আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কয়েকজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি ট্রাইব্যুনালের সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে ডাকবে বলে জানিয়েছিলেন বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি এই কমিটির প্রধানও। গত ১৫ এপ্রিল গণমাধ্যমকে এ কথা বলেছিলেন তিনি।
- আইসিটির কয়েকজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির কাজ বর্তমানে ধীরগতিতে চলছে; দুই প্রসিকিউটর হজে থাকায় তদন্তে নতুন অগ্রগতি নেই।
- প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে এক আসামিকে জামিন পাইয়ে দিতে ১ কোটি টাকা চাওয়ার অভিযোগের অডিওকে ‘সত্যিকারের’ বলে নিশ্চিত করেছে তদন্ত কমিটি।
- সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তামীমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সেটলিং বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে; সিসিটিভির হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের ঘটনাও তদন্তাধীন।
এরপর এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পরের কার্যদিবসে রবিবার (১৭ মে) দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে কথা হয় চিফ প্রসিকিউটরের। প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুজন প্রসিকিউটর হজে গেছেন। এখন দেওয়ার মতো তেমন কোনো তথ্য নেই।
কোন দুজন প্রসিকিউটর হজে গেছেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন তো তদন্ত থেমে আছে। আপডেট কিছু থাকলে আপনাদের (গণমাধ্যম) জানাব।
চিফ প্রসিকিউটর ওই দিন (১৫ এপ্রিল) বলেছিলেন, তাজুল ইসলামের কাছ থেকে সার্বিক একটি বক্তব্য নেওয়া হবে, যেহেতু তিনি প্রসিকিউশনের প্রধান ছিলেন। তাজুল ইসলাম সম্ভবত দেশে নেই। তিনি এলে নেওয়া হবে। এদিকে এক অভিযুক্ত প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম ও আরেক প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা হজ পালনের জন্য বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
হজ পালনের জন্য তাদের ছুটি মঞ্জুরসংক্রান্ত চিফ প্রসিকিউটরের স্বাক্ষর করা চিঠি যথাক্রমে গত ১১ মে ও ১৩ এপ্রিল রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কাছে পৌঁছায়।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা চেয়েছিলেন তৎকালীন প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার। বিষয়টি নিয়ে গত ১০ মার্চ গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের কক্ষে একজন আসামির স্ত্রী ভারী ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ওই আসামি রাজসাক্ষী হিসেবে মামলায় খালাস পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেছিলেন আরেকজন প্রসিকিউটর।
দুর্নীতির এসব অভিযোগসহ কয়েকজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ওই দিনই (১০ মার্চ) ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, সাইমুম রেজা তালুকদার আগেই টেলিফোনে এ বিষয়ে কথা বলার কথা স্বীকার করেছেন।
এদিকে প্রসিকিউটর তামীমের কক্ষে একজন আসামির স্ত্রী ভারী ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন বলে যে অভিযোগ করেছিলেন আরেকজন প্রসিকিউটর, তথ্যপ্রযুক্তিতে পারদর্শী আরেক প্রসিকিউটর জোহা পরবর্তী সময়ে বলছেন, ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভির ফুটেজ যেসব হার্ডড্রাইভে সংরক্ষিত ছিল, সেখানে পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। গত ১ এপ্রিল এসব কথা বলেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালের হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের ঘটনার কথা সাংবাদিকদের বলেছেন প্রসিকিউটর জোহা। ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির মেম্বার নই। তবে আমি আদিষ্ট হয়ে জানতে পেরেছি যে সিসলকগুলোতে যে হার্ডড্রাইভগুলো থাকার কথা ছিল, পুরোনো-নতুন কিছু হার্ডড্রাইভ সংযোজিত–বিয়োজিত হয়েছে। এটি তদন্তাধীন বিষয়। তো এটি আমরা ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিকে অবহিত করেছি। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি থেকে বাকি ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা হবে।’
জোহা বলেন, হার্ডড্রাইভ রিপ্লেসের (প্রতিস্থাপন বা বদলানো) ঘটনা ঘটেছে। এটি সিসলক ও রেজিস্ট্রারে দেখেছেন।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের কক্ষে একজন আসামির স্ত্রীর ভারী ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলেন প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, ‘গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে আশুলিয়ার লাশ পোড়ানো মামলার আসামি আফজালের (গণ–অভ্যুত্থানের সময় আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলার আসামি পুলিশের সাবেক উপপরিদর্শক শেখ আবজালুল হক) বউ সন্ধ্যার দিকে ভারী ব্যাগ নিয়ে তামীমের (প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম) রুমে প্রবেশ করেন। বিষয়টি আমরা দেখার পরে সঙ্গে সঙ্গে তাজুল ইসলামের রুমে গিয়ে তাকে জানাই। এ ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বরং উল্টো আমাদের বকাঝকা করা হয়। তামীম তখন সবার সামনে স্বীকার গিয়েছিলেন, হ্যাঁ আফজালের বউ তার রুমে এসেছিলেন। চিফ প্রসিকিউটর শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন আসামির বউ কেন তার রুমে গিয়েছিলেন। শুধু এই জিজ্ঞাসা করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে সেই আফজালকে রাজসাক্ষী করা হলো। চূড়ান্ত বিচারে তাকে খালাস দেওয়া হলো।’
উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামিকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবারের কাছে ১ কোটি টাকা চাওয়ার কথোপকথনের অডিও ‘জেনুইন’ (সত্যিকারের) বলে নিশ্চিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় গঠিত তথ্যানুসন্ধান কমিটি। কমিটির প্রধান ও ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গত ২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। তখন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছিলেন, যে কথোপকথনটি হয়েছে, সেখানে ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের এক সদস্যের কণ্ঠ এবং সাইমুম রেজা তালুকদারের কণ্ঠ শনাক্ত করেছেন তারা।
তিনি বলেন, ‘ভয়েসটা আমরা ডিটেক্ট করেছি যে এটি জেনুইন। তাদের মধ্যেই কথোপকথনটা হয়েছে। এটি এআই না, জেনুইন।’
এদিকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ। তার অভিযোগ, ‘চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে’ টাকা আয়ের হাতিয়ার করেছিল তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট।
কাজী মোস্তাফিজুর রহমান আহাদ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ‘ট্রাইব্যুনালে সেটলিং বাণিজ্য ও রাজসাক্ষী নাটক: কেন সরতে হচ্ছে তাজুল ইসলামকে?’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে দুটি মন্তব্য করেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। সেই দুই মন্তব্যে তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল–মামুন এবং আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হককে ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) করা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ। রংপুরে শহিদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া এবং চানখাঁরপুল এলাকায় ‘গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া’ একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি না করে সাক্ষী করার অভিযোগ করেছেন তিনি।
উল্লেখ্য, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মোহাম্মদ সম্রাট রোবায়েতও। তার অভিযোগ, সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে রক্ষা এবং তার ছেলে ফারাজ করিমের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আটকাতে তাজুল ইসলাম জড়িত ছিলেন।