যমজ ভাইবোন মায়মুনা বুশরা ও রাশেদ মাহমুদ। তাদের বয়স ১০ মাস পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে গত ৪৪ দিনে চারটি হাসপাতাল ঘুরে বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে তারা।
শুক্রবার (১৫ মে) ঢামেকের (সি ৩১/ই) শয্যায় তারা ভর্তি হয়।
পাশের শয্যার আট মাস বয়সী সাফওয়ান ইসলামও চারটি হাসপাতাল হয়ে এখানে এসেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থার উন্নতি হওয়ায় স্বস্তি বোধ করলেও নানা অভিযোগও আছে অভিভাবকদের।
ক্যানোলার মাধ্যমে শিশুদের শরীরে ইনজেকশন, স্যালাইন ইত্যাদি পুশ করা হয়। অভিভাবকরা জানান, হাম ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্সরা শিশুদের ক্যানোলা পরাতে পারেন না। তাই শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে সেখানকার নার্সদের কাছ থেকে ক্যানোলা পরিয়ে আনতে হয় অভিভাবকদের। সেখানে ক্যানোলা পরিয়ে দিলেও বাড়তি কাজ করতে হয় বলে অনেক সময় নার্সরা অশোভন আচরণ করেন।
অভিভাবকরা জানান, হাম ওয়ার্ডে ডাক্তারের প্রয়োজন হলেও অন্য ফ্লোরে শিশু ওয়ার্ডে যেতে হয় তাদের। ফলে তাদের মধ্যেও অনেকে অশোভন আচরণ করেন।
হামের জন্য নির্ধারিত সব ওয়ার্ড মিলে একটিমাত্র নেবুলাইজার মেশিন থাকার কথাও জানান তারা। অভিভাবকরা বলেন, এই মেশিন নিয়ে টানাটানি হয়, অসন্তোষ হয়, অপেক্ষায় থাকতে হয়, সন্তানের কষ্ট হচ্ছে, চোখের সামনে তা দেখতে হয়। এ কারণে সামর্থ্যবান অভিভাবকদের কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে মেশিনটি কিনে নেন।
যমজ সন্তান নিয়ে প্রায় দেড় মাসের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন শিশু দুটির বাবা আসলাম উদ্দীন। গাজীপুরে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন তিনি। হাসপাতালে শিশু দুটি যে ওয়ার্ডে ভর্তি আছে, এর বাইরে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে গতকাল কথা হয় দৈনিক খবরের কাগজের। তিনি জানান, গত ২ এপ্রিল তার এই দুই সন্তানের জ্বর আসে। তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালে, তবে তখন গোপালগঞ্জে নানার বাড়িতে ছিল। সেখানেই ডাক্তার দেখান। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার শিশু দুটির রক্তে সংক্রমণ পান এবং তাদের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। সে অনুসারে দুই শিশু সন্তানকে গোপালগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
গত ৫ এপ্রিল ডায়রিয়া শুরু হয় তাদের। তখন তাদের গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে ডায়রিয়া ও জ্বরমুক্ত হয়ে ৭ এপ্রিল ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফেরে তারা।
তবে ১৫ এপ্রিল আবার জ্বর আসে মেয়েটির। তখন গ্রামীণ হাতুড়ে ডাক্তার দেখান, তবে সুস্থ হয়নি। জ্বর ‘ছাড়ে–বাড়ে’ অবস্থার মধ্যে গত ২২ এপ্রিল মেয়ে সন্তানের পেটের ত্বকে হামের রেশ দেখা দেয়। তখন আবার গোপালগঞ্জের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। মেয়ে শিশুটির হাম শনাক্ত হওয়ার পর একপর্যায়ে ছেলেটিও হামে সংক্রমিত হয়। এর মধ্যে সেখান থেকে তাদের হামের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ এপ্রিল শিশু দুটিকে রাজধানীতে ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এটি বর্তমানে হামের জন্য ‘ডেডিকেটেড’। তবে এর মধ্যে হাম সেরে যাওয়ায় অন্যান্য জটিলতার জন্য সরকারি সাধারণ হাসপাতালে ভর্তি হতে বলা হয় তাদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিন থেকে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি আছে।
পাশের শয্যার সাফওয়ান ইসলামের বাবা বলেন, তারা এসেছেন পটুয়াখালী থেকে। তারাও তিনটি হাসপাতাল পেরিয়ে বর্তমানে এখানে আছেন।
বললেন, প্রথমে ১০ দিন মফস্বল শহরে হাসপাতালে ভর্তি রেখেছিলেন শিশু সন্তানকে। তারপর রাজধানীতে এনে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রাখেন ৭ দিন। সেখানেও উন্নতি না হওয়ায় আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে ৬ দিন থাকার পর নিয়ে আসেন এখানে।
অভিভাবকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে কর্তব্যরত নার্সিং অফিসার অতশী রানী পালসহ নার্সরা জানান, এই ওয়ার্ডগুলো মূলত কেবিন। এগুলোতে সাধারণত ক্রিটিক্যাল বা ভিআইপি রোগী ভর্তি থাকেন। বয়স্ক রোগীদের সেবা দেওয়াই আমাদের অভ্যস্ততা। যখন এখানকার কয়েকটি কক্ষকে হামের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হলো, তখন হঠাৎ করে আমাদের শিশু রোগীও সামাল দিতে হচ্ছে। কিন্তু ক্যানোলা পরানোতে তো আমাদের অভ্যস্ততা নেই, আবার শিশুদের নিয়ে তো এক্সপেরিমেন্ট করাও উচিত না। এখানে ৬০-৭০ জন রোগীর জন্য ৩ জন নার্স আছে। এর মধ্যে হামের জন্য নির্ধারিত শয্যার চেয়ে রোগী আছে বেশি। বর্তমানে হাম ওয়ার্ডে ১৯ রোগী আছে। সব মিলে আমরা তো পরিস্থিতিটা সামাল দিচ্ছি।