বুধবার (৯ এপ্রিল) পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার শুরু হবে বাংলাদেশে। এর মধ্য দিয়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের অভিজ্ঞতা পাবেন গ্রাহকরা। তবে এটি কতটা জনগণের হাতের নাগালে থাকবে, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। অন্যদিকে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি একটি নতুন প্রতিযোগিতা হলেও হুমকি হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
স্টারলিংক কী?
মার্কিন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিবিদ ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স সারা বিশ্বে স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে। স্টারলিংক নামের এই তারহীন ইন্টারনেট সেবা বিশ্বের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষরাও পাচ্ছেন। শুধু একটি অ্যান্টেনা দিয়েই সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বাড়ি কিংবা অফিস বা দুর্গম পাহাড়ে এ সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এই ইন্টারনেটের গতিও সাধারণ ইন্টারনেটের চেয়ে ভালো।
কীভাবে কাজ করবে স্টারলিংক
বুধবার বিনিয়োগ সম্মেলনে স্টারলিংকের ইন্টারনেটের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হবে বাংলাদেশে। এতে কারিগরি সহায়তা দেবে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)।
কারিগরি সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসসিএলের মুখপাত্র ওমর হায়দার বলেন, ‘স্টারলিংক যেন বাংলাদেশে দ্রুত ইন্টারনেট সেবা শুরু করতে পারে তার জন্য সহায়তা করতে প্রস্তুত বিএসসিএল। বিএসসিএলের নিজস্ব গ্রাউন্ড স্টেশন, নিজস্ব কর্মী দিয়ে স্যাটেলাইট অপারেট করার অভিজ্ঞতাসহ সব ধরনের কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। কিছুদিন আগে আমরা বিএসসিএলে স্টারলিংকের হোম কিট এবং এন্টারপ্রাইজ কিট টেস্ট করেছি। হোম কিটে বেশ সিগনিফিকেন্ট ডেটা রেটও পাওয়া গেছে। বিনিয়োগ সম্মেলনেও আমরা পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংকের কানেক্টিভিটি ফ্যাসিলিটেট করব।’
তিনি আরও বলেন, এটি মুলত স্যাটেলাইটের ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে ছোট ছোট অ্যান্টেনা এবং রাউটারসদৃশ ডিভাইস দিয়ে ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে। এর ফলে তারের বা কেব্লের ঝামেলা থাকে না। সেবাগ্রহীতাকে সংযোগ নিতে একটি অ্যান্টেনা ও ডিভাইস কিনতে হয়। সেই অ্যান্টেনা বাসার ওপর বা বাইরে সেট করে ঘরের ভেতরে ডিভাইস দিয়ে কানেকশন নিতে হয়। তখন এটি ওয়াই-ফাই হিসেবে কাজ করে। ফলে বাসার বা ডিভাইসটির আশপাশের মোবাইল-ল্যাপটপসহ সব ডিভাইস এ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে।
কেমন দাম পড়তে পারে
যেহেতু এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে স্টারলিংকের সেবা দেওয়ার কার্যক্রম। তাই তাদের পক্ষ থেকে এখনো বাংলাদেশের জন্য কোনো দাম নির্ধারণ বা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়নি। তবে স্টারলিংকের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে রেসিডেন্সিয়াল লাইট প্যাকেজের মাসিক ব্যয় ৮০ ডলার এবং রেসিডেন্সিয়াল প্যাকেজের ব্যয় ১২০ ডলার। বাণিজ্যিক সংযোগের মাসিক ব্যয় ১৪০ ডলার থেকে শুরু করে ১ হাজার ৪৯৯ ডলার পর্যন্ত।
অন্যদিকে পাশের দেশ ভুটানেও সেবা দিচ্ছে সংস্থাটি। সেখানে দেখা যাচ্ছে, দেশটিতে স্টারলিংকের মূলত দুটি প্রকল্প চালু রয়েছে। সেগুলো হলো স্টারলিংক আবাসিক ও স্টারলিংক আবাসিক লাইট।
দৈনিক ব্রাউজিং, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার ও ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের ক্ষেত্রে বেশ লাভজনক আবাসিক লাইট প্যাকেজটি ব্যবহার করলে প্রতি মাসে গ্রাহককে দিতে হবে ৩ হাজার রুপি অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ৪ হাজার ২৬০ টাকা। এ ক্ষেত্রে ২৩ থেকে ১০০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট পাচ্ছেন তারা।
অন্যদিকে সাধারণ আবাসিক পরিকল্পনার খরচ কিছুটা বেশি। এই প্যাকেজের জন্য মাসে খরচ হবে ৪ হাজার ২০০ রুপি অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ৫ হাজার ৯৬৩ টাকা। তার বিপরীতে ২৫ থেকে ১১০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে স্টারলিংক। এই প্ল্যানে সীমাহীন ডেটা ব্যবহার করতে পারছেন গ্রাহক।
মাসিক এই ব্যয়ের আগে স্টারলিংক ব্যবহার করতে গেলে একধাপে বড় খরচ করতে হবে গ্রাহককে। সেটা হলো হার্ডওয়্যার ও রাউটার খরচ। সে ক্ষেত্রেও দুটি সুযোগ থাকবে- স্টারলিংক মিনি ও স্টারলিংক স্ট্যান্ডার্ড। খরচের বড় খাত এটি। এর মধ্যে স্টারলিংক মিনিতে বিল্ট ইন রাউটার থাকবে। এর জন্য ব্যয় হবে ১৭ হাজার রুপি অর্থাৎ বাংলা টাকায় ২৪ হাজার ১৪০ টাকা। এ ছাড়া হার্ডওয়্যারের জন্য ব্যয় হবে ৩৩ হাজার রুপি অর্থাৎ বাংলা টাকায় ৪৬ হাজার ৮৬০ টাকা।
ব্যয়ের এই হিসাব পর্যালোচনা করে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি ইমদাদুল হক খবরের কাজগকে বলেন, তাদের এই প্যাকেজ মূল্য দেখে বোঝা যায় বাংলাদেশেও আনলিমিটেড ইন্টারনেট পেতে গ্রাহককে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা হার্ডওয়্যার ও রাউটার খরচ বহন করতে হবে এবং এরপর প্রতি মাসে অন্তত ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ করতে হবে।
খরচের এই হিসাব উল্লেখ করে ইমদাদুল হক বলেন, বাংলাদেশের ব্যক্তিগ্রাহক এখন ব্রডব্যান্ডে যে ইন্টারনেট সেবা পান তা অত্যন্ত কম মূল্যের। সুতরাং তাদের জন্য এই খরচ বহন করা কঠিন।
দেশীয় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের জন্য হুমকি
ইলন মাস্কের সঙ্গে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ভিডিও কলে স্টারলিংক প্রসঙ্গে আলোচনা করেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। পরে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বাংলাদেশে স্টারলিংকের সেবা চালুর প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে স্টারলিংকের একটি প্রতিনিধিদল কাজ করছে বাংলাদেশে। তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি দেশি প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে। এই সহযোগিতার আওতায় জমি বরাদ্দ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্টারলিংক প্রতিনিধিদের সফরের ফলে তারা বাংলাদেশে সম্ভাব্য স্থানের তালিকা তৈরি করেছে। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব জায়গা ব্যবহার করতে চাইছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে হাইটেক পার্কের জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা চলছে। বাংলাদেশে উচ্চগতির ইন্টারনেট পরিষেবা বিস্তার করতে স্টারলিংকের সঙ্গে কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান অংশীদারত্বে যুক্তও হয়েছে।
এ অবস্থায় দেশীয় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে- এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ইমদাদুল হক খবরের কাজগকে বলেন, ‘স্টারলিংক এলে এই বাজারে একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। যেহেতু তাদের ইন্টারনেট সেবা গ্রহণের খরচ অনেক বেশি, তাই আমরা ব্যক্তিগ্রাহকদের নিয়ে চিন্তিত নই। তবে আমরা হয়তো বড় বড় করপোরেট গ্রাহক হারাব। এ ক্ষেত্রে যদি সরকার একটি নীতিমালা করে দেয়, যেমন- স্টারলিংক কেবল ঢাকার বাইরে কাজ করতে পারবে। তাহলে আমাদের জন্য সুবিধা হয়। না হলে দেশীয় অনেক উদ্যোক্তাই তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হবেন।’
আড়িপাতার শঙ্কা
স্টারলিংক আসার পর আড়িপাতার প্রবণতা থাকবে কি না বা ব্যক্তি তথ্যের সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অধিকারকর্মীরা আড়িপাতার টেলিযোগাযোগে বিরোধী থাকলেও কেউ কেউ রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনে সুনির্দিষ্টভাবে আড়িপাতার সুযোগ রাখার ক্ষেত্রে আপত্তি দেখান না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা হলো, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ আইনে আড়িপাতার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা ঢালাও ব্যবহার হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও পরিচালক বি এম মইনুল হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, আড়িপাতার সুযোগ রাখতে হলে সেটার জন্য স্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন। কারণ আড়িপাতা নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। কীভাবে আড়িপাতা হবে, কারা করবে, কাদের দায়বদ্ধ করা যাবে- এসব বিষয় সুনির্দিষ্ট না হলে সব আগের মতোই চলবে। এ সরকারের কাছে প্রত্যাশা, আড়িপাতা যেন সত্যিকারের আইনানুগ ও জবাবদিহিমূলক হয়।
বিটিআরসির নতুন নির্দেশিকা
স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেট সেবায় আইনানুগ আড়িপাতার সুযোগ রেখে নতুন একটি নির্দেশিকা জারি করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করলে সেখানেও আড়িপাতার সুযোগ থাকবে। নতুন নির্দেশিকা বা গাইডলাইনের নাম ‘রেগুলেটরি অ্যান্ড লাইসেন্সিং গাইডলাইনস ফর নন-জিওস্টেশনারি অরবিট (এনজিএসও) স্যাটেলাইট সার্ভিসেস অপারেটর ইন বাংলাদেশ’।
বিটিআরসির নির্দেশিকায় ২৬(৪) অনুচ্ছেদে আইনানুগ আড়িপাতা বা ল’ফুল ইন্টারসেপশনের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, নির্ধারিত জাতীয় সংস্থার প্রয়োজন অনুসারে লাইসেন্সধারী বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত তার ‘গেটওয়েতে’ প্রবেশাধিকার দেবে এবং আইনানুগ আড়িপাতার ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করবে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে লাইসেন্সধারী সরকারের নির্ধারিত সংস্থা বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তথ্য দেবে। এ ধরনের তথ্য দেওয়ার জন্য লাইসেন্সধারীর প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি থাকতে হবে।
নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকে টেলিযোগাযোগ আইন-২০০১, ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফি আইন-১৯৩৩, টেলিগ্রাফ আইন-১৮৮৫-এর পাশাপাশি অন্যান্য অধ্যাদেশ, বিধি ও নীতি মেনে চলতে হবে।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘স্টারলিংক চালুর উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। এতে ইন্টারনেট পরিষেবার বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এর ফলে গ্রাহক ভলো সেবা পাবেন এবং গ্রাহক তার পছন্দের সেবা বেছে নিতে পারবেন। স্টারলিংক বাজারে এলে বর্তমানে ইন্টারনেট নিয়ে দেশে যে মনোপলি ব্যবসা ও হয়রানি চলছে তা ভেঙে যাবে। দাম কিছুটা বাড়লেও গ্রাহকরা দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পাবেন। একই সঙ্গে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল তথা দুর্গম এলাকায় পৌঁছে যাবে ইন্টারনেট সেবা। স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবায় গ্রাহকরা অনলাইন গেমিং এবং ভিডিও কলিংয়ের মান ভালো পাবেন।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্টারলিংক শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই বদলাবে না, বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ নানা খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশেষত, এটি সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনতে পারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে ফাইবার অপটিক পৌঁছানো কঠিন। স্টারলিংকের মাধ্যমে সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে ইন্টারনেট সরবরাহ করা সম্ভব হবে।