চলছে বেড়ানোর মৌসুম। বাংলাদেশ থেকে পর্যটকরা যাচ্ছেন এশিয়ার পর্যটনের জন্য জনপ্রিয় দেশগুলোসহ বিশ্বের নানা দেশে। আবার দেশে আসছেন অনেক প্রবাসী। এ অবস্থায় উড়োজাহাজের টিকিটের চাহিদা বাড়তেই দাম বাড়িয়েছে এয়ারলাইনসগুলো, যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন যাত্রীরা।
এ অবস্থায় টিকিট বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন চাহিদা বাড়লে দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক, কারণ মন্দা কাটাতে এ সময় ব্যবসা করে নিতে হয়। তবে যাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে টিকিটের মূল্য সহনীয় রাখতে বিমান সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়েছে সরকার।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই-পরবর্তী সরকার পতন ও নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণকে কেন্দ্র করে বিদেশযাত্রায় অনেকটাই ভাটা পড়ে। তবে শীত আসতে না আসতেই সে চিত্র বদলে গেছে। এতে হঠাৎই বেড়েছে উড়োজাহাজের টিকিটের চাহিদা ও দাম।
দেশের ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ খবরের কাগজকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছিল পর্যটন খাত। দেশে আসা বা বিদেশে যাওয়ার আগ্রহও অনেকটা কমতে দেখা যায়। এতে এয়ারলাইনসগুলো তাদের ব্যবসার লস কমাতে অনেক রুটে ফ্লাইট কমিয়ে দেয়। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হয়ে আসায় গত মাস থেকেই বেড়েছে বিদেশগামী পর্যটকদের সংখ্যা।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যাতায়াতও বেড়েছে। কিন্তু ফ্লাইটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় চাহিদার তুলনায় সিট কমে গেছে। আর এতেই বেড়েছে টিকিটের দাম, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমাদের প্রবাসীরা দেশে আসছেন ও ফিরে যাচ্ছেন এবং ওমরার যাত্রীদেরও এখন থেকে আগামী কয়েক মাস চাপ রয়েছে। ফলে এই রুটগুলোর টিকিটের দাম বেড়েছে অনেক।
টিকিটের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিদেশি কয়েকটি এয়ারলাইনসের জেনারেল সেলস এজেন্টের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর টিকিটের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে ডলার নিতে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোকে কম পক্ষে তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়। এতে ডলারের দাম বেড়ে যায়। ফলে এয়ারলাইনসগুলো আটকে থাকা এই ডলারের ভবিষ্যৎ মুনাফা ধরে দাম নির্ধারণ করে। এতে বাংলাদেশ থেকে টিকিটের দাম বেশি হয়।
এদিকে টিকিটের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিমান সংস্থাগুলো ও বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ (বেবিচক) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। গত ১২ ডিসেম্বর উপসচিব রোকসিন্দা ফারহানা স্বাক্ষরিত ওই চিঠির একটি কপি এসেছে খবরের কাগজের হাতে। এতে বলা হয়েছে, ‘বছরের বিশেষ সময়ে (যাত্রীদের গমনাগমন বৃদ্ধির সময়ে) যাতে বিমান সংস্থাগুলো অকারণে ভাড়া বৃদ্ধি না করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’
তবে এই নির্দেশ মানতে নারাজ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। নিজেদের ব্যাণিজ্যক প্রতিষ্ঠান দাবি করে এই রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থাটি বলছে, মৌসুমে তো টিকিটের দাম বেশি থাকবেই। বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত সোমবার (৩০ ডিসেম্বর) মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিমানসহ বেশ কিছু এয়ারলাইনসের বৈঠক হয়েছে। তারা বলছেন বিমান ভাড়া যেন সহনীয় পর্যায়ে রাখা হয়। কিন্তু তারা আসলে এটা বলতে পারেন না। আমরা একটি ব্যাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এটা ট্রেন বা বাসের ভাড়ার সঙ্গে মেলালে চলবে না।
বিমানের ভাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। তাদেরও নিয়ম আছে। তাদের নিয়মও আমাদের মানতে হয়। এটা সাপ্লাই ও ডিমান্ডের ওপর নির্ভর করে। এ অনুযায়ীই ভাড়া বাড়বে ও কমবে এবং এটা ফ্রিকোয়েন্টলি বাড়বে-কমবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা নতুন বছরকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের অফার দিচ্ছি। বিভিন্ন রুটেই অফার দিচ্ছি।’
মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠির বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে আমি কিছুদিন আগেই মিটিং করেছি। যেহেতু অন্যান্য দেশে টিকিটের দাম কম তাই তাদের টিকিটের দাম কমানোর জন্য আমাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। তবে এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। আন্তর্জাতিকভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে টিকিটের দাম নিয়ন্ত্রণটা আসলে আমাদের হাতে নেই। আমরা তাদের বলতে পারি কিছুটা কম করার জন্য।’
অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বেবিচক থেকে বিমান সংস্থাগুলোকে দু-এক দিনের মধ্যেই চিঠি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বেবিচকের একটি সূত্র। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে বিমান ভাড়া সহনীয় পর্যায়ে রাখতে নির্দেশনা দিয়ে কিছুদিন আগে চিঠি এসেছে। যেহেতু বাংলাদেশে বেবিচক বিমান ভাড়া নির্ধারণের একটি রেগুলেটরি বডি, তাই তারা বিমান সংস্থাগুলোকে এ নির্দেশ মানতে সব এয়ারলাইনসকে চিঠি দেবে দু-এক দিনের মধ্যে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, এয়ারলাইনসগুলো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। তারা তাদের ব্যবসা ঠিক রাখতে টিকিটের দাম নির্ধারণ করবে। এতে আসলে সরকারের এই চিঠি তেমন প্রভাব ফেলবে না। সরকারকে যেটা করতে হবে তা হলো দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে হবে, যেন জনপ্রিয় ও চাহিদা সম্পন্ন রুটগুলোতে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর ফ্লাইট বাড়ে। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হবে। এতে করে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম কমে আসবে।