দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি; বরং দিন দিন তার আরও অবনতি ঘটছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের চরম সংকটে জনদুর্ভোগ এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অধিকাংশ পাম্প তেলশূন্য হয়ে বন্ধ থাকায় সচল স্টেশনের সামনে সৃষ্টি হয়েছে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের লাইন।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অনেক চালক অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। মাথাঘোরা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকেই লাইনের পাশেই একটু ছায়া পেতেই বসে পড়ছেন।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে চালকরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ছেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ধৈর্য হারিয়ে ফেলায় অনেক স্থানে গ্রাহক ও পাম্পকর্মীদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত।
গতকাল মতিঝিলের কারিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই শত শত মোটরসাইকেল লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। লাইনের কারণে আশপাশের সড়কে যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সেখানে তেল নিতে আসা চালক মারুফ মিয়া বলেন, ‘সকাল ৭টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, এখন দুপুর পার হয়ে গেছে। এখনো তেল পাইনি। এই গরমে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কষ্টকর। কিছুক্ষণ আগে একজন মোটরসাইকেলের চালক মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন, আমরা পানি দিয়ে তাকে সামাল দিয়েছি।’
আরামবাগের মেসার্স এইচকে ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে উত্তেজনা। লাইনের নিয়ম ভেঙে তেল নেওয়ার চেষ্টা করলে সেখানে প্রায়ই ঝামেলার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রাইভেট কারচালক মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও যদি কেউ নিয়ম ভেঙে আগে তেল নিতে চায়, তাহলে তো মারামারি হবেই। আমরা এত কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকি, আর কেউ এসে আগে নিয়ে যাবে–এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
নীলক্ষেতের ‘কিউজি সামদানী’ ফিলিং স্টেশনের পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। গতকাল সপ্তাহের শেষ দিনে সেখানে তিন স্তরের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। নীলক্ষেত থেকে পলাশীর মোড় হয়ে আজিমপুর ইডেন কলেজের সামনে দিয়ে আবার নীলক্ষেতে ফিরে এসেছে গাড়ির বহর। অধিকাংশই মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার। তীব্র রোদে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের অনেককেই গাছের ডাল ভেঙে মাথার ওপর ধরে ছায়া তৈরি করতে দেখা যায়। মোটরসাইকেলচালক তানভীর আহম্মেদ বলেন, ‘৮-১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকি, মাথার ওপর আগুনের মতো রোদ। অনেকেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। তাই গাছের ডাল দিয়ে মাথা ঢেকে রাখছি। তেল কখন পাব জানি না।’
পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। পাম্প থেকে পিজি হাসপাতালের পেছন দিয়ে লাইনে দাঁড়ানো গাড়ি হাতিরপুল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এতে করে পুরো এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে আজিজ নামে দায়িত্বরত এক পাম্পকর্মী বলেন, ‘আমাদের কাছে তেলের সরবরাহ সীমিত, কিন্তু গ্রাহকের চাপ অনেক বেশি। অনেক সময় গ্রাহকরা রেগে যান, প্রশ্ন করেন, আমরা উত্তর দিতে দিতে নিজেরাও ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আবার অনেক গ্রাহক রোদে অপেক্ষা করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।’
চালকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন–সরকার যদি বলে তেলের কোনো ঘাটতি নেই, তাহলে বাস্তবে এই সংকট কেন? দেড় মাস ধরে চলা এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়? এই সংকটের কারণে শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শিক্ষার্থী যুবায়ের আহম্মেদ বলেন, ‘আমি ১৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেছি, তারপর মাত্র পাঁচ লিটার তেল পেয়েছি। এই গরমে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তেল না পেলে টিউশনে যাতায়াত করতে পারছি না, পড়াশোনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
ফুয়েল পাস বা রেশনিং ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির অভিযোগও উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে লাইনের বাইরে থেকে তেল নেওয়ার চেষ্টা কিংবা প্রভাব খাটানোর কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এতে করে প্রায়ই হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। ইতোমধ্যে রাজধানীর অন্তত তিনটি ফিলিং স্টেশনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে পেশাদার চালকদের অবস্থাও দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তারা নিয়মিত গাড়ি চালাতে পারছেন না। এতে আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মেঘনা পাম্পের সামনে এক চালক চিৎকার করে বলেন, ‘তেল না পেলে গাড়ি চালাব কীভাবে? গরমে দাঁড়িয়ে থাকি, আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আয় কমে গেছে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।’
এদিকে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট তৈরি হবে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী। গত বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এই মুখপাত্র বলেন, দেশে বর্তমানে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রল ১৮ হাজার ২১১ টন এবং ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন। এ ছাড়া জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে ১৮ হাজার ২২৩ টন।
মনির হোসেন জানান, জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। বরং আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতাই বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। গ্রাহকদের চাহিদা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি পাম্পে আগে দৈনিক ৫০ থেকে ৫৪ হাজার লিটার অকটেন সরবরাহ করা হলেও এখন ৮০ হাজার লিটারের বেশি দিয়েও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে বলেও জানান তিনি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ ও বণ্টনব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবই এই পরিস্থিতির মূল কারণ হতে পারে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট নিরসনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধানের কথা জানিয়েছেন ‘কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথমত এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের অতিরিক্ত মুনাফা কমানো জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানি খাতে যেসব কোম্পানি ব্যবসা করছে, তাদের কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে ৭৫টিরও বেশি কোম্পানি এই খাতে জড়িত থাকলেও তারা কীভাবে দ্রুত সম্পদ বৃদ্ধি করছে–বাড়ি, গাড়ি ও ব্যাংক-ব্যালেন্স–এসব বিষয় স্বচ্ছভাবে যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি খাতে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়ে এনে প্রকৃত ঘাটতির বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে করে সরবরাহব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
শামসুল আলম জ্বালানিসংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন। তার মতে, এখানে দলীয় বিবেচনার চেয়ে পেশাগত দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। দলমত নির্বিশেষে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ খাত পরিচালনায় যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিলে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।