সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর গ্রেপ্তার হন ২০০৭ সালের ২৮ মে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওই সময়ে দেশে জরুরি অবস্থা চলাকালে তাকে গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর মোট ১১টি মামলায় আসামি হয়ে আজ অবধি তিনি কারাগারে আছেন। ৬টি মামলায় সাজা ঘোষণা হয়েছে। এর মধ্যে ২টিতে মৃত্যুদণ্ড, একটিতে যাবজ্জীবন, আরেকটিতে ১৭ বছর এবং দুর্নীতির আরেক মামলায় ৮ বছরের কারাদণ্ড হয়। বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনটি মামলায় খালাস পেলেন তিনি। তবে, আরও দুইটি মামলায় খালাস পেলে তিনি মুক্তি পাবেন বলে জানান তার আইনজীবীরা।
তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় দুইটি মামলা হয়েছিল। এর একটিতে তিনি (বাবর) খালাস পেয়েছেন আরেকটি মামলা হাইকোর্টের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। একাধিক মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি এখনি মুক্তি পাবেন তা বলা যাচ্ছে না।
বিভিন্ন আইনজীবীর মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাবরের বিরুদ্ধে মামলার বিবরণ তুলে ধরা হলো-
অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মামলা: ২০০৭ সালে বাবরকে তার গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে ওই দিনই মামলা করা হয়। বিচার শেষে একই বছরের ৩০ অক্টোবর রায়ে বেআইনিভাবে রিভলবার রাখার দায়ে ১০ বছর ও ২৫ রাউন্ড গুলি রাখার দায়ে আরও ৭ বছর অর্থাৎ মোট ১৭ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক মন্ত্রী হিসেবে কারাবিধি অনুযায়ী তিনি কারাগারে ডিভিশন (মযার্দা) পেয়েছিলেন। কিন্তু কারাগারে নিষিদ্ধ মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগে সেই ডিভিশন বাতিল করা হয়।
গ্রেনেড হামলা মামলা: ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়। ২০১১ সালে হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামী (হুজি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে বাবরকে ওই মামলার আসামি করা হয়। এতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিএনপির বেশ কিছু মন্ত্রী-এমপিকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়। ২০১২ সালের মার্চ মাসে ঢাকার একটি আদালতে দাখিল করা সম্পূরক চার্জশিটে বাবরসহ ৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। এ মামলায় ২০১৮ সালে ১০ অক্টোবর অন্য আসামিদের সঙ্গে বাবরকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিলের শুনানি শেষে ১ ডিসেম্বর তাকে খালাস দেন হাইকোর্ট।
১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার ঘটনায় ২ মামলা: ঘটনার এক দিন পর ২০০৪ সালের ৩ এপ্রিল কর্ণফুলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহাদুর রহমান বাদী হয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(বি) ধারায় একটি এবং ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ধারায় আরেকটি মামলা করেন। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি রায় ঘোষণা হয়। এতে চোরাচালান মামলায় মতিউর রহমান নিজামী, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া অস্ত্র আটক মামলার দুটি ধারায় তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ মামলাটি হাইকোর্টে আপিলের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা: ৭ কোটি ৫ লাখ ৯১ হাজার ৮৯৬ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৮ সালের ১৩ জানুয়ারি বাবরের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ওই বছরই চার্জশিট দাখিল করা হয়। এ মামলায় তাকে ৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। ইতোমধ্যে তিনি খালাস পেয়েছেন।
কর ফাঁকির মামলা: ৮ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার ১২২ টাকার সম্পদের ওপর প্রযোজ্য আয়কর ফাঁকির অভিযোগে ২০১০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এনবিআর বাবরের বিরুদ্ধে মামলাটি করে। এ মামলায় ২০১৪ সালের ৬ আগস্ট ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ চার্জ গঠন করেন। সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে যদিও উচ্চ আদালতের আদেশে মামলাটি স্থগিত রয়েছে।
ঘুষ নেওয়ার মামলা: সাব্বির হত্যা মামলা থেকে বসুন্ধরা গ্রুপের সে সময়কার ভাইস চেয়ারম্যান সাফায়াত সোবহানকে বাঁচাতে ২১ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগে একটি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে ২ মামলা: ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যেরবাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভা শেষে ফেরার পথে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ ৫ জন। ২০১১ সালে তৃতীয় দফার তদন্তে লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। একই ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে আরেকটি মামলা হয়। মামলা দুটিতে তিনি জামিনে আছেন।
সুরঞ্জিত সেনকে হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা: এ দুই মামলায় জামিন পেয়েছেন লুৎফুজ্জামান বাবর। সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল সম্প্রতি এ জামিন মঞ্জুর করেন।