।
গত সোমবার পাঠাগারে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তাদের প্রায় সবাই শনিবারের পাঠচক্রে অংশগ্রহণ করেন। তাদের একজন মো. ফাহিম। তিনিও মনিরা ও মারুফের মতো বিভিন্ন ধরনের বই পড়েন। তাদের পছন্দের তালিকায় আছে বিজ্ঞান, জীবনী, ইতিহাস ও দর্শনের বই।
আরেক পাঠক আসফিয়া শাহরীন জানালেন, তরুণ বয়সী পাঠকরা হুমায়ূন আহমেদের লেখা বেশি পড়েন।
পাঠচক্রে নিয়মিত আসা এই পাঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তরুণ বয়সীদের মধ্যে যারা নিয়মিত পাঠচক্রে আসেন, তাদের অনেকে যেমন বিজ্ঞান বা দর্শনের মতো জটিল বিষয় পড়তে আগ্রহী, পাঠচক্রে না আসা পাঠকদের মধ্যে তেমন প্রবণতা কম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশ্ন, ‘শঙ্খের মধ্যে যেমন সমুদ্রের শব্দ শুনা যায়, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে কি হৃদয়ের উত্থান-পতনের শব্দ শুনিতেছ?’ শঙ্খের মধ্যে সমুদ্রের শব্দ শুনতে শঙ্খে কান লাগিয়ে শুনতে হয় বা নিস্তব্ধতার যেমন প্রয়োজন হয়, বই থেকে হৃদয়ের উত্থান-পতনের শব্দ শুনতেও পাঠাগার কোলাহলমুক্ত হতে হয়। তেমন সচেতনতার কথা বললেন পাঠাগারের সম্পাদক আনিছুল হোসেন তারেকও। তিনি বললেন, ‘একটা সময় লাইব্রেরিজুড়ে পাঠক গমগম করত। কিন্তু তাদের প্রায় সবাই বিসিএস বা চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির পড়া পড়তেন এখানে বসে। তাতে পাঠাগারের বেশ আয়ও হতো। কিন্তু পাঠাগার তো লাভজনক প্রতিষ্ঠান না। অবস্থা এমন হয়েছিল যে, আসল পাঠক বা নিয়মিত পাঠকরাই যেন বসার জায়গা পেতেন না। পরে আমরা এটা বন্ধ করে দিই। ফলে পাঠাগার আবার প্রকৃত পাঠকদের জন্যে উপযোগী হয়ে ওঠে। এই কাজটা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবুও করেছি। কাজ তো সমাজকে দেখানোর জন্য নয় যে, এখানে পাঠাগারভর্তি পাঠক। বরং দু-তিনজন প্রকৃত পাঠকও যদি থাকে, সেটিই সফলতা।’
তিনি বলেন, ‘এই পাঠাগারে বর্তমানে ১৮ হাজারের বেশি বই আছে। পাঠাগারের মোট পাঠক আছেন ১ হাজার ১০৯ জন। তাদের মধ্যে বর্তমানে নিয়মিত আছেন ৭৫ জন। প্রতি শনিবার বেলা সাড়ে ৪টা থেকে ‘শনিবারের পাঠচক্র’ শুরু হয়। এখানে নানা আয়োজনের মধ্যে শিশুদের জন্যে যেমন শিশু কর্নার আছে। তেমনি বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্যেও আলাদা কর্নার করছি আমরা।’
১৯৬৭ সালে হাফিজুর রহমানের (ময়না) নেতৃত্বে ১১ তরুণ গড়ে তোলেন সামাজিক সংগঠন পল্লীমা সংসদ। খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হলেও সবার মধ্যেই বই পড়ার আগ্রহ ছিল। তখন পল্লীমার অবকাঠামো বলতে কিছুই ছিল না। হাফিজুর রহমানের ছোট ভাই আনু মুহাম্মদ (অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ) এই অবস্থায় অঙ্কুর নামে পাঠাগার গড়ে তুললেন বর্তমান পল্লীমা সংসদের পাশে এক বাড়িতে।
এর মধ্যে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। তরুণ আবদুল্লাহ হীল বাকী তখন পল্লীমার সাংগঠনিক সম্পাদক। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধকালে ২০ বছরের বাকীর নেতৃত্বে গঠিত হলো ৪৫ জনের গেরিলা বাহিনী। বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকায় শহিদ হন তিনি। তখনকার সরকার তাকে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীর প্রতীক খেতাব দেয়।
বিজয়ের পর আবার শুরু হয় পল্লীমা সংসদের কাজ। সবাই সিদ্ধান্ত নেন একটা পাঠাগার স্থাপনের। নাম ঠিক হয় শহিদ বাকী স্মৃতি পাঠাগার। বিজয়ের এক মাস পেরুতেই ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি পল্লীমা সংসদের প্রথম অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাকী স্মৃতি পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়।