বিগত ৩৬ বছরেও হয়নি রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ নির্বাচন। দীর্ঘ এই সময়ে জেলা পরিষদগুলো চলছে অনির্বাচিত দলীয় ব্যক্তিদের দিয়ে। জবাবদিহি না থাকায় নিয়োগপ্রাপ্তরা বরাবরই জড়িয়ে পড়েন নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে। এতে সুষম উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন পাহাড়ের লাখ লাখ মানুষ। একই সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধি না আসায় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কাঙ্ক্ষিত জনআস্থা অর্জন করতে পারেনি। তবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি দুর্নীতির লাগাম টানতে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে দুদকের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ শুরু হয়েছে তদন্ত কার্যক্রম।
১৯৮৯ সালে ‘স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন’ করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলাকে দেশের উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত করতে উদ্যোগ নেয় সরকার। সে বছরের ২৫ জুন অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ও শেষবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন। এরপর ৩৬ বছর ধরে অনির্বাচিত দলীয় ব্যক্তিদের দিয়ে চলছে অন্তর্বর্তী পরিষদ। এতে প্রতিবছর জেলা পরিষদগুলোর কয়েক শ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে গড়ে উঠেছে দুর্নীতির দুষ্টচক্র।
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পরিচালিত হয় বিশেষ আইন দ্বারা, যা দেশের ৬১ জেলা পরিষদ থেকে ভিন্ন। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আইনে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ জেলা পরিষদের অধীন করা হয়েছে। চুক্তির আইনে ৫ বছর মেয়াদি জেলা পরিষদগুলোর নির্বাচনের কথা বলা আছে। এতে একজন চেয়ারম্যান ও ৩৩ জন সদস্য আনুপাতিকহারে নির্বাচিত হবেন। কিন্তু চুক্তির স্বাক্ষরকারী দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা নিয়ে আলাদা ভোটার তালিকা’ দাবি তুলে। এই সুযোগে বিগত সরকারগুলো কৌশলে নিজেদের দলীয় লোকদের দিয়ে বিভিন্ন আকারে ‘অন্তর্বর্তী পরিষদ’ গঠন করে আসছে। ফলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ঘটনা বাড়তে থাকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগ-বদলি ও পদায়নবাণিজ্য, বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য বরাদ্দ আর উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লোপাট, এই প্রধান তিনটি খাতই হচ্ছে জেলা পরিষদগুলোর দুর্নীতির মূল উৎস। নিয়োগ-বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ঘুষবাণিজ্যের অভিযোগ বহু পুরোনো। এ ছাড়া প্রতিবছর বরাদ্দ পাওয়া বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য নানা প্রকল্পে খরচ দেখানো হলেও তা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। আর দলীয় লোকদের দিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ দেওয়ায় অস্তিত্বহীন ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটছে নিয়মিতই।
তবে বরাবরই পার্বত্য অঞ্চলের এই দুর্নীতিবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য, ২ নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে দুদকের ৪ মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিয়েছেন আদালত। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরাকে করা হয়েছে স্থায়ী অপসারণ। বান্দরবানের চেয়ারম্যান কশৈহল্লাসহ তিন জেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।
রাঙামাটি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সভাপতি মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে নির্বাচন না হওয়ার কারণে এটি একচেটিয়া প্রভাবশালী হয়ে গেছে। দলীয় সরকারের মনোনয়নে সবাই নির্বাচিত হয় বলেই দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার কাজে ব্যস্ত থাকে। আর জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না বলে দুর্নীতি করার সুযোগ থাকে এবং বারবার সেটা প্রমাণও হয়েছে।’
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, ‘জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্যদের নিয়োগ প্রক্রিয়াটা কখনো স্বচ্ছভাবে হয়নি। মনোনীত যে প্রার্থীরা আসেন, তারা আবার জনবিচ্ছিন্ন। জনগণের প্রতিনিধিত্ব যারা করেন, তাদের নির্বাচিত হওয়ার স্বচ্ছতা না থাকলে তাদের কাছ থেকে আমরা ভালো কিছু আশা করতে পারি না।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাঙামাটি জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট দীননাথ তঞ্চঙ্গা বলেন, ‘আসলে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের দিকে আমরা একটা আশা নিয়ে থাকি। এখানে যদি দুর্নীতি হয়, তাহলে মানুষ হতাশ হয়ে যায়। এই জেলা পরিষদের গঠনটা হয় সিলেকশনের মাধ্যমে। যদি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান-সদস্যরা জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়, তাহলে জবাবদিহি থাকবে। আর এখন জবাবদিহির অভাবের কারণেই হয়তো দুর্নীতিগুলো বাড়ছে।’
দুর্নীতি বন্ধে দাপ্তরিক সতর্কতা বৃদ্ধি ও উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা উন্মুক্ত রাখার আশ্বাসসহ দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনার কথা বলেছেন রাঙামাটি জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মোহাম্মদ রিজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘যেহেতু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভুলত্রুটি হওয়ার সুযোগ আছে। যাতে না হয় আমরা সেভাবে সতর্ক আছি।’
দুদকের রাঙামাটি উপপরিচালক মো. জাহিদ কালাম বলেন, ‘রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের বিরুদ্ধে অস্তিত্বহীন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা চারটি মামলা করেছিলাম। চারটি মামলার তদন্ত শেষে আমরা বিজ্ঞ আদালতে চার্জশিট দিয়েছি। বর্তমানে মামলাগুলো বিচারাধীন।’