ছয় মাস ধরে বরিশাল নগরীতে শিশুদের যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বিশেষ ধরনের সিরিঞ্জের সংকটের কারণে এ টিকা দেওয়া যাচ্ছে না। নগর স্বাস্থ্য দপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সংশ্লিষ্টরা এ কথা জানিয়েছেন। ফলে জন্মের পর নির্ধারিত সময়ে টিকা না পেয়ে নবজাতকরা ঝুঁকিতে পড়বে বলে জানিয়েছেন শিশু বিশেষজ্ঞরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিসিজি ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও তা প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ‘টিউবারকুলিন সিরিঞ্জ’ নেই। ফলে গত ছয় মাস ধরে নগরীতে এই টিকাদান কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সাধারণত জন্মের পরপরই বা সর্বোচ্চ ৪৫ দিনের মধ্যে শিশুকে এই টিকা দেওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘ সময় কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক শিশু নির্ধারিত সময় পার করেও টিকা পাচ্ছে না।
বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক বিকাশ চন্দ্র নাগ বলেন, ‘বিসিজি টিকা শুধু একটি নিয়মিত টিকা নয়, এটি নবজাতকের জীবনকে সুরক্ষিত করে। জন্মের পরপরই এই টিকা দিলে শিশুর শরীরে যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘ সময় টিকাদান বন্ধ থাকলে সেই সুরক্ষায় বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছয় মাস ধরে টিকাদান বন্ধ থাকা মানে বিপুলসংখ্যক শিশু এই গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পরে একসঙ্গে টিকা দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের কার্যকারিতা পুরোপুরি ফিরে পাওয়া যায় না।’
অধ্যাপক নাগ দ্রুত সংকট সমাধানের ওপর জোর দিয়ে বলেন, এটি শুধু একটি সরঞ্জামসংকট নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নীরব ঝুঁকি। প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জ সরবরাহ নিশ্চিত করে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম চালু করা জরুরি। পাশাপাশি যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তাদের তালিকা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
জানা গেছে, বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে ইপিআই কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল, নগর মাতৃসদন, রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালসহ একাধিক কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে অন্যান্য টিকা দেওয়া হলেও বিসিজি টিকা বন্ধ রয়েছে।
বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্সরা জানান, শুধু বিসিজি টিকাই বন্ধ রয়েছে। অন্যান্য টিকা নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীর চাপ ও জনবলসংকটের কারণে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল জানান, প্রতিটি টিকার জন্য আলাদা ধরনের সিরিঞ্জ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। বিসিজির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সিরিঞ্জটি বিশেষভাবে তৈরি, যা অন্য কোনো সিরিঞ্জ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না।
‘বিসিজি ছাড়া অন্য সব টিকা পর্যাপ্ত রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জ না থাকায় এই টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
এক শিশুর অভিভাবক ইসরাফিল হোসেন বলেন, ‘শিশুর অন্য টিকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পরে জানতে পারি বিসিজি দেওয়া হয়নি। গতকাল জেনারেল হাসপাতালে গেলে জানতে পারি, ছয় মাস ধরে এই টিকা দেওয়া বন্ধ আছে। আগে জানলে আমরা অন্য ব্যবস্থা নিতাম।’
আরেক অভিভাবক নাসরিন আক্তার বলেন, ‘টিকা কার্ডে নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী কেন্দ্রে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও বিসিজি টিকা না পেয়ে শিশুকে নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।’
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, বিভাগের সব জেলা ও উপজেলায় এই কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে সিরিঞ্জসংকটের কারণে বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় যক্ষ্মা প্রতিরোধের বিসিজি টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনগুলো যেহেতু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান, তাই চাইলেই আমরা সরাসরি এখানে কাজ করতে পারি না। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলাম শুভ্র জানান, সিরিঞ্জের অভাবে বিসিজি টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম চেয়ে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো সরঞ্জাম এসে পৌঁছায়নি।
তিনি বলেন, ‘সিরিঞ্জ পাওয়া গেলেই পুনরায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হবে। অন্য সব টিকা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলমান রয়েছে।’