এক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আদাবরে দুটি হত্যার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বুধবার রাতে ওই দুই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
ডিম ভাঙার দ্বন্দ্ব নিয়ে ডাকা সালিশি বৈঠকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে আদাবরে। অন্যদিকে পুলিশকে তথ্য দিয়ে মাদক কারবারিকে ধরিয়ে দেওয়ায় পায়ের রগ কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে মোহাম্মদপুর থানার চাঁদ উদ্যান এলাকায়। এই দুই খুনের ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গুলি করে হত্যার ঘটনায় রাজীব (২০) ও রুবেল (২২) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে পায়ের রগ কেটে হত্যার ঘটনায় মোশারফ (২৫) ও গিট্টু (২৪) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত বুধবার রাত ৮টার দিকে নবোদয় হাউজিংয়ের ‘এ’ ব্লকে মো. ইব্রাহিমকে (৩৫) ও রাত ৯টার দিকে চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে আল-আমিনকে (২৮) পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) নবোদয় ও চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে গিয়ে দেখা যায়, এই দুই হত্যাকাণ্ডের পর এলাকার সাধারণ মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন। ঘটনাস্থলের পিচঢালা সড়কে তখনো রক্তের দাগ লেগে ছিল। নবোদয় হাউজিংয়ে বিকেলে বায়তুল মামুর জামে মসজিদের সামনে ইব্রাহিমের জানাজা পড়ানো হয়। সেখানে এলাকার মানুষ ভিড় জমান।
সালিশে উপস্থিত থাকা ইব্রাহিমের বন্ধু সুজন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইব্রাহিমের ভাগনে জুয়েল ভ্যানগাড়িতে ডিম বিক্রি করেন। কয়েক দিন আগে দুর্ঘটনায় ভ্যান উল্টে যায় ও এক হাজার ডিম ভেঙে যায়। এ ঘটনা জানতে পেরে ডিমের মালিক রাজীব ও রুবেল তার কাছে ক্ষতিপূরণ চান।
জুয়েল বিষয়টি ইব্রাহিমকে জানালে এলাকায় এ নিয়ে গত বুধবার রাতে বায়তুল মামুর জামে মসজিদের সামনে একটি সালিশ ডাকা হয়। সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভাঙা ডিমের আংশিক ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হন ইব্রাহিম। তবে সালিশের সময় রাজীব ও রুবেলের সঙ্গে ইব্রাহিমের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে রাজীব পকেট থেকে পিস্তল বের করে ইব্রাহিমের বুকে গুলি করেন। এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা রাজীব ও রুবেলকে ধরে ফেলেন এবং ঘটনাস্থলে আসা পুলিশের হাতে তুলে দেন।
নিহত ইব্রাহিম পেশায় একজন প্রাইভেট কারচালক ছিলেন। স্বামীকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার স্ত্রী লাইজু। খবরের কাগজকে লাইজু বলেন, ‘আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই। আমার তিন বছরের ছেলেকে কে দেখবে? আমার সোনার সংসার শেষ হয়ে গেল। আল্লাহ তুমি কই, বিচার করো।’
স্থানীয়রা জানান, এই দুই খুনের ঘটনার পর থেকে তারা আতঙ্কে আছেন। প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। সেনা ক্যাম্প বসার পর এই এলাকায় সন্ত্রাসীদের উৎপাত কমলেও এখন আবার বেড়েছে।
নবোদয় হাউজিংয়ের মসজিদের খাদেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারের কাছে জোর দাবি- সন্ত্রাসীদের ধরেন। এলাকার মানুষ নিরাপত্তা চায়। শান্তিতে ঘুমাতে চায়।’
এ বিষয়ে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম জাকারিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘গুলি করে হত্যা করার ঘটনায় রাজীব ও রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তারা ডিম ব্যবসায়ী। তবে তারা অস্ত্রধারী। তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। আজ কোর্টে পাঠানো হয়েছে।’
চাঁদ উদ্যানে পুলিশের সোর্সকে পায়ের রগ কেটে হত্যা
চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে এক মাদক কারবারিকে ধরিয়ে দেওয়ায় আল-আমিনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম খবরের কাগজকে বলেন, আল-আমিন ছিল পুলিশের সোর্স। পুলিশকে তথ্য দেওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার কয়েক দিন আগে থেকেই তাকে হুমকি দিয়ে আসছিল সন্ত্রাসীরা।
তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদপুর এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী চক্র দমনে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে শহরজুড়ে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।’
এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) কর্মকর্তা আলী ইফতেখার হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার কিশোর গ্যাংয়ের লিডার মোশারফের এক ছোট ভাইকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেন আল-আমিন। এ কারণে মোশারফ, গিট্টুসহ আরও কয়েকজন মিলে চাঁদ উদ্যানের ৬ নম্বর রোডে তার পথরোধ করে পায়ের রগ কেটে হত্যা করে।’
তিনি বলেন, “হত্যার আগে থেকেই আল-আমিনের মায়ের ফোনে মোশারফ হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। তারা বলেছিল, ‘তোর ছেলের পা কেটে ফেলব।’ তারা সত্যিই ভিকটিমের পা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।”
ওসি জানান, মোশারফ ও গিট্টু মাদক কারবারি। এ বিষয়ে থানায় একটি মামলা হয়েছে।