সোমবারের (১১ আগস্ট) ঘটনা। ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা ৭টা। একটি ট্রাকে কলাবোঝাই করে খাগড়াছড়ি শহর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন ব্যবসায়ী আয়নাল হোসেন। ধীরগতিতে ঊর্ধ্বমুখী সড়কে এগোতে শুরু করে কলাবোঝাই ট্রাকটি। শহরের অদূরে চেঙ্গী ব্রিজ পার হয়ে খানিকটা যাওয়ার পর হাতির কবরের সামনে দুই পাহাড়ি যুবক ট্রাকটি থামাতে ইশারা দিলেন। চালক ফয়জুল আলম ট্রাক থামাতে থামাতে কলা ব্যবসায়ী আয়নাল হোসেনকে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘ভাই, এখানে থামতে হবে। নইলে মালও নামিয়ে নেবে, গাড়িও আটকে রাখবে।’ সেখানে আয়নাল হোসেনকে মোটা অংকের চাঁদা দিতে হয়।
এরপর আলুটিলা পার হয়ে আরও কিছুদূর এগোলে সাপমারা এলাকায় ফের আরেকটি গ্রুপ গাড়ি থামানোর ইঙ্গিত দেয়। সেখানেও ব্যবসায়ী জয়নালকে চাঁদা দিতে হয়। খাগড়াছড়ির অভ্যন্তরীণ কিংবা শহরমুখী প্রতিটি সড়কেই রয়েছে এমন বেশ কিছু চেকপোস্ট। সেসব চেকপোস্টে এভাবে দফায় দফায় দাঁড় করানো হয় যেকোনো পণ্যবাহী পরিবহন। তবে এসব চেকপোস্ট পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনীর নয়, এগুলো পৃথক চারটি সশস্ত্র পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঘোষিত টোলঘর। এসব টোলঘর থেকে খাগড়াছড়িতে বছরে শত শত কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে ইউপিডিএফ ও জেএসএসের বিভক্ত চারটি গ্রুপ। তবে পাহাড়ে চাঁদাবাজির ঘটনা সত্যি হলেও বিষয়টি নিয়ে পুলিশের কাছে কেউ অভিযোগ করেন না বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল।
চাঁদার শিকড়
শান্তি-সম্প্রীতি স্থাপনের ওয়াদা দিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হলেও এখনো অশান্ত পার্বত্যাঞ্চল। বরং হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, উন্নয়নকাজে বাধা প্রদান, বেপরোয়া চাঁদাবাজি এবং নাশকতামূলক তৎপরতা আগের চেয়ে আরও বেশি প্রকট হয়েছে। ‘অধিকার আদায় আর মুক্তির সংগ্রাম’ এই স্লোগানে শত শত কোটি টাকার প্রকাশ্য চাঁদাবাজি চলছে পার্বত্য জনপদে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে চাঁদাবাজি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
শুরুতে ‘সংগঠনের তহবিল’ নামে সীমিত পরিসরে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আগে শুধু শান্তি বাহিনীকেই চাঁদা দিতে হতো। তবে এখন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় ইউপিডিএফ ও জেএসএসের বিভক্ত চারটি গ্রুপ আলাদা আলাদা এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বছরে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি চাঁদাবাজি করছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্রগুলো। এই চারটি সংগঠনের সশস্ত্র হুমকির মুখে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন এখানকার সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিসহ সব পেশাজীবী। তাই প্রাণভয়ে ধার্যকৃত চাঁদা পরিশোধেও বাধ্য হন সবাই। অন্যথায় ঘটানো হয় হত্যা কিংবা অপহরণের মতো নৃশংস ঘটনা।
চাঁদার খাত
সরকারি সব উন্নয়নকাজ, পাহাড়ের আবাদি জমি, ফলদ ও বনজ বাগান, হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ, যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহন, মুরগি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সরকারি চাকুরে, কৃষক থেকে শুরু করে দিনমজুর-কেউই রেহাই পাচ্ছেন না চাঁদাবাজির কবল থেকে। বলা চলে, বসতভিটা থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার সব মাধ্যমেই ইচ্ছামতো চাঁদার হার বসিয়ে তা জোরপূর্বক আদায় করে নিচ্ছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো।
কাঠ ব্যবসায়ী মিন্টু চাকমা (ছদ্মনাম) জানান, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে সমতলে এক ট্রাক গোল কাঠ নিয়ে যেতে চার সংগঠনকে ৫৫ হাজার ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এর মধ্যে ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপকে ১৮ হাজার, জেএসএস সন্তু গ্রুপকে ২২ হাজার, জেএসএস সংস্কারকে ১০ হাজার এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক গ্রুপকে দিতে হয় ৫ হাজার ৫০০ টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাগড়াছড়ির একজন ট্রাকমালিক জানান, আকারভেদে সাধারণ ট্রাকপ্রতি বছরে ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপকে ৬-৮ হাজার, জেএসএস সংস্কারকে ৫-৬ হাজার, জেএসএস সন্তু গ্রুপকে ৫-৬ হাজার এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিককে ৪-৫ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হয়।
খাগড়াছড়ি ট্রাক মালিক সমিতির অধীনে সাড়ে চার শতাধিক ট্রাক রয়েছে। শুধু ট্রাক থেকেই চারটি আঞ্চলিক সংগঠন বছরে চাঁদা আদায় করছে দেড় থেকে ২ কোটি টাকা। বাস, সিএনজি, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, মাহিন্দ্রা, চাঁদের গাড়ি ও পিকআপ মিলিয়ে চার সংগঠনকে দিতে হয় অন্তত ৮-১০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় করা হয় সরকারি উন্নয়ন খাত থেকে।
ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রতিটি উন্নয়নকাজে সরকারি বরাদ্দের ১৩-১৫ শতাংশ চাঁদা নেয় ইউপিডিএফ ও জেএসএসের বিভক্ত চারটি গ্রুপ।
খাগড়াছড়ির কয়েকজন ঠিকাদার জানান, এই খাতে ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপ ও জেএসএস সন্তু গ্রুপকে ৫ শতাংশ করে মোট ১০ শতাংশ, জেএসএস সংস্কার গ্রুপকে ২-৩ শতাংশ এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিককে ১-২ শতাংশ হারে চাঁদা দেওয়া লাগে।
সরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা নিউটন চাকমা। খুব আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার বেতন দেয়, আর সেই বেতন থেকে আমাদের চাঁদাবাজদের কর দিতে হয়। চাকরির স্কেলভেদে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব সরকারি চাকরিজীবীর ওপর চাঁদা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বছরে জনপ্রতি গড়ে চারটি আঞ্চলিক সংগঠনকে ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর দিতে হচ্ছে।’
চলতি বছরের শুরুতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। খাগড়াছড়িতে এক মোবাইল অপারেটরের প্রতিনিধির দাবি, ইউপিডিএফ ও জেএসএস তাদের কাছে ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় সব টাওয়ারের সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে এবং মানিকছড়ি থেকে দুই কর্মচারীকে অপহরণ করা হয়েছে।
এভাবে কলা, মুলা কিংবা মুরগি থেকে শুরু করে প্রতিটি ব্যবসা থেকেই চাঁদা দিতে হয় আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে। জাতি, ধর্ম এবং বর্ণ নির্বিশেষে অঘোষিত এক করের বোঝা বহন করে চলেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দারা। এ নিয়ে বাঙালিদের পাশাপাশি সাধারণ পাহাড়িদেরও অভিযোগ রয়েছে। তারা বলছেন, মূলত মুখে জুম্ম জাতির অধিকার আদায়ের কথা বললেও চাঁদার রাজ্যে আধিপত্যকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে বিভক্ত আঞ্চলিক দলগুলো। চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রে এই চারটি গ্রুপেরই আদর্শ-উদ্দেশ্য আসলে অভিন্ন।
যেভাবে ১ থেকে ৪ সংগঠনের সৃষ্টি
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগে তৎকালীন গেরিলা বাহিনী (শান্তি বাহিনী) প্রধান ও বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ছিল পাহাড়িদের একক আঞ্চলিক সংগঠন। সেই সময়ে প্রসিত বিকাশ খীসা ছিলেন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের সহযোগী ছাত্রসংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি। ১৯৯৭ সালে সরকারের সঙ্গে জেএসএসের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর ইস্যুতে সন্তু লারমা এবং প্রসিত খীসার মধ্যে বিরোধের সূচনা হয়। আর সেই বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয় ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। পার্বত্য চুক্তির শর্তানুযায়ী ওই দিন গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে অস্ত্র সমর্পণ করেন শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। আর ঠিক তখনই খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শত শত কালো পতাকা উত্তোলন করে অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানকে ধিক্কার জানান প্রসিত খীসার অনুসারীরা। পরবর্তী সময়ে ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীতে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সন্তু লারমার জেএসএস থেকে বিভক্ত হয়ে জন্ম নেয় প্রসিত বিকাশ খীসার ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। নতুন ওই সংগঠনটির স্লোগান ছিল- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চাই’।
ইউপিডিএফ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সংগঠনের সংখ্যা এক থেকে বেড়ে দুটিতে পরিণত হয়। পরে টানা এক যুগ ধরে নতুন করে আর কোনো আঞ্চলিক দলের সৃষ্টি না হলেও ২০১০ সালের এপ্রিলে এসে ফের বিভক্তি দেখা দেয় সন্তু লারমার জেএসএসে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর চাঁদার ভাগ-বাঁটোয়ারার দ্বন্দ্বে জেএসএসের তৎকালীন দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সুধাসিন্দু খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় জেএসএস সংস্কার বা এমএন লারমা গ্রুপ।
জেএসএসের দ্বিতীয় বিভক্তির আরও সাত বছর পর ভাঙনের কবলে পড়ে প্রসিত খীসার ইউপিডিএফ। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ইউপিডিএফ বিভক্ত হয়ে সৃষ্টি হয় গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ নামে নতুন আরেকটি আঞ্চলিক সংগঠনের। প্রতিবার আঞ্চলিক সংগঠনের এই বিভক্তি নতুন করে একটি একটি করে ভাঁজ ফেলেছে পাহাড়ের সাধারণ নাগরিকদের কপালে। চাঁদার রাজ্যে এক এক করে যোগ হয়েছে শঙ্কার নতুন নাম। বর্তমানে সন্তু লারমার জেএসএস থেকে বিভক্ত হওয়া এই চারটি আঞ্চলিক সংগঠনের বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন পাহাড়ি-বাঙালি সবাই।
তবে আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা বরাবরই চাঁদা আদায়ের কথা অস্বীকার করে আসছেন এবং এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দোষারোপ করে সহজেই দায় এড়িয়ে নিচ্ছে। চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে উত্তরে তারা বলেন, শুধু জুম্ম জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে অংশগ্রহণমূলক সহযোগিতা নেওয়া হয়ে থাকে। জুম্ম জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম তহবিলে সেই টাকা যোগ করা হয়।
মূলত, চাঁদার রাজ্যে আধিপত্য বিস্তারের নেশায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। হিংসা-হানাহানি, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য অব্যাহত রেখেছে সব কটি সংগঠন। নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতও থেমে নেই। সন্ত্রাস দমনে পার্বত্যাঞ্চলে নিয়োজিত সেনাবাহিনীও যথেষ্ট তৎপর। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে বেশির ভাগ সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেওয়ায় এসব সন্ত্রাসী সংগঠন আগের চেয়ে বেশি বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে। সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের পর থেকে এ অঞ্চলে খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল বলেন, ‘পাহাড়ে আঞ্চলিক সংগঠনের চাঁদাবাজির বিষয়টি সত্যি হলেও ভয়ে আমাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেন না। এখানকার ভৌগোলিক জটিলতা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বেশ কঠিন। তবু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করছে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলাও রুজু করা হচ্ছে।