ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নানা সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ আপাতত ৭টি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। এগুলো হলো; আমদানি-রপ্তানির ব্যয় বৃদ্ধি, জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে ভাটা, মুদ্রাস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন ও রিজার্ভে চাপ, জ্বালানিসংকট ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত, সার আমদানিতে ধাক্কা, বিনিয়োগ ও উন্নয়নে ধীরগতি। এই যুদ্ধের পরিধি ও মেয়াদ যত বাড়বে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ১৫ দিনে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও জ্বালানি খাতে ইতোমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
জ্বালানিসংকটের কারণে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটবে এবং এতে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কাজগুলোর গতি ধীর হয়ে পড়বে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমতে শুরু করেছে এবং এতে আমদানি-রপ্তানি খরচও বাড়বে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। যুদ্ধে এই খাতও বিপদে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরও দীর্ঘায়িত হবে বলে মনে হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ অনেক সংকটে পড়তে যাচ্ছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় খাত জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্স, যা ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ কর্মী অনিরাপদ হয়ে পড়তে পারেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালে কাজ হারিয়ে অনেকের দেশে ফেরার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অনেক সেক্টর জড়িত। হরমুজ প্রণালির সংকটে জ্বালানি তেলের ওপর প্রিমিয়াম চার্জ বাড়তে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন খাতে খরচ বাড়তে পারে। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে, ফলে রিজার্ভেও চাপ পড়তে পারে। বাংলাদেশ সৌদি আরব থেকে ডিএপি ও ইউরিয়া সার আমদানি করে। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও ইউরিয়া সার আমদানি করে। যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেলে সারের অভাবে আমাদের কৃষি খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে শুরু করেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ৮৬ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বা পরিস্থিতি সংঘাতপূর্ণ হলে এই অঞ্চলে কর্মসংস্থান কমতে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে আকাশপথ ও নৌপথ ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায় জাহাজের ভাড়া এবং বিমা খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা দেশের ভেতরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমদানি করা জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়বে। ফলে, আগে থেকেই চাপে থাকা বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে আরও ঘাটতি দেখা দিতে পারে। জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে দেশে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি বজায় থাকতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দেবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, এই যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে, জ্বালানি, ডলার এবং বাণিজ্য ও অর্থায়ন খাতের মাধ্যমে। এই ধাক্কা সাময়িক ঝড় নয়, বরং ভূমিকম্পের মতো বড় আকারের হতে পারে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব তেলের বাজারে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার ছিল, তা বেড়ে এখন ১০০ ডলারের ওপরে। শুধু দাম বাড়বে এমন নয়, দাম দিয়েও তেল পাওয়া যাবে কি না, সেই সময় আসছে। এই পরিস্থিতিতে বড় বড় শিপিং সংস্থা ভারতীয় উপমহাদেশ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে কার্গো বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে, যার ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কাঁচা তেল থেকে শুরু করে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম ও এলএনজি পর্যন্ত আমদানি করা। ফলে তেলের দাম বাড়লে দেশের জ্বালানি আমদানির খরচ দ্রুত বেড়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে জ্বালানিসংকট আতঙ্কে জ্বালানি কেনার প্রবণতা বাড়ায় দেশের বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে এবং জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং শিল্প উৎপাদনের খরচও বাড়বে। এতে সরকারকে হয় বেশি ভর্তুকি দিতে হবে, নয়তো জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ বাড়বে, যার ফলে খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া জ্বালানি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়লে দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে এবং টাকার মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আগামী বাজেট ও মুদ্রানীতিতে চাপ পড়বে। সব মিলিয়ে এক জটিল সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।