একসময়ে সরকারি কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মানেই জিকে শামিমের জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি, তমা কনস্ট্রাকশনসহ মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হতো। তাদের কবজায় ছিল সরকারি কাজ ও কেনাকাটা। সরকার পরিবর্তনের পর সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারি কেনাকাটায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এ জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা বা পিপিআর-২০০৮-এর বিদ্যমান ১৩০ বিধির মধ্যে ৮৮টির পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুনভাবে সংযোজন করা হয়েছে ১২টি বিধি। অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে ১০ শতাংশ প্লাস-মাইনাস মূল্যসীমা বিলোপ করে বড় ঠিকাদারকে বেশি যোগ্য করার মার্কিংয়ের বাড়তি সুবিধা দেওয়াসহ চারটি বিধি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধন করা হবে বিদ্যমান আটটি তফসিল। এ ব্যাপারে সারা দেশের অংশীজনের মতামত নেওয়ার জন্য ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ওয়েবসাইটে ড্রাফট কপি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) সূত্র জানায়, দেশে সরকারি ক্রয় পরিবেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং সরকারি ক্রয়ে পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটকে (সিপিটিইউ) রূপান্তর করে বিপিপিএ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকার ২০২৩ সালে যে টেকসই সরকারি ক্রয় (এসপিপি) নীতিমালা জারি করেছে, বিপিপিএ তা বাস্তবায়নে কাজ করছে। সরকারি ক্রয় ডিজিটালাইজ করার লক্ষ্যে বিপিপিএ (সিপিটিইউ) ২০১১ সালে ই-জিপি সিস্টেম চালু করে। এর পর থেকে এই ইলেকট্রনিক সিস্টেমের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৯ লাখ ৫৭ হাজার ৯১০টি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ই-জিপি সিস্টেম প্রশংসা অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে ১১টি দেশ এবং পাঁচটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের ই-জিপি অভিজ্ঞতা নিতে বিপিপিএ পরিদর্শন করেছেন।
সরকারি ক্রয় আইনের (পিপিএ-২০০৬) অধিকতর সংশোধনকল্পে গত ৪ মে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেন। এরপর তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। আইন অনুসারে সংশোধনীগুলো বাস্তবায়নের জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০০৮ সংশোধনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি সূত্র আরও জানায়, দীর্ঘদিন ধরে দরপত্রদাতা, ব্যবসায়ী সমাজ, ক্রয়কারী সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে পিপিএতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করেছে। এতে রয়েছে ওপেন টেন্ডারিং মেথডের (ওটিএম) আওতায় অভ্যন্তরীণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ মূল্যসীমা (ভ্যালু ক্যাপ) অর্থাৎ অফিসের ধার্যকৃত খরচের সঙ্গে ১০ ভাগ কম বা বেশি ধরে টেন্ডারের সিস্টেম বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ঠিকাদারের আর্থিক সক্ষমতা, কাজের অভিজ্ঞতাসহ অন্য যেসব সুবিধা বাড়তি বলে মনে হতো, তা আর থাকবে না। এর ফলে ছোট ঠিকাদাররা কাজ পাবেন।
ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) সিস্টেমের বাধ্যতামূলক ব্যবহার, নির্বাচিত ঠিকাদার বা সরবরাহকারীর মালিকানার তথ্য প্রকাশ, ভৌতসেবা (ফিজিক্যাল সার্ভিস) পৃথক প্রকিউরমেন্ট শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্তকরণ, সাধারণ কাজ ও পরামর্শক সেবাকে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির আওতায় আনা, উন্নয়ন প্রকল্পে প্রকিউরমেন্ট কৌশলের আলোকে সার্বিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, রিভার্স অকশন পদ্ধতি চালু এবং আইনগতভাবে টেকসই সরকারি ক্রয়-এসপিপিকে স্বীকৃতি দেওয়া। পিপিএতে আনা পরিবর্তনের আলোকে পিপিআরে কী কী সংশোধন প্রয়োজন তা পর্যালোচনা করছে বিপিপিএ। পিপিএ-২০০৬-এর অধিকতর সংশোধনকল্পে অধ্যাদেশ ইতোমধ্যে বিপিপিএর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
পিপিআর-২০০৮-এর প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো চূড়ান্ত হওয়া সাপেক্ষে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে কার্যকর করা মাত্রই ক্রয়কারী সংস্থা ও অন্য অংশীজনরা সংশোধিত এবং হালনাগাদ করা ক্রয়বিধান অনুসারে ক্রয়কার্য সম্পাদন করতে পারবেন।
এ ব্যাপারে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ এবং মূল্যায়ন বিভাগের সচিব মো. কামাল উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এর ৮৭ শতাংশ সংশোধন হচ্ছে; যেমন সিপিটিইউ থেকে বিপিপিএ হচ্ছে। এভাবে ১৩০ ধারার মধ্যে ৮৮টি ধারার সংশোধন আনা হচ্ছে। এ পর্যন্ত তিনটি সেক্টরে পিপিআর কার্যকর ছিল- ওয়ার্কস, গুডস ও সার্ভিস খাত। এবার সার্ভিস খাতকে ভৌত সার্ভিস ও বুদ্ধিবৃদ্ধিক বা ইন্টেলেকচুয়াল সার্ভিস দুই ভাগ করা হচ্ছে। এলটিএম পদ্ধতিতে খরচের বিষয়টি ৩ কোটি থেকে ৭ কোটিতে আনা হচ্ছে। ১৬ বছরের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন খাতে খরচ বেড়ে গেছে। এ জন্যই ৪ কোটি টাকা বেশি খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। অথরিটি বা টেন্ডারকারীদের জন্য নগদ ক্রয় ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এভাবে সরকারি কেনাকাটায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ন্যাশনাল ট্রেইনার, এলজিইডি, নারী উদ্যোক্তা; বিভিন্ন পর্যায়ে সবার মতামত নেওয়ার জন্য সভা করা হচ্ছে। সবশেষে আন্তমন্ত্রণালয় সভা হবে। ৫০ জন সচিবের মতামত নেওয়া হবে। মোট ১১টি ধাপ অতিক্রম করার ব্যবস্থা আছে। সাত বিভাগীয় পর্যায়েও পরামর্শক সভা করা হবে। সরকারি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে যারা যুক্ত আছেন তাদের সবার সঙ্গে পর্যালোচনা করে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে ৮০ শতাংশের বেশি সংশোধিত হচ্ছে। সবার মতামত নিয়ে পিপিআর চূড়ান্ত করা হবে।’