১৯৭১ সাল ছিল আমাদের জন্য এক সংকটময় মুহূর্ত। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের স্বাধীনতার জন্য তারা নেতৃত্ব এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সর্বশেষ দেখলাম ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন। এ আন্দোলন ছিল দেশের নিপীড়িত মানুষের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। বৈষম্যের বিরুদ্ধেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।...
বাংলা ভাগ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের অঞ্চলটা খুবই অবহেলিত ছিল। ঠিক সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়। শিক্ষাদীক্ষা থেকে শুরু করে সবদিক দিয়ে পিছিয়ে ছিল মুসলমানরা। তাদের উৎসাহিত করার জন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তখন লর্ড হার্ডিঞ্জ ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল এবং ভাইসরয়।
তার সঙ্গে তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তি নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক দেখা করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। অনেক চড়াই-উতরাই এবং বাধা পেরিয়ে তার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ১ জুলাই ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হলো। প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর হলেন পি জে হার্টস, যার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির উভয় দিক থেকেই যেন যথাযথ গুরুত্ব পায়। সাংস্কৃতিক জগতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এবং অবদান রেখেছে। এ দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ যা কিছু ছিল সব ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকা রেখেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ পর্যন্ত যত ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে সব ক্ষেত্রেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বড় ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তান যখন সৃষ্টি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইউনিয়ন জ্যাক’-এর পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো হয়েছিল। আবার বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো তখনো পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে আমাদের দেশের নতুন পতাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওড়ানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিটা ক্ষেত্রেই অবদান রেখে এসেছে।
১৯৭১ সাল ছিল আমাদের জন্য এক সংকটময় মুহূর্ত। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের স্বাধীনতার জন্য তারা নেতৃত্ব এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সর্বশেষ দেখলাম ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন। এ আন্দোলন ছিল দেশের নিপীড়িত মানুষের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। বৈষম্যের বিরুদ্ধেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এ অঞ্চলের মানুষ বিভিন্নভাবে পিছিয়ে ছিল বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ দেশের কৃষক যারা তাদের সন্তানও অবহেলিত ছিল। এখন সাধারণ পরিবারের সন্তানরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারে। তারা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে এবং নেতৃত্ব দিচ্ছে। একজন পাহাড়ি ছেলেও দেশে অবদান রাখার সুযোগ পাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে মধ্যবিত্তরা দেশে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। পার্বত্য এলাকার সন্তান এবং অন্যান্য এলাকার ছেলেমেয়রা একদম অবদমিত ছিল, যারা কোনো সময় এগিয়ে আসার সুযোগ পায়নি, তারা এখন সুযোগ লাভ করে বিভিন্ন জায়গায় তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন ব্যাপক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান কারও মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সবাই পড়ার সমান সুযোগ পাচ্ছে। মেধার ভিত্তিতেই সবাই ভর্তি হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরেকটা সুযোগ করে দিয়েছে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়া। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিকসংকট প্রকট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিই হয়েছিল আবাসন ব্যবস্থার মডেলটা ধারণ করে। অক্সফোর্ডের মডেল হচ্ছে রেসিডেন্সিয়াল। এখানে সব শিক্ষার্থী থাকবে আবাসিক হলে। হলেই টিউটরিয়াল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষাব্যবস্থার যাবতীয় উপাদান হলগুলোতেই থাকবে। হলগুলোই ছিল শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। পরে বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে তা পরিবর্তন হলো। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার আগে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ছিল, পাকিস্তান হওয়ার পরে সব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এল। তার পর থেকে আবাসিকতা আর ঠিক রাখা যায়নি। তখন থেকে আবাসিক গুরুত্বটা হারিয়ে ফেলল। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো। সে কারণেই অক্সফোর্ডের সেই নমুনা রাখা আর সম্ভব হলো না। মানুষের প্রত্যাশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দেবে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে সেই মানদণ্ড বজায় রাখবে। যার কোয়ালিটি সবচেয়ে ভালো সেই অগ্রাধিকার পাবে। উপাচার্যের দায়িত্বই হচ্ছে কোয়ালিটিসম্পন্ন শিক্ষক বেছে নেওয়া। বিগত কয়েক বছর রাজনৈতিকভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যেখানে মেধা অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত, সেখানে রাজনীতি অগ্রাধিকার পেয়েছে। সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাও শিক্ষক হতে পারেনি। এমনও দেখা গেছে, শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে ভোটার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এটা খুবই দুঃখজনক অবস্থা। দেশে অনেক ভালো ভালো উপাচার্যও এসেছেন; যারা মেধাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এত বেশি দলীয়করণ হয়েছে যে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুবই কঠিন। এমনকি আবাসিক হলগুলোতে দেখেছি মেধার ভিত্তিতে ছাত্রদের সিট বণ্টন করা হয়নি। এখানে অন্য বিবেচনা কাজ করেছে। আবাসিক হলগুলোতে ছাত্ররা এত কষ্টে জীবন যাপন করে, যা বর্ণনাতীত। এভাবে গাদাগাদি করে থাকলে ছাত্ররা পড়াশোনা করবে কীভাবে? আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতি যারা করত তাদের কথামতোই ছাত্রদের চলতে হতো। সাধারণ ছাত্রদের তারা দাসের মতো করে দেখত। আবাসিক হলে থাকা ও পড়াশোনার মতো পরিবেশ ছিল না। এমনকি লাইব্রেরির যে সুবিধা তা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে ছাত্ররা।
গবেষণার ক্ষেত্রেও অনেক পিছিয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সম্প্রতি কিউএস র্যাংকিংয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৬০০-এর মধ্যে এসেছে। যদি আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো কাজ করত, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়টি আরও অনেক বড় জায়গায় যেতে পারত। গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি বিষয়কে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এখন প্রতিযোগিতা শুধু দেশের মধ্যে নয়, বিশ্বব্যাপী। বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। সিলেবাস হতে হবে একদম আপ-টু ডেট এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। শিক্ষক হতে হবে মানসম্পন্ন। দেশের যারা সবচেয়ে মেধাবী তারাই পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। আমাদের ছাত্ররা অত্যন্ত মেধাবী। তাদের মেধা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ রাখা যাবে না। কিন্তু সেই মেধা বিকশিত হওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে। ছাত্ররা যে কতটা মেধাবী তা আমরা ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনেও দেখেছি। এ আন্দোলনে কত মেধার পরিচয় তারা দিয়েছে। ছাত্রদের কাছে রাজনৈতিক নেতারাও হার মেনেছে। এ আন্দোলনে ছাত্রীরাও অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। তারা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করেছে। ফজিলাতুননেছা নামে গণিত বিভাগের এক ছাত্রী, বিভাগে সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিল। এতেই প্রমাণিত হয়, নারীরা এখন আর শিক্ষায় পিছিয়ে নেই। নারী শিক্ষায় এগিয়ে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিভার ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশি এগিয়ে রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু নারী জাগরণ বা নারীদের উঠে আসার জায়গা ঠিক করে দিয়েছে। নারীদের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে হয়, তারা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৫২ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। এই মেয়েরা দূর-দূরান্ত থেকে উঠে এসেছে। অনেক মেয়ে আছে জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। অনেক অভিভাবক আছেন যাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ, তারাও তাদের মেয়েকে অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে পড়াশোনা করাচ্ছেন। মেয়েদের হলে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এক প্রভোস্ট আমাকে বলেছিলেন, ছাত্রীরা দাবি করেছেন যে, ‘এক বেলা না খেয়ে থাকতে পারব, কিন্তু হলে মাথাগোজার ঠাঁই করে দিতে হবে। আমরা তো রাস্তায় থাকতে পারি না’।
সব বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি যোগ্য শিক্ষক, উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকে এবং তারা যদি সঠিক নেতৃত্ব খুঁজে পায় তাহলে তারা বহুদূর এগিয়ে যাবে। তবে সরকারকে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য অনেক বড় সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনেক কিছুই করার আছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাছে ‘হিট প্রজেক্ট’-এর প্রায় ১২০০ কোটি টাকার প্রজেক্ট আছে, যা গবেষণার জন্য বরাদ্দ রেখেছি। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সহযোগিতায় গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছি। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘উইমেন নেটওয়ার্ক’-এর মাধ্যমে ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে। সর্বোপরি, দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)