তিন বছর আগে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সোনালি অধ্যায় বুঝি শেষ হয়ে এসেছে। চোট, ফর্মহীনতা, সৌদি আরবের হতাশাজনক সময়- সব মিলিয়ে তিনি যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিলেন আলোচনার কেন্দ্র থেকে। অথচ ফুটবল সবসময়ই গল্প লিখতে ভালোবাসে। আর সেই গল্পের নতুন অধ্যায়ে আবারও ফিরে এসেছেন নেইমার, ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্নের কেন্দ্রে।
কোচ কার্লো আনচেলত্তি যখন ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিল দল ঘোষণা করলেন, সবচেয়ে বড় চমক নাম ছিল নেইমার জুনিয়র। মাত্র কয়েক মাস আগেও যার বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা, সেই নেইমার এখন আবার সেলেসাওদের জার্সিতে। কারণ, তিনি আবারও খেলছেন। আবারও উপভোগ করছেন ফুটবল।
সান্তোসে ফিরে যেন নিজের হারানো ছন্দ ফিরে পেয়েছেন নেইমার। আট ম্যাচে চার গোল, দুই অ্যাসিস্ট- সংখ্যাটা খুব বড় নয়, কিন্তু এর চেয়েও বড় বিষয় হলো তার শরীরের ভাষা। নেইমারকে আবার হাসতে দেখা যাচ্ছে, আবার দৌড়াতে দেখা যাচ্ছে, আবার খেলায় প্রভাব ফেলতে দেখা যাচ্ছে। আনচেলত্তিও সেটিই দেখেছেন।
স্কোয়াড ঘোষণার পর ইতালিয়ান কোচ বলেন, ‘বিশ্বকাপে নেইমার আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হবে। আমরা পুরো বছরজুড়ে নেইমারকে পর্যবেক্ষণ করেছি। শেষ সময়ে সে ধারাবাহিকভাবে খেলেছে এবং শারীরিকভাবে ভালো অবস্থায় ছিল। দলের অন্য সবার মতো তারও একই ভূমিকা ও দায়িত্ব থাকবে। তবে সে একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। এটা সত্য যে কিছু কিছু পজিশনে আমরা অভিজ্ঞতাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছি।’
ব্রাজিলের ইতিহাসে নেইমারের নাম এমনিতেই আলাদা উচ্চতায়। দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। বিশ্বকাপে ১৩ ম্যাচে আট গোল ও চার অ্যাসিস্টের রেকর্ডও তার সামর্থ্যের সাক্ষী। তবে এবারের গল্পটা একটু ভিন্ন।
একসময় ব্রাজিল মানেই ছিল নেইমার। দলের প্রায় প্রতিটি আক্রমণ তার পায়ে শুরু হতো, তার পায়েই শেষ হতো। সেই নির্ভরতা অনেক সময় ব্রাজিলকে ভুগিয়েছেও। প্রতিপক্ষ জানত- নেইমারকে থামাতে পারলেই থেমে যাবে ব্রাজিল। কিন্তু ২০২৬–এর ব্রাজিল আর সেই পুরোনো দল নয়।
এখন এই দলে আছে ভিনিসিউস জুনিয়রের বিস্ফোরক গতি, রাফিনহার ধারালো আক্রমণ, তরুণ এনড্রিকের সাহসী উপস্থিতি। চোটে ছিটকে পড়া রদ্রিগো না থাকলেও আক্রমণভাগে বিকল্পের অভাব নেই। ফলে এবার নেইমারকে একাই পুরো দল টানতে হবে না। বরং এই প্রথমবার হয়তো তিনি খেলবেন চাপমুক্ত হয়ে।
সম্ভাবনা আছে, আনচেলত্তি তাকে নাম্বার টেন ভূমিকায় ব্যবহার করবেন, যেখানে নেইমার নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। সামনে থাকবে গতিময় উইঙ্গাররা, আর তিনি হবেন ছন্দ নির্মাতা।
তবে প্রশ্নও কম নয়। ৩৪ বছর বয়সি নেইমার কি এখনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন? আধুনিক ফুটবলের তীব্র গতি ও রক্ষণাত্মক চাপের সঙ্গে তিনি কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন? বিশেষ করে তার রক্ষণে কম অবদান মাঝমাঠে ভারসাম্যের সমস্যা তৈরি করতে পারে, যেখানে কাসেমিরো ও ব্রুনো গুইমারেসের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে।
সমস্যা আছে রক্ষণভাগেও। মার্কুইনহোস ও গ্যাব্রিয়েল ম্যাঘালেস বিশ্বমানের সেন্টার-ব্যাক হলেও ফুল-ব্যাক পজিশনে ব্রাজিলের দুর্বলতা স্পষ্ট। সেই কারণেই আনচেলত্তিকে আবার ফিরতে হয়েছে অভিজ্ঞ আলেক্স সান্দ্রো ও দানিলোর কাছে।
সব মিলিয়ে এটিকে হয়তো অনেক বছরের মধ্যে সবচেয়ে অসম্পূর্ণ ব্রাজিল দল বলা যায়। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও তাদের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। অথচ ব্রাজিলকে কখনও শুধু কাগজে-কলমে বিচার করা যায় না। কারণ এই দলের ইতিহাসই হলো অসম্ভবকে সম্ভব করার ইতিহাস।
আর সেই ইতিহাসের মাঝখানে আবার দাঁড়িয়ে নেইমার। হয়তো তিনি আর আগের মতো একার কাঁধে পুরো ব্রাজিলকে বহন করবেন না। হয়তো তিনি আর দলের একমাত্র নায়কও নন। কিন্তু কখনও কখনও বিশ্বকাপ জিততে একজন ফুটবলারের প্রতিভার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয় তার অভিজ্ঞতা, তার উপস্থিতি, তার বিশ্বাস।
আনচেলত্তি সম্ভবত সেই বিশ্বাসটুকুর ওপরই ভরসা রাখছেন। কারণ ব্রাজিল এখনও ষষ্ঠ তারার অপেক্ষায়।
অনিক/