বিমানবন্দর মূল্যায়নে ভালো অবস্থান অর্জনের কথা জানানোর ৫ দিনের মাথায় বড় রকমের বিপর্যয় ঘটল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। মূল্যায়নে শতভাগ নম্বর অর্জন করা ‘কার্গো ভিলেজ’ দাউ দাউ করে জ্বলল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনায় বিমানবন্দরের সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা দেশের ভাবমূর্তির জন্য এক বড় ধাক্কা।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। দ্রুততম সময়ের মধ্য ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট। আগুন নেভাতে গিয়ে আহত হন ১৭ জন আনসার সদস্য। আগুন লাগার পরপরই শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বিমান ওঠানামা সাময়িক স্থগিত করা হয়। পরে ৮টি বিমান ঢাকার পরিবর্তে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অবতরণ করানো হয়।
গত ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত আগস্ট মাসে যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্ট (ডিএফটি) পরিচালিত বিমানবন্দর মূল্যায়নে দেশের বিমানবন্দরগুলো ভালো অবস্থান অর্জন করেছে। এই অর্জন অসাধারণ সাফল্য। ডিএফটি মূল্যায়ন দল বেবিচকের প্রস্তুতি ও কার্যক্রমে গভীরভাবে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সামগ্রিক মূল্যায়নে ৯৩ শতাংশ এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা (কার্গো) মূল্যায়নে ১০০ শতাংশ নম্বর অর্জন করেছে। একইভাবে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট সামগ্রিকভাবে ৯৪ শতাংশ এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা (কার্গো) মূল্যায়নে ১০০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে।
ডিএফটি এয়ারপোর্ট অ্যাসেসমেন্ট হলো যুক্তরাজ্য সরকারের একটি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বিদেশি বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রী ও কার্গো নিরাপত্তা মানদণ্ড যাচাই করা হয় এবং যুক্তরাজ্যের চাওয়া অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করা হয়।
এই মূল্যায়নের কয়েক দিনের মাথায় কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা চেম্বার উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাজ্য সরকারের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্ট (ডিএফটি, ইউকে) পরিচালিত মূল্যায়নে কার্গো নিরাপত্তাব্যবস্থায় শতভাগ নম্বর পাওয়ার পর এই দুর্ঘটনা বিমানবন্দরের ভাবমূর্তির জন্য বড় এক ধাক্কা। যদিও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কার্গো নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি প্রমাণ করে, তবে এই অগ্নিকাণ্ড সেই সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যে এবং এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় এড়াতে অবকাঠামো ও নিরাপত্তা প্রোটোকলের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর প্রভাব এড়াতে দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে দেশের অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কাজে লাগানোসহ দেশের অভ্যন্তরীণ বিকল্প বন্দর পথে কার্গোসহ অন্যান্য সেবার ওপর ডিসিসিআই জোর দিচ্ছে।’
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান পরিচালনা বোর্ডের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘এটি একটি বড় ঘটনা। আমরা জেনেছি বেলা ২টার দিকে আগুন লেগেছে। রাত ৮টায়ও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিমানবন্দরের মতো জায়গায় যদি এ রকম হয়, তাহলে বাইরে কী হবে?’
তিনি বলেন, ‘ইমপোর্ট কার্গো ভিলেজে কোটি কোটি টাকার সম্পদ থাকে। সেগুলোর নিরাপত্তার বড় ব্যাপার রয়েছে। এখানে শুধু কার্গো পুড়েছে তা নয়, ইমপোর্ট কার্গো মানে যেখানে একটা এয়ারলাইনের যেমন প্যাসেঞ্জার আসে, প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে ১৫-২০ টন করে মালামাল আসে। ইমপোর্ট কার্গোতে বিদেশ থেকে সব মূল্যবান মালামাল আসে। সেগুলো ওখানে স্টোরেজ করা থাকে। সেগুলো ড্যামেজ হওয়া মানে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া। এই ঘটনায় আমাদের সক্ষমতার ব্যাপারে বহির্বিশ্বে ডেফিনেটলি একটি বড় ধরনের নেগেটিভ ম্যাসেস দেবে। সব মিলিয়ে আমাদের জন্য এটা একটা বড় ধরনের বিপর্যয় বলে মনে করি। খুব ভালো সংকেত দেবে না এই ঘটনা।’
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিক একটু ধাক্কা লাগবে। তবে আমি মনে করি না খুব একটা ঝামেলা হবে। দেখতে হবে যে তাদের পলিসি ঠিক ছিল কি না। পলিসিতে যদি গলদ থাকে তাহলে আমাদের জন্য অ্যালার্মিং। আরেকটা কথা বলতেই হবে, সেটি হচ্ছে আমরা কার্গো স্পেসটা নতুন করে করতে যাচ্ছি, কার্গো স্পেস ওভার ক্রাউডেড হয়ে গেছে। সেখান থেকে ঘটনা ঘটল কি না, বলা যায় না।’
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলো বাংলাদেশের প্রধান এবং বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা রাজধানী ঢাকার উত্তরাঞ্চলীয় কেন্দ্র থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে কুর্মিটোলায় অবস্থিত। বিমানবন্দরটি ৮০২ হেক্টর (১ হাজার ৯৮১ একর) এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, এর বার্ষিক যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ এবং কার্গো টার্মিনালের বর্তমান ধারণক্ষমতা বার্ষিক ২ লাখ টন।