‘ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর পেলাম ২ লিটার তেল, যা দিয়ে সর্বোচ্চ দুই দিন যেতে পারে। আবার লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হবে। সেই ভোগান্তি পোহাতে হবে। কম তেল দেওয়ায় মূলত বাড়ছে এই ভোগান্তি।’
এভাবেই সোমবার (৯ মার্চ) রাজধানীর আসাদগেটে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে এসে দুর্ভোগের কথা জানান বাইক আরোহী মো. নাহিয়ান। শুধু এই ফিলিং স্টেশনেই নয়, মতিঝিল, শাহবাগসহ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গেলে সেখানেও বাইকার, প্রাইভেটকার চালক, মাইক্রোবাসের চালকদের মুখেও ছিল প্রায় একই অভিযোগ। সোমবার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে ভুক্তভোগী গ্রাহকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে গতকালও বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের কোনো ধরনের সংকট নেই, যথেষ্ট পরিমাণে মজুত রয়েছে। তারপরও ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের ভিড় দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি তেল যাতে সঠিকভাবে বিক্রি হয়, কেউ যাতে অবৈধ মজুত করতে না পারে বা বেশি দাম নিতে না পারে সে লক্ষ্যে গতকাল সব জেলা প্রশাসককে (ডিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গেলে কথা হয় বেশ কয়েকজন ভোক্তার সঙ্গে। ভুক্তভোগীরা এ সময় বলেছেন, এটা খাওয়ার জিনিস নয়, আবার খোলা বাজারেও বিক্রি করার না। তাই পরিমাণে বেশি পাওয়া গেলে ঘন ঘন লাইনে আসতে হতো না। এভাবে লাইন লম্বা হওয়ায় রাজধানীতে বাড়তি যানজট হচ্ছে।
ফিলিং স্টেশনের সংশ্লিস্টরা জানান, জ্বালানি অর্থাৎ অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের কোনো সংকট নেই। যে আসছে তার কাছেই বিক্রি করা হচ্ছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
সোমবার সকালে আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, পেট্রল, ডিজেল ও অকটেন কিনতে এই পাম্পে প্রবেশের আগে জিয়া উদ্যানসংলগ্ন লেকের প্রধান সেতুর অংশ থেকে প্রাইভেট কারের সারি। পাশের লাইনে মোটরসাইকেলেরও দীর্ঘ লাইন। এ সময় মো. ফাহিম নামের একজন বাইকচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘১ ঘণ্টার বেশি হয়েছে। এই সময়ে কতবার যে মোটরসাইকেল অন-অফ করতে হয়েছে। এটা খুবই বিরক্তিকর। অবশেষে এই মাত্র ২ লিটার অকটেন পেলাম। এটা নাকি সরকারের সিদ্ধান্ত একবার ২ লিটারের বেশি পাওয়া যাবে না। এটা খুবই ভুল সিদ্ধান্ত। কারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সংশোধন করা দরকার। কারণ এটা খাওয়ার জিনিস না। আবার খোলা বাজারে বিক্রিও করার না। এই তেল ২ দিনেই শেষ হয়ে যাবে। আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হবে। বেশি করে দিলে ভোগান্তি কমবে।’ অন্যরাও একই অভিযোগ করে জানান।
এ সময় পাম্প অপারেটর মো. শহিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হচ্ছে। তেলের কোনো সংকট নেই। সরকার কম করে বিক্রি করার নির্দেশ দিয়েছে। আমরা এর বাইরে কিছু করতে পারছি না।’ এই পাম্পের ক্যাশিয়ার এরশাদও জানান, চালকদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। এ জন্য তেল কেনার হিড়িক পড়ে গেছে। লাইন বেড়ে গেছে। আগের তুলনায় বিক্রিও বেড়ে গেছে। পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে ৩ গাড়ি তেল বিক্রি হলেও কয়েক দিন ধরে ৫ গাড়ি করে বিক্রি হচ্ছে। এক গাড়িতে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার তেল থাকে। মোটরসাইকেলে দেওয়া হচ্ছে ২৫০ টাকার তেল, প্রাইভেট কারে ১২০০ হাজার টাকা ও মাইক্রোতে ২ হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে।’
মোহাম্মদপুরের আসাদ গেটের অপর পাম্প হচ্ছে সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশন। সেখানেও দেখা গেছে টাউন হল থেকে দীর্ঘ লাইন। এভাবে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইনের কারণে ওই এলাকায় যানজটও বেশি হচ্ছে।
শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারেও দেখা যায়, ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন। সবার মধ্যে অস্থিরতা। তারা জানান, এভাবে আর কত দিন চলতে হবে। প্রাইভেট কারচালক মো. মাহমুদ বলেন, ‘এই এলাকায় আমার বাসা। তারপরও ২ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ১০ লিটার তেল পেলাম। দূরে কোথাও তারা যাচ্ছে না। কারণ কখন তেল শেষ হয়ে যাবে। সেই চিন্তাই কাজ করছে।’ অন্য ক্রেতাদেরও অভিযোগ। এভাবে চলা কঠিন হয়ে গেছে। তেলের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
সোমবার দুপুরে এই পাম্পে কথা হয় হিসাবরক্ষক এম এ মান্নানের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, তেলের কোনো সংকট নেই। তারপরও কেন মানুষের লাইন লম্বা হচ্ছে তা চিন্তায় আসে না। আগে সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তেল দেওয়া হতো। কয়েক দিন ধরে ইফতারি পর্যন্ত দেওয়া হয়।
সকালে মতিঝিলের পূবালী ফিলিং স্টেশনেও দেখা গেছে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন। এভাবে তেলের লাইন দীর্ঘ হওয়ায় বাড়তি যানজটও দেখা গেছে। ভুক্তভোগী রাকিব বলেন, বিভিন্ন দিকে ঘোরাঘুরি করে ৩ ঘণ্টা পর তেল পেলাম। ২ লিটার তেল পেতে এত ভোগান্তি। বেশি পেলে কয়েক দিন যেত। ঢাকা শহরে যে যানজট তাতে ২ থেকে ৩ দিনেই এ তেল শেষ হয়ে যাবে। আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হবে। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে।’
এ সময় প্রিজন ভ্যানও লাইনে দেখা যায়। গাড়ির ড্রাইভার নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের এই পাম্প থেকেই তেল নিতে হবে। তাই অন্যদের মতো আমিও লাইনে দাঁড়িয়েছি। কখন পাব বলতে পারছি না। ভোগান্তি যাই হোক তেল নিয়ে গন্তব্যে যাব।’ পাম্প অপারেটর খোরশেদ বলেন, কথা বলার সময় নেই। দেখছেন তো লম্বা লাইন। বিজয় সরণি সংলগ্ন ট্রাস্ট পাম্পে লম্বা লাইন দেখা যায়। ব্যক্তিগত গাড়ির সারি জাহাঙ্গীরগেট ছাড়িয়ে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই পাম্পে মোটরসাইকেলের সারি ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মূল ফটক পর্যন্ত।
এসব পাম্প স্টেশনে তেল পাওয়া গেলেও অনেক এলাকায় ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় অনেকে তেল পাননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শেওড়াপাড়ায় মেসার্স সবুর ফিলিং স্টেশন বন্ধ দেখা যায়। হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি বন্ধ দেখা যায়। অপারেটররা জানান তেল নেই। এ জন্য বন্ধ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ভোগান্তি কারে কয় বলা কঠিন। এখন কোথায় যাব বুঝতে পারছি না।’
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হলে অনেকেই বেশি করে জ্বালানি তেল কিনতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত শুক্রবার (৬ মার্চ) পাম্প স্টেশনে তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন, ব্যক্তিগত গাড়ির (কার) ক্ষেত্রে এই সীমা ১০ লিটার, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা জিপ এবং মাইক্রোবাস দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল পাবে। পিকআপ বা লোকাল বাসের জন্য দিনে ডিজেলের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। অন্যদিকে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত তেল নিতে পারবে। তারপর থেকেই তেল কেনার জন্য ক্রেতাদের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে।