যেকোনো বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। ফরাসি বিপ্লব ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। রুশ বিপ্লব জারতন্ত্রের পরিবর্তে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লব সেখানে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। অখণ্ড পাকিস্তানে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান সামরিকতন্ত্রের পরিবর্তে অবশেষে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর বিপ্লব জনগণের সংহতি ও নিরাপত্তা জোরদার করেছে। ১৯৯০ সালে সামরিকতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। অনুরূপভাবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল বৈষম্যের অবসানে ছাত্রসমাজের দ্বারা। কিন্তু প্রকারান্তরে, নাগরিক সাধারণের অনিবার্য দাবিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে এক দফা ঘোষিত হয়। পলায়ন করে স্বৈরাচার। স্বৈরাচারের পতনের পর গণতন্ত্রের পক্ষে জোরদার জনআকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়েছে। আর সবারই জানা কথা- নির্বাচন ব্যতীত গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা কল্পনা করা যায় না। তাই অবশেষে গোটা জাতি সমাগত নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।
বাংলাদেশ তথা সমসাময়িক পৃথিবীতে জুলাই অভ্যুত্থান ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। ব্যাকরণে যেমন নিপাতনে সিদ্ধ চ্যালেঞ্জ আছে, তেমনি এ বিপ্লবেরও ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্য আছে। আমাদের এ মাতৃভূমিতে আন্দোলন, সংগ্রাম, অভ্যুত্থান ও গণ-অভ্যুত্থানের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। তা সত্ত্বেও এ গণ-অভ্যুত্থানের গতি-প্রকৃতিতে, বৈশিষ্ট্যে, কৌশলে এবং গণ-অংশগ্রহণে রয়েছে নতুন জেনারেশনের অভিনবত্ব। অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে জেন-জি বা জেনারেশন জি-র নতুন পরিভাষা। জেন-জির আরও নাম আছে- পোস্ট-মিলেনিয়াম, আই জেনারেশন এবং জেনারেশন টেক-এর মতো শব্দাবলি। এদের ডিজিটাল নেটিভ বলেও অভিহিত করা হয়। এতে বোঝা যায় যে, এ বিপ্লবের সঙ্গে সর্বশেষ প্রযুক্তির সংযোগ আছে। এ প্রজন্মের সদস্যরা পূর্ব প্রজন্মের সদস্যদের থেকে চিন্তাচেতনা ও ব্যবহারিকভাবে ভিন্নতর। এরা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তিত। বিপ্লব চলাকালীন যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম- ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপের সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করেছে তারা। সরকার যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে, তখন তারা বিকল্প প্রযুক্তি দ্বারা যোগাযোগ রক্ষা করেছে। আর আন্দোলনের মূল মাধ্যম হিসেবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছে। এ নতুন প্রযুক্তি জেনারেশনের বৈশিষ্ট্য আধুনিকতা, গতিশীলতা ও প্রযুক্তি কুশলতা। এরা গতানুগতিক নিয়ম-কানুনকে অতিক্রম করতে সক্ষম। জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে সফল। শুধু বাংলাদেশ নয়, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও পৃথিবীর অন্যত্র এই নতুন প্রজন্মের নতুন প্রতিজ্ঞা প্রতিফলিত হচ্ছে। ‘ইউরোপ-আমেরিকায় উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থান এবং গণতন্ত্রের দুর্দিনে এশিয়া, আফ্রিকায় জেন-জির চলতি গণতান্ত্রিক আর্তি বৈশ্বিক পরিসরেও বেশ চমক সৃষ্টি করেছে’ (আলতাফ পারভেজ, প্রথম আলো, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪)। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয় যে, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর পশ্চিমা গণতন্ত্রও যেন ক্রমশ তার আবেদন হারিয়ে ফেলছে। গোটা পৃথিবীতে যেন একটি নতুন কালপর্ব ও নতুন অধ্যায় নির্মিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও জুলাই বিপ্লবে এর নেপথ্যে উপস্থিতি অনুভূত হয়েছে। সামগ্রিক অর্থেই এ গণ-অভ্যুত্থানটি অতীতের মতো গতানুগতিক পথে অগ্রসর হয়নি।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে রীতিমতো ভূকম্পনের সৃষ্টি করেছে। এর আকস্মিকতায় রাজনৈতিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল সাময়িকভাবে। এখনো সে অস্থিরতার রেশ রাষ্ট্র কাঠামোয় বারবারই অনুভূত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রাথমিক চ্যালেঞ্জগুলো ভুলে-শুদ্ধে অতিক্রম করলেও এখন একটি প্রান্তিক সময় অতিক্রম করছে। এ বিতর্কের উৎসমূল খুঁজতে গেলে দুটো বিষয় উল্লেখ করা যায়। অভ্যুত্থানের ফলে অবাধ স্বাধীনতার আলোকে জনগণের মনে হিমালয়সম আশাবাদ জাগে। পরবর্তীকালে পুলিশের অসহযোগিতা, আনসার আন্দোলন, শ্রমিক ধর্মঘট, শিক্ষক সমাবেশ এবং বিচার বিভাগীয় তথাকথিত বিচারিক অভ্যুত্থান অন্তর্বর্তী সরকারের অস্তিত্বে আঘাত হানে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ‘উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। এসবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারকে দুর্বল করে। ছাত্রনেতৃত্বের ওপর এ নির্ভরতা কাঙ্ক্ষিত ছিল। কিন্তু ক্রমশ ছাত্রনেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বিশেষত ছাত্রনেতৃত্ব রাজনৈতিক দল গঠনের পর কিংস পার্টির বদনাম শুনতে হয় অন্তর্বর্তী সরকারকে। এখন সঙ্গতভাবেই এক বছর পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চ্যালেঞ্জের আলোকে সম্ভাবনার পরিমাপ করতে হচ্ছে।
সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে চায় যে, নির্বাচন নিয়ে যে কালো ছায়া পড়েছে দেশে, তা অচিরেই বিদূরিত হবে। আশার কথা, ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে এখন সব রাজনৈতিক দল ঐক্যের আহ্বান জোরদার করেছে। বিরোধের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হোক জাতীয় স্বার্থে- এটাই নাগরিক সাধারণের প্রত্যাশা।...
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম চ্যালেঞ্জ বৈষম্যের অবসান। প্রকারান্তরে এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে পরিচালিত গণ-আন্দোলন। বিগত আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের দুঃসহ বৈষম্যের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এ সময়ে একটি দুঃশাসনের দুষ্টচক্র (A Vicious Circle of Oligarchy) গোটা জাতির স্কন্ধে ভর করে। শ্রেণিবৈষম্য আকাশসম হয়ে দাঁড়ায়। একটি ধনিক গোষ্ঠী কেবলই ধনী হতে থাকে। আরেকটি শোষিত গরিব শ্রেণি কেবল গরিবই হতে থাকে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান যে গণচরিত্র অর্জন করেছে অর্থনৈতিক বৈষম্য তার মূল কারণ। রাজনৈতিক নিপীড়ন, সামাজিক অনাচার এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদকে ছাপিয়ে মানুষের যাপিত জীবন যখন অসম্ভব হয়ে ওঠে তখন আন্দোলন, বিপ্লব ও বিদ্রোহ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের যে পরিবর্তন তথা সংস্কার দাবি করে, সে আবেদন ছিল সর্বজনীন। রাষ্ট্রব্যবস্থায় তারা এমন সব সংস্কারের কথা বলে যা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজ করবে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা প্রকাশ পেয়েছে- আয় ও সম্পদবৈষম্য। বৈষম্যের এ বাস্তবতা শুধু শহর ও গ্রাম কিংবা ঢাকার সঙ্গে ঢাকার বাইরের এলাকাই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আজও নারী শ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরও প্রবলভাবে দৃশ্যমান। এ ছাড়া, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার। বাংলাদেশে আয়বৈষম্য নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, জিনি সহগ (Gini coefficient) নামে পরিচিত বৈষম্য সূচক ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। ২০০৯ সালে এ সূচক ছিল ৩২.৪, যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে ৪৩.০। অর্থাৎ, সমাজের সবচেয়ে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয়ের ব্যবধান বেড়েছে।
সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে চায় যে, নির্বাচন নিয়ে যে কালো ছায়া পড়েছে দেশে, তা অচিরেই বিদূরিত হবে। আশার কথা, ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে এখন সব রাজনৈতিক দল ঐক্যের আহ্বান জোরদার করেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে যে, প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যেও আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময় করছে। ঐক্যের এসব ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে আশা করা যায় যে, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতি দেখতে পাবে। বিরোধের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হোক জাতীয় স্বার্থে- এটাই নাগরিক সাধারণের প্রত্যাশা।
লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক উপাচার্য, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়