রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকার অধিকাংশ সড়কেই রয়েছে সড়কবাতি বা ল্যাম্পপোস্ট। কিন্তু এ সড়কবাতির অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে জ্বলছে না। এর ফলে সন্ধ্যার পর ওইসব এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই সুযোগ নেয় অপরাধীরা। অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা বেছে নিয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে চোর, ডাকাত ও ছিনতাইকারীরা।
ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর ল্যাম্পপোস্টগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগ বাতিই ভাগই জ্বলে না। অনেক সড়কে সিসি ক্যামেরাও নেই। এমনকি পুলিশ টহলও অনেক এলাকায় অনিয়মিত। এ কারণে ওইসব এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অন্ধকার সড়কগুলো হয়ে ওঠে অপরাধীদের নিরাপদ অভয়াশ্রম। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে ছিনতাই, ইভটিজিং, চুরি-ডাকাতি এমনকি হত্যার মতো ঘটনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মধ্যরাত থেকে শেষ রাত পর্যন্ত ছিনতাইকারীরা সড়কে বেশি সক্রিয় থাকে। অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়কে অপরাধীরা ওত পেতে বসে থাকে। এ সময় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ফজরের নামাজে যাওয়া মুসল্লি, দূরপাল্লার যাত্রীরা (ঢাকায় ফিরছেন, অথবা ঢাকা থেকে যাচ্ছেন), মাছবাজারে যাওয়া ব্যবসায়ী কিংবা পণ্যবাহী গাড়ির চালকরাই প্রধান টার্গেট হচ্ছে অপরাধীদের।
নগরবাসীর অভিযোগ, বারবার অভিযোগ করলেও সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে না। রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, মুগদা, পুরান ঢাকার কিছু এলাকায় সড়কবাতি নষ্ট থাকায় চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেড়ে গেছে। এলাকাগুলোতে মোটরসাইকেল গ্যাং ও ছিনতাইকারী চক্র নির্বিঘ্নে অপরাধ করে পালিয়ে যাচ্ছে।
‘রাত ১১টার পর রাস্তায় চলা মানে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া’- এমন মন্তব্য করেছেন উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আমার বন্ধু গত সপ্তাহে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে। সড়কবাতিগুলো নষ্ট থাকায় একেবারে অন্ধকার ছিল, পাশে কোনো টহল পুলিশও ছিল না।’
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বহু সড়কে মাসের পর মাস ধরে সড়কবাতি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। আসাদগেট থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড হয়ে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, বসিলা, গাবতলী ও মিরপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে অনেক সড়কবাতি জ্বলছে না। এসব স্থানে প্রায় প্রতিদিনই চুরি-ছিনতাই-মাদক লেনদেনের ঘটনা ঘটছে। এসব এলাকা থেকে গত ১৯ জুন ডাকাতি, মাদক কেনাবেচা, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ২০ জুন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে পান্থপথ-কারওয়ান বাজার হয়ে হাতিরঝিলের মোড় থেকে সাত রাস্তার সড়কেও বাতি নষ্ট অবস্থায় দেখা গেছে। বিজয় সরণি থেকে উত্তরার দিকে যাওয়ার প্রধান সড়কের একাধিক স্থানে ল্যাম্পপোস্ট বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। এই সড়কের বিভিন্ন স্থানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সড়কবাতির বিষয়গুলো সিটি করপোরেশন দেখে থাকে। সাধারণত অন্ধকার বা নির্জন এলাকাগুলোতেই পেশাদার অপরাধীরা নানা তৎপরতা চালিয়ে থাকে। তবে ডিএমপি সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি ও টহল পরিচালনা করে থাকে।’
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দাবি, সড়কের বাতি মেরামতের কাজ চলছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা গত এক মাস কোনো কাজ করতে পারছি না। পরিবেশ (বিএনপি নেতা ইশরাকের আন্দোলন ইস্যু) স্বাভাবিক হলে আমরা এসব সমস্যার সমাধান করব।’
একই বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা চলমান একটি প্রক্রিয়া। উত্তর সিটি করপোরেশন আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে যেসব ল্যাম্পপোস্টে বাতি বন্ধ অথবা খারাপ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, আমাদের পক্ষ থেকে সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সড়কের বাতি ঠিক করা হচ্ছে।’
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু বাতি জ্বালানোই নয়, রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত তদারকি না থাকলে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অন্ধকার শহরের এই চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
‘অন্ধকারে অপরাধ বাড়ে- সরকার কেন এমন সুযোগ দেবে?’- এমন প্রশ্ন রেখেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আধুনিক শহরের গুরুত্ব বহন করে সড়কবাতি। নগরের মানুষের নির্বিঘ্নে চলাফেরার জন্য ল্যাম্পপোস্ট বাতিগুলো সচল থাকা প্রয়োজন। না হলে শহর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, অন্ধকারে অপরাধ বাড়ে। সড়কবাতি ঠিক থাকলে অপরাধীরা অপরাধ করার সুযোগ নিতে পারবে না। সরকার সে সুযোগ কেন দেবে? মানুষের নিরাপত্তার জন্য এ বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।’
প্রসঙ্গত, গত ২০ জুন রাতে রামপুরায় ছিনতাইকারীরা আল মামুন নামে এক ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যায়।
স্বজনরা জানান, বাগিচারটেক ৩ নম্বর গলির আনসার ক্যাম্পসংলগ্ন জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় স্থানীয় কিছু মাদকসেবী ও ছিনতাইকারী তার মাথায় ছুরিকাঘাত করে। এর কিছু দিন আগে ১৫ জুন ভোর ৫টার দিকে আরামবাগ বাস কাউন্টার থেকে চকবাজার যাওয়ার সময় আরামবাগ এলাকায় মো. মুজাহিদুল ইসলাম (২৫) নামে এক দোকান কর্মচারীকে ছুরিকাঘাত করে তার সঙ্গে থাকা টাকা নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ১৪ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় সাগর আহমেদ (৩২) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে মোটরসাইকেল ও ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এরকম আরও অনেক ঘটনার খবর পাওয়া যায়, যেগুলোর অধিকাংশই রাত থেকে ভোররাতের মধ্যে ঘটেছে বলে জানা যায়।