শুধু সন্তান পালনে সীমাবদ্ধ না থেকে নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে। স্বাধীন হতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে এবং চাকরি করতে হবে। শুধু চাকরিজীবী নয়, উদ্যোক্তাও হতে হবে। নারী দিবস উপলক্ষে খবরের কাগজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ারা প্রতিনিধি আতিকুল হা-মীম।
খবরের কাগজ: আপনি একজন নারী। বর্তমানে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জীবনের শুরুতে আপনার স্বপ্ন কী ছিল। প্রশাসন ক্যাডারে আসার অনুপ্রেরণা কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন?
তাহমিনা আক্তার: আমি যখন ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি তখনকার কথা, আমার নিজ জেলায় প্রথম নারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) এসেছিলেন। উনার হাত থেকে পুরস্কার নেওয়ার পর আমারও স্বপ্ন জাগল ‘আমি ডিসি হব’। পরে আব্বা বললেন ডিসি হতে গেলে আগে ম্যাজিস্ট্রেট হতে হয়। সেই থেকে শুরু হলো স্বপ্নযাত্রা, এখনো ছুটছি স্বপ্নের পেছনে।
খবরের কাগজ: আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা ও সেই সময়ের সংগ্রাম সম্পর্কে কিছু বলবেন?
তাহমিনা আক্তার: বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার খুব ভালো সময় কেটেছে। আমার স্বপ্ন ছিল, আমি প্রশাসকই হব। কিন্তু বাবা-মায়ের ইচ্ছা আমি যেন ডাক্তার হই। এ কারণে আমি প্রথমে মেডিকেলের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম তবে আমার ইচ্ছা ছিল না মেডিকেলে পড়ার। মেডিকেলে সুযোগ পেলাম না, এরপর ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। সেখানকার জার্নিটা খুব ভালো ছিল।
খবরের কাগজ: বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল এবং কীভাবে তা মোকাবিলা করেছেন?
তাহমিনা আক্তার: শুরুতে বিসিএস পরীক্ষার কথা মাথায় এলেই ভয় পেতাম। এত এত পরীক্ষার্থীর মধ্যে সুযোগ পাব কি না তা নিয়ে এক ধরনের সংশয় কাজ করত, সাড়ে ৪ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রথমবার আমি সুযোগ পেলাম না। কিন্তু আশাহত হইনি, চেষ্টা করলাম ৩৫তম বিসিএসে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি সুযোগ পেয়েছি।
খবরের কাগজ: প্রশাসনের একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের শুরুটা কেমন ছিল এবং প্রথম কর্মস্থলের অভিজ্ঞতা যদি একটু বলতেন।
তাহমিনা আক্তার: আমার প্রথম কর্মস্থল হয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। সেখানকার অভিজ্ঞতা বলতে গেলে খুবই বিভীষিকাময়, প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। আমার এমনও হয়েছে শুক্র-শনিবারেও আমি বাসায় বসে দিনের আলো দেখতে পারিনি। আমাদেরকে প্রশিক্ষণটা ওভাবেই দেওয়া হতো। মাঝেমধ্যে মনে হতো, এ চাকরিটা বোধহয় করতে পারব না।
খবরের কাগজ: প্রশাসনে নারীদের এমন কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়, যা পুরুষ কর্মকর্তাদের তুলনায় আলাদা।
তাহমিনা আক্তার: প্রশাসনে নারীদের অনেক সময় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত মানসিকতার কারণে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হয়। মাঠপর্যায়ের দায়িত্বে নিরাপত্তা ও কর্মঘণ্টা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জও তুলনামূলক বেশি থাকে। পাশাপাশি পরিবার ও পেশাগত দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করাটাও নারী কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা একটি বাস্তবতা।
খবরের কাগজ: মাঠ প্রশাসনে কাজ করার সময় নারী কর্মকর্তা হিসেবে জনগণের প্রত্যাশা বা আচরণে কী ধরনের ভিন্নতা লক্ষ্য করেছেন।
তাহমিনা আক্তার: খুবই ইন্টারেস্টিং অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। এই যুগে এসেও আমাদের দেশের মানুষের কাছে নারীদের ওই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। যেমন, সম্প্রতি এক নারী আমার রুমে এসে বলেছেন, ‘স্যার তো নেই’। তারা আশা করেন যে, এখানে একজন পুরুষ বসে থাকবেন। আমরা যদি ভালোভাবে কাজ করতে পারি, সমাজে পুরুষের চেয়ে নারীর গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে বলে আমি মনে করি।
খবরের কাগজ: প্রশাসনে নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন পদক্ষেপগুলো আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন।
তাহমিনা আক্তার: সরকারের অনেক কিছুরই করা দরকার আছে। প্রশাসনে কর্মরত নারীদের মাতৃত্বকালীন সময়টাতে পরিকল্পনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। যদিও সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত ছুটি আছে, তবুও আমার মনে হয় এ বিষয়টিতে সরকারের আরও নজর দেওয়া দরকার।
খবরের কাগজ: স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতে কী ধরনের বাস্তব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন?
তাহমিনা আক্তার: দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অনেক ধরনের চাপ আসতে থাকে। আগে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সঙ্গে মিশে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করত, আমরা সেভাবে কাজ করতে পারছি না। বিভিন্ন প্রকল্পের নথিপত্রেরও ব্যাপক ঘাটতি ছিল। যা, আমার কাজকে আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল।
খবরের কাগজ: একজন ইউএনও হিসেবে সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
তাহমিনা আক্তার: গত বর্ষায় আনোয়ারা উপকূলে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা আমার এখনো মনে পড়ছে। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সব গ্রাম তলিয়ে যাবে। আমরা সব দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।
খবরের কাগজ: আনোয়ারা উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে নারীদের উন্নয়নে বা ক্ষমতায়নে আপনি কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন বা নিতে চান।
তাহমিনা আক্তার: আমি একটি প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে একটি বিশ্রাম কক্ষ ও মেশিনসহ স্যানিটারি ন্যাপকিন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামাদি ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এ ছাড়া এখানকার নারী ইউপি সদস্যদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের অগ্রাধিকার দিয়েছি।
খবরের কাগজ: বর্তমান প্রজন্মের মেয়েরা যারা প্রশাসনে আসতে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
তাহমিনা আক্তার: একজন শিক্ষার্থীর প্রধান কাজ পড়াশোনা করা। পড়াশোনাটা ঠিকভবে শেষ করে বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে আমি উদ্বুদ্ধ করব। আমি অনেককে দেখেছি, বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নেয়। আমি কখনোই এটিকে সমর্থন করি না। আশাকরি, নারীরা আগামীতে প্রশাসনে আরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
খবরের কাগজ: কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস সামাল দেন কীভাবে এবং এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কোনো কৌশল অবলম্বন করেন কিনা।
তাহমিনা আক্তার: স্ট্রেস ম্যানেজম্যান্ট যার যত ভালো সে সেভাবেই ওই সময়টা কাটিয়ে উঠতে পারে। ওই সময় আমাদের পরিবারের সাপোর্টটা আমাদের বেশি কাজে দেয়। সরকারের উচিত, মানসিকভাবে আমাদের সাপোর্ট দেওয়া ও কাউন্সেলিংয়ের জন্য চিকিৎসকের ব্যবস্থা করা এবং কিছুদিন অন্তর অন্তর ছুটির ব্যবস্থা করা।
খবরের কাগজ: আগামী পাঁচ বছরে প্রশাসনে নারীর অবস্থান আপনি কোথায় দেখতে চান।
তাহমিনা আক্তার: আমি অবশ্য সর্বোচ্চ জায়গায় দেখতে চাই। সম্প্রতি গঠিত নতুন সরকারের কাছে আমার আবেদন, নারীদের যেন সবখানে সমানভাবে সুযোগ দেওয়া হয়। নারীরা সুযোগ পেলে আমার মনে হয় কাজের মাধ্যমে আরও বেশি সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক সামাজিকসহ সবক্ষেত্রে আমি নারীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ দেখতে চাই।
খবরের কাগজ: আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেশের নারীদের জন্য আপনার বিশেষ বার্তা কী?
তাহমিনা আক্তার: শুধু সন্তান পালনে সীমাবদ্ধ না থেকে নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে। স্বাধীন হতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে এবং চাকরি করতে হবে। শুধু চাকরি নয়, কাজ করতে হবে নতুবা উদ্যোক্তা হতে হবে। কিছু না কিছু করতেই হবে, নিজে যাতে জীবিকা-নির্বাহ করতে পারে তার জন্য আমি বিশেষভাবে তাগিদ দেব।