ঢাকা ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কল্যাণে পৃথক অধিদপ্তর গঠনের আশ্বাস দিলেন মির্জা ফখরুল কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছেন মমতা হরিণাকুন্ডুতে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু ইসরায়েলের আগ্রাসন পুরো বিশ্বের জন্য বিপদ: এরদোয়ান সিলেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকালে প্রশাসনের অভিযান মুকসুদপুরে নিখোঁজের ৫ দিন পর ইজিবাইকচালকের মরদেহ উদ্ধার চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিল অব এন্ট্রি ও বিল অব এক্সপোর্ট কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকছে প্রথমবার মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলার ছাড়াল ব্যক্তিগতভাবে আমি মৃত্যুদণ্ড বিরোধী: আইনমন্ত্রী বাংলা কিউআর: ক্যাশলেস বাংলাদেশের পথে নতুন বিপ্লব ভ্যানচালকের আর্জেন্টিনা প্রেম মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা: আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় প্রশংসা সৌদি হজমন্ত্রীর অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা বাড়ছে: ইইউ পর্যবেক্ষণ সংস্থা বিছানা নাপাক হলে ঐ ঘরে নামাজ পড়া যাবে কি? পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিচুক্তি অনিশ্চিত কারাগারে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার ব্যবস্থা করলেন টাঙ্গাইলের ডিসি বরাদ্দ অর্থের ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে চার স্তরে মজুত, জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের কোনো সংকট নেই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী নারী ও শিশুর সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন: সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ভোটের দায়িত্বে মারা গেলে ১০ লাখ টাকা পাবে পরিবার মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি পোশাক শিল্পের জন্য অশনি সংকেত: ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকে আলোচনা বিলম্ব করার ‘মূল্য দিতে হবে’: ট্রাম্প আড়াইহাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগে এসআই প্রত্যাহার পাবনায় সন্তানের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ৩ গাজীপুরে বাস উল্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ শিক্ষার্থী আহত সিংগাইরে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে মৃত্যু: ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা চার দিনের সংগীত উৎসবে মেতে উঠছে ঢাকা সরকারি ভাতা বিতরণে নগদের প্রতি আস্থা অব্যাহত
Nagad desktop

পর্যটক বরণে প্রস্তুত চা বাগান, লাউয়াছড়া ও মাধবকুণ্ডু

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৫, ১১:০১ এএম
আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৫, ১১:২০ এএম
পর্যটক বরণে প্রস্তুত চা বাগান, লাউয়াছড়া ও মাধবকুণ্ডু
মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। ছবি: সংগৃহীত

ঈদের ছুটিতে মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন ভ্রমণপ্রেমীরা। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের পাহাড়-চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতসহ দর্শনীয় স্থানগুলোতে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। পাঁচ তারকা রিসোর্টসহ অধিকাংশ আবাসন প্রতিষ্ঠান আগেই বুকিং হয়ে গেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ তৎপর রয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা এবার ভালো সাড়া পাওয়ার আশা করছেন।

মৌলভীবাজারের উঁচু-নিচু পাহাড়ের বুকজুড়ে সবুজ অরণ্যের নজরকাড়া সৌন্দর্য। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এখানে ছুটে আসেন এই মনোমুগ্ধকর পরিবেশ উপভোগ করতে। অবকাশের সময়টুকু আনন্দময় করে তোলার জন্য রয়েছে দর্শনীয় অনেক স্থান। 

ঈদের টানা ছুটিতে ভ্রমণপ্রেমীদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত চায়ের দেশের পর্যটনকেন্দ্র ও আবাসন ব্যবসায়ীরা। পুরো জেলায় শতাধিক পর্যটনকেন্দ্র থাকলেও পর্যটকদের প্রথম পছন্দ শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলাসহ জেলার অন্যান্য দর্শনীয় স্থান। এখানে গড়ে উঠেছে পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টসহ দেড় শতাধিক রিসোর্ট, ইকো কটেজ, হোটেল ও মোটেল। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ আগাম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। আবাসন ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, আগামী কয়েক দিনে শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হবে।

মৌলভীবাজার জেলার সাত উপজেলায় রয়েছে উঁচু-নিচু পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সবুজ অরণ্যে মোড়ানো ৯২টি চা-বাগান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মণিপুরি সম্প্রদায় অধ্যুষিত শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা ভ্রমণপ্রেমীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।

পর্যটন সমৃদ্ধ কমলগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় উদ্যান এবং অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এ উপজেলায় আরও রয়েছে গভীর অরণ্যের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধার হামহাম জলপ্রপাত, নয়নাভিরাম মাধবপুর লেক, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ এবং প্রাণ-প্রকৃতিতে সমৃদ্ধ আদমপুর বন বিট।

এখানে রয়েছে চা কন্যার ভাস্কর্য, লেবু-আনারস বাগান, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওর, দেশের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত মাধবকুণ্ড , মা-পাখির অভয়াশ্রম বাইক্কাবিল, কুলাউড়ার ঐতিহ্যবাহী নবাববাড়ী, গগণ ঠিলা, রাজনগরের জলের গ্রাম অন্তেহরী, কমলারানীর দীঘি, মাথিউরা চা ও রাবার-বাগান, শ্রীমঙ্গলের নীলকণ্ঠের সাত রঙের চা, চা-গবেষণা কেন্দ্র, ৭১ বধ্যভূমি, সদরের মনু ব্যারাজ, বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক ও ছোট-বড় পাহাড়-টিলা।

এই জনপদ ভ্রমণপ্রেমীদের মন ও দৃষ্টি কাড়বে প্রকৃতির অপরূপ মহিমায়। তাই তো ঈদের ছুটিতে এসব আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো ভ্রমণপ্রেমীদের বরণ করতে প্রস্তুত।

লাউয়াছড়া পুঞ্জির বাসিন্দা ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ইকো ট্যুর গাইড সাজু মারছিয়াং বলেন, ‘প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে দৈনন্দিন রুটিনের বাইরে এসে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ও আনন্দ পেতে ঈদের ছুটিতে হাজারও ভ্রমণপ্রেমী মৌলভীবাজারের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে আসবেন।’

নির্জন রিসোর্টের ব্যবস্থাপক দুর্জয় দেববর্মা বলেন, ‘আমাদের রিসোর্টের প্রায় ৭০ শতাংশ বুকিং কনফার্ম হয়েছে। বাকি ৩০ শতাংশও দ্রুত হয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করি।’

রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সামছুল হক বলেন, ‘এবারের ঈদের টানা ছুটিতে ভালো ব্যবসা হবে বলে আমরা আশাবাদী।’

চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটনের গল্প

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম
চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটনের গল্প
গ্রেটওয়ালে পর্যটকরা।

প্রথমবার গ্রেট ওয়াল দেখার অভিজ্ঞতা কোনো ভ্রমণ নয় এ যেন সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটা। বেইজিং থেকে ট্রেনে করে বাদালিং পৌঁছে যখন প্রথম সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলাম, পায়ের নিচের প্রতিটি পাথর যেন ফিসফিস করে বলছিল ‘আমি দুই হাজার বছর ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি।’
২০২৪ সালের শীতের সেই সকালে, কুয়াশার চাদর সরতে সরতে যখন প্রাচীরের বাঁকগুলো দৃশ্যমান হলো, মনে হলো যেন এক বিশাল ড্রাগন, পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাংলাদেশের লালবাগ কেল্লা বা মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ দেখে ইতিহাসের যে অনুভূতি পেতাম, এখানে তার চেয়েও বেশি কিছু ঘটল মনে হলো। ইতিহাস শুধু পড়ার বিষয় নয়, ইতিহাস ছোঁয়া যায়, ইতিহাসের গায়ে হাত বোলানো যায়। আর ঠিক এই অনুভূতিটাই চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটনের মূল শক্তি। এখানে ভ্রমণ শুধু দর্শনীয় স্থান দেখা নয়; এ যেন একটি সভ্যতার আত্মার সঙ্গে কথোপকথন।

সংস্কৃতি যেখানে রক্তের মতো প্রবহমান

চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কোনো জাদুঘরের কাঁচের বাক্সে বন্দী করা যায় না, কারণ এই সংস্কৃতি এখনো জীবিত; কখনো রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে, বা সকালের পার্কে তাইচি করতে থাকা বৃদ্ধের হাতের মুদ্রায়, অথবা বসন্ত উৎসবের আগের রাতে আকাশভাঙা আতশবাজিতে। আমি যখন নানজিংয়ে পড়তে আসি, প্রথম কয়েক মাসে আমার মনে হতো এ যেন এক অদ্ভুত সময়যাত্রা। এক পাশে আকাশছোঁয়া কাঁচের দালান, আরেক পাশে কয়েকশ বছরের পুরনো মন্দির, যেখানে প্রতিদিন সকালে ধূপ জ্বলে। চীনের সংস্কৃতি এখানেই অনন্য আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীনত্বের এই মিশেলটাই তার পর্যটনের প্রাণ। 

২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন আরও চারটি স্থানকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করেছে;  বেইজিং সেন্ট্রাল অ্যাক্সিস, জিংমাই পর্বতের প্রাচীন চা বন, শিয়া রাজবংশের সমাধি, এবং প্রাচীন সমুদ্রবাণিজ্য কেন্দ্র ছুয়ানজৌ। এখন পর্যন্ত চীনের ৬০ টি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান আছে, যার প্রতিটিই একেকটি জীবন্ত ইতিহাসের সাক্ষী। আর চীন এই ঐতিহ্য শুধু সংরক্ষণ করছে না, ৬৫টি জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যান এবং ২০০টির বেশি সংস্কৃতি-কেন্দ্রিক পর্যটন রুট তৈরি করেছে। ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সুসংহত তদারকির আওতায় আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, অর্থাৎ সংস্কৃতি এখন শুধু আবেগ নয়, রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ।

যে শহরগুলো প্রাচীন সময়কে মনে করিয়ে দেয়

রাজধানী বেইজিং

বেইজিং যেন এক জীবন্ত জাদুঘর। ফরবিডেন সিটি সেই প্রকাণ্ড প্রাসাদ, যেখানে পাঁচশো বছর ধরে ২৪ জন সম্রাট রাজত্ব করেছেন । এখানে ঢুকলে মনে হয় সময় থমকে গেছে। ১৮০ একরজুড়ে ছড়ানো এই প্রাসাদ নগরীর প্রতিটি লাল দরজা, প্রতিটি সোনালি ছাদের কারুকার্য যেন একেকটি গল্প বলে। আমি যখন প্রথম বার সেখানে গেলাম, এক চীনা দাদু আমার পাশে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে বললেন, ‘তুমি জানো, এই প্রাসাদের প্রতিটি ইটের নিচে একটা করে গল্প চাপা আছে।’ কথাটা নিছক কাব্যিক নয় এখানকার প্রতিটি কোণে ইতিহাস জমে আছে পলিমাটির মতো।

 

ঝাংজিয়াজিয়ে ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্ক।

 


শিয়ান: মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা সৈন্যবাহিনী

টেরাকোটা আর্মি নিয়ে যতই পড়েছি, কিছুই আমাকে প্রস্তুত করতে পারেনি সেই দৃশ্যের জন্য। ১৯৭৪ সালে এক কৃষক কুয়া খুঁড়তে গিয়ে যে আবিষ্কার করেছিলেন, তা আজ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ঘটনা। হাজার হাজার মাটির সৈন্য, ঘোড়া, রথ প্রতিটি মুখভঙ্গি আলাদা, প্রতিটি বর্মের নকশা ভিন্ন। সম্রাট ছিন শি হুয়াং (Qin Shi Huang) মৃত্যুর পর নিজের সুরক্ষায় এদের তৈরি করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মৃত্যুর পরও মানুষের জীবন থাকে। তাই পরলোকে তাকে পাহারা দেওয়া এবং সেখানেও নিজের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি এই বিশাল মাটির সেনাবাহিনী তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি যখন প্রদর্শনী কক্ষের ব্যালকনি থেকে নিচে তাকালাম, সেই সারিবদ্ধ সৈন্যদের দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল মনে হলো তারা যেন দুই হাজার বছর ধরে শুধু শত্রুকেই খুঁজছে।


সাংহাই: যেখানে গতকাল আর আগামীকাল একসঙ্গে দাঁড়িয়ে

সাংহাইয়ের বান্ডে দাঁড়িয়ে হুয়াংপু নদীর ওপারে পুডং-এর আকাশছোঁয়া টাওয়ারগুলোর দিকে তাকালে যে ছবিটা চোখে পড়ে, সেটা যেন কল্পবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ পৃথিবী। অথচ পেছনে তাকালে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের পুরনো বাড়িগুলো, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের সাংহাইয়ের স্মৃতির নিদর্শন। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই সাংহাইয়ের ম্যাজিক। বন্ধুরা মিলে রাতের বেলা বান্ডে হাঁটতে হাঁটতে আইসক্রিম খাচ্ছিলাম, আর ভাবছিলাম বাংলাদেশের পুরান ঢাকার সরু গলিগুলোর সঙ্গে এই দ্যুতিময় নগরীর কত অমিল, অথচ দুই জায়গাতেই ইতিহাস আর আধুনিকতা পাশাপাশি বাস করছে।

হাংঝো ও ওয়েস্ট লেক

ওয়েস্ট লেকের সকাল যেন চীনা জলরঙের পেইন্টিং থেকে উঠে আসা কোনো দৃশ্য। কুয়াশার ভেতর দিয়ে উইলো গাছের ঝুলন্ত শাখা, দূরে প্যাগোডার ছায়া, পানিতে রাজহাঁসের ভেসে বেড়ানো; সব মিলিয়ে মনে হয় বাস্তবতা আর কবিতার সীমারেখা মুছে গেছে। হাংঝো শহরটা চীনের সাংস্কৃতিক রোমান্টিকতার প্রতীক। মার্কো পোলো একে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও চমৎকার শহর।’
আমি যখন লেকের পাশে বসে গ্রিন টি-তে চুমুক দিচ্ছিলাম, এক পাশে বাঁশের বাঁশির সুর ভেসে আসছিল মুহূর্তটা এতটাই নিখুঁত ছিল যে ফোনে ছবি তুলতেও ইচ্ছে করছিল না। চোখ দিয়েই ধরে রাখতে চাচ্ছিলাম সবটা।
 
ঝাংজিয়াজিয়ে

ঝাংজিয়াজিয়ে ন্যাশনাল ফরেস্ট পার্কে ঢুকে প্রথম যে অনুভূতি হয়, তা হলো ‘এটা কি সত্যি?’ আকাশের দিকে উঠে যাওয়া বিশাল বিশাল বেলেপাথরের স্তম্ভ, যেন কোনো দৈত্য, প্রকৃতির খেলাঘর থেকে এগুলো মাটিতে পুঁতে রেখেছে। জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ সিনেমার ভাসমান পাহাড়গুলো এই স্তম্ভগুলো থেকেই অনুপ্রাণিত। আমি যখন কাঁচের স্কাইওয়াকের ওপর দাঁড়িয়ে হাজার ফুট নিচে বনের দিকে তাকালাম, তখন বাংলাদেশের সিলেটের চা বাগান বা বান্দরবানের পাহাড়ের কথা মনে পড়ল প্রকৃতি যে কত বিচিত্র রূপ নিতে পারে, তা শুধু চীন ঘুরলেই বোঝা যায়।

ভ্রমণের স্বাদ: ট্রেন, খাবার আর উৎসব

চীনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক ২০২৫ সালে ৪.৬ বিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করেছে, যা পৃথিবীর অর্ধেক জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে এই নেটওয়ার্ক ৬০,০০০ কিলোমিটারে প্রসারিত করার পরিকল্পনা আছে। ভাবুন, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে খুলনা যেতে যে সময় লাগে, এখানে তার চেয়ে কম সময়ে বেইজিং থেকে সাংহাই পৌঁছে যাওয়া যায়। ট্রেনের নিঃশব্দ গতি, পরিচ্ছন্নতা, আর নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানোর সংস্কৃতি প্রতিটি ভ্রমণকে নিখুঁত আরামদায়ক করে তোলে।

আর খাবারের গল্প না বললে চীনের ভ্রমণকথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বেইজিংয়ের রাস্তার ধারে গরম গরম জিয়াওজি (ডাম্পলিং) খেতে খেতে মনে হলো ঢাকার চকবাজারের সিঙাড়া-পুরির কথা। সিচুয়ানের ঝাল খাবার খেয়ে চোখে পানি এলেও স্বাদ এতই অপ্রতিরোধ্য যে থামানো যায় না। সাংহাইয়ের শেংজিয়ানবাও, ভাজা স্টিমড বান যেন বাংলাদেশের ভাপা পিঠার চীনা সংস্করণ। আর চায়ের কথা তো আলাদা করে বলতে হয়, বাংলাদেশ যেমন চায়ের দেশ, চীনও তেমনই চা সংস্কৃতির জননী। লংজিং চায়ের প্রথম চুমুকটিতে যেন হাংঝোয়ের পাহাড়ি সকালটাই গিলে ফেলছিলাম।

উৎসবের সময় চীন হয়ে ওঠে এক ভিন্ন গ্রহ। আমার দেখা প্রথম চীনা নববর্ষ ছিল এক চোখ-ধাঁধানো অভিজ্ঞতা। পুরো শহর লাল লণ্ঠনে সেজে ওঠে। আকাশে আতশবাজির ফুলঝুরি, রাস্তায় ড্রাগন নাচ, বাচ্চাদের হাতে লাল খাম বাংলাদেশের ঈদের আনন্দের সঙ্গে এর কত মিল! দুই সংস্কৃতির উৎসবপ্রিয়তার এই মিলটা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। মনে হয়েছে, উৎসবের ভাষা আসলে সার্বজনীন।

সংরক্ষণ আর আধুনিকতার সেতুবন্ধন

চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ঐতিহ্য সংরক্ষণ আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন একই পথে হাঁটতে পারে। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত চারটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চীনের প্রাকৃতিক ও মিশ্র ঐতিহ্য স্থানগুলোর সংরক্ষণের মান বিশ্ব গড়ের চেয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো। ৯০ শতাংশের বেশি ঐতিহ্য স্থানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংরক্ষণ কর্মী হিসেবে নিয়োগ করা হয়, অর্থাৎ পর্যটন এখানে স্থানীয় অর্থনীতিরও চালিকাশক্তি।

২০২৫ সালে চীন ৬.৫ বিলিয়ন অভ্যন্তরীণ পর্যটন ট্রিপ এবং ৬৮ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটকের রেকর্ড গড়েছ। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে চীন হবে বিশ্বের এক নম্বর পর্যটন অর্থনীতি। ভিসামুক্ত নীতির আওতায় ২০২৫ সালে ৩০ মিলিয়নের বেশি বিদেশি পর্যটক চীন ভ্রমণ করেছেন যা আগের বছরের তুলনায় বহুগুণ বেশি। কিন্তু চীনের পর্যটন এখন শুধু গ্রেট ওয়াল বা ফরবিডেন সিটির মতো বড় গন্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন হাই-স্পিড রেল রুট ছোট শহর আর গ্রামীণ অঞ্চলগুলোকে পর্যটনের মানচিত্রে নিয়ে এসেছে। ২০২৬ সালের বসন্ত উৎসবের নয় দিনে প্রায় ৫৯৬ মিলিয়ন অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের চেয়ে ৯৫ মিলিয়ন বেশি। জাদুঘর, ঐতিহাসিক পাড়া, লোকজ উৎসব, পারফর্মিং আর্ট সব মিলিয়ে চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটন এখন পরিপূর্ণ এক বাস্তুসংস্থান।

বাংলাদেশ আর চীনের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নতুন নয়। বর্তমানে পদ্মা সেতু থেকে কর্ণফুলী টানেল চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় অংশীদার। কিন্তু সাংস্কৃতিক বিনিময়ের যে সেতু তৈরি হচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে মজবুত। বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে চীনে থেকে আমি প্রতিদিনই নতুন কিছু শিখছি। চীনাদের কাছে পরিবারের গুরুত্ব, বড়দের প্রতি সম্মান, খাবারের প্রতি ভালোবাসা এগুলো আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে এতটাই মিলে যায় যে মাঝে মাঝে ভুলেই যাই আমি ভিনদেশে আছি। অথচ পার্থক্যগুলোও সমান আকর্ষণীয় তাদের সময়ানুবর্তিতা, কর্মনিষ্ঠা, আর দলগত কাজের প্রতি নিষ্ঠা আমাদের সমাজের জন্যও বড় শিক্ষা। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন চীনের মতো বাংলাদেশও তার ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবে। আমাদের সুন্দরবন, পাহাড়পুর, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, সোনারগাঁ এসব স্থানের পর্যটন সম্ভাবনা অফুরান। চীনের কাছ থেকে শেখার বিষয় হলো পর্যটন মানেই শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁ নয়, পর্যটন হলো সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলন, স্থানীয় অর্থনীতির ইঞ্জিন, আর জাতির আত্মপরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার মাধ্যম।

শেষ কথা

গ্রেট ওয়াল থেকে ফেরার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। পাহাড়ের গায়ে প্রাচীরের শেষ আলোটুকু আঁকাবাঁকা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছিল এই প্রাচীর যেন চীনেরই প্রতিচ্ছবি দীর্ঘ, সহিষ্ণু, স্থিতধী, আর রহস্যে মোড়া। যে পর্যটক শুধু ছবি তুলতে আসে, সে প্রাচীরের পাথর দেখে ফেরে। কিন্তু যে ভ্রমণকারী ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করতে চায়, সে বোঝে এই পাথরগুলো শুধু সীমানা গড়েনি, এগুলো একটা সভ্যতার মেরুদণ্ড। চীনের সাংস্কৃতিক পর্যটন আমাকে শিখিয়েছে যে ভ্রমণ মানে শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো নয় ভ্রমণ হলো নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা, অন্য সংস্কৃতির আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা। বাংলাদেশি হিসেবে আমি বুঝেছি, আমাদের সংস্কৃতি আর চীনের সংস্কৃতির মধ্যে যে মিলগুলো আছে, সেগুলোই দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রকৃত ভিত্তি। আর পার্থক্যগুলো? সেগুলো শেখার জানালা নতুন করে ভাবতে শেখায়, নতুন চোখে দেখতে শেখায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, নানচিং ইউনিভার্সিটি অফ ইনফরমেশন সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি।

আরও ঝলমলে রঙিন হচ্ছে পাহাড়ি শহর ছোংছিংয়ের রাত

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৬:০০ পিএম
আরও ঝলমলে রঙিন হচ্ছে পাহাড়ি শহর ছোংছিংয়ের রাত
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের শহর ছোংছিং।

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের শহর ছোংছিং মিউনিসিপালিটি এক ব্যস্ত পাহাড়ি শহর হিসেবে পরিচিত। এখানে এক বৃহৎ আকারের সমন্বিত  আলোকসজ্জার পরিকল্পনা চালু করা হয়ছে। এর লক্ষ্য আরও ঝলমলে রাতের নগরদৃশ্য তৈরি করে পর্যটন ও ভোগব্যয় বৃদ্ধি করা।
শহরটি তার খাড়া ভূপ্রকৃতি, দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চ ভবন ও নদীতে উঁচু সেতুর জন্য পরিচিত, যা পরিকল্পনাকারীদের জন্য একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুউচ্চ কাঠামো দিয়ে তারা আরও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নগর আকাশরেখা গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছেন।
এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৬ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকাকে কেন্দ্র হিসেবে  নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে উজ্জ্বলতা, রঙ এবং আলো সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। এতে এক চমকপ্রদ রাতের দৃশ্য তৈরির চিন্তা রয়েছে। 
ছোংছিং মিউনিসিপাল আরবান লাইটিং সেন্টারের উপ-পরিচালক ছেন ইউয়ানখে  বলেন, ‘এই গ্রাফিকটি উজ্জ্বলতার অংশকে তুলে ধরছে। আগে ভবনগুলো নিজেদের মতো করে আলোর ব্যবস্থা পরিচালনা করত। এখন আমরা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি।’
আলোকসজ্জার নকশা কেবল অনুভূমিক নয়, বরং উল্লম্বভাবেও বিস্তৃত, যা শহরের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিকে পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে।
ছোংছিং মিউনিসিপাল আরবান ম্যানেজমেন্ট ব্যুরোর লাইটিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপ-পরিচালক লি হুয়াতোং বলেন, ‘কেন্দ্রীয় এলাকায় শহরের আলোর আভা একটি পটভূমি তৈরি করে, যেখানে সড়ক আলোকসজ্জা মূল স্রোত এবং ভবনগুলোর আলোকসজ্জা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। ফলে একটি সামগ্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।’
শহর প্রশাসন এই সমন্বিত আলোকসজ্জা প্রকল্প উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তব সময়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে—ঠিক কখন এবং কীভাবে আলো জ্বলবে বা নিভবে। 
কর্তৃপক্ষ বলছে, ছোংছিং তার প্রিয় রাতের দৃশ্যকে পর্যটন ও ভোগব্যয়ের চালিকাশক্তি হিসেবে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চায়। 
ছোংছিং টিভির কনটেন্ট প্রোডাকশন সেন্টারের উপ-পরিচালক কুও পেইচুন বলেন, ‘গত বছর ছোংছিংয়ে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। ভোক্তা ব্যয় পৌঁছেছে ৫৫৮.৫ বিলিয়ন ইউয়ানে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি।’ সূত্র: সিএমজি বাংলা

নর্ডিক দেশসমূহ: প্রকৃতি, সমৃদ্ধি ও মানবিক উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:১০ পিএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
নর্ডিক দেশসমূহ: প্রকৃতি, সমৃদ্ধি ও মানবিক উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত
ছবি: খবরের কাগজ

ইউরোপের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত নর্ডিক দেশসমূহ পৃথিবীর অন্যতম শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ এবং বাসযোগ্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নয়, বরং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নত জীবনমানের জন্যও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।

বিশ্ব সুখ সূচক, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্বচ্ছতা, মানবাধিকার এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নর্ডিক দেশগুলো নিয়মিতভাবে শীর্ষস্থান অধিকার করে। এখানকার মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে বিশ্বাস করে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়নের এক অনন্য মডেল গড়ে তুলেছে।

নরওয়ে: ফিয়র্ডের দেশ

নরওয়ে তার অপরূপ ফিয়র্ড, সুউচ্চ পাহাড়, জলপ্রপাত এবং দীর্ঘ সমুদ্র উপকূলের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। হাজার হাজার বছর আগে হিমবাহের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া গভীর উপসাগর বা ফিয়র্ডগুলো আজও পর্যটকদের বিস্ময়ে অভিভূত করে।

রাজধানী অসলো আধুনিক নগর পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সুপরিচিত। অন্যদিকে লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জ, গেইরাঙ্গার ফিয়র্ড এবং ট্রোমসো অঞ্চলে দেখা মিলতে পারে প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময় নর্দার্ন লাইটসের। এসব স্থান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

সুইডেন: উদ্ভাবন ও প্রকৃতির মেলবন্ধন

সুইডেন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বৃহত্তম দেশ। বিস্তীর্ণ বনভূমি, অসংখ্য হ্রদ এবং আধুনিক নগর সভ্যতার এক চমৎকার সমন্বয় এখানে দেখা যায়।

রাজধানী স্টকহোম উত্তর ইউরোপের অন্যতম সুন্দর শহর হিসেবে পরিচিত। অসংখ্য দ্বীপের ওপর গড়ে ওঠা এই শহরকে অনেকেই “উত্তরের ভেনিস” বলে অভিহিত করেন।

প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, পরিবেশবান্ধব জীবনধারা এবং উচ্চমানের শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে সুইডেন বিশ্বের অন্যতম উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণা, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।

ফিনল্যান্ড: হাজার হ্রদের দেশ

ফিনল্যান্ডকে বলা হয় হাজার হ্রদের দেশ। বাস্তবে দেশটিতে রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি হ্রদ।

গ্রীষ্মকালে সবুজ বনভূমি ও হ্রদের অপরূপ সৌন্দর্য যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি শীতকালে তুষারে ঢাকা প্রাকৃতিক দৃশ্য এক ভিন্ন জগতের অনুভূতি তৈরি করে।

রাজধানী হেলসিঙ্কি আধুনিক স্থাপত্য, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং উন্নত নগর ব্যবস্থাপনার জন্য পরিচিত। উত্তরাঞ্চলের ল্যাপল্যান্ডে প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক নর্দার্ন লাইটস দেখতে আসেন।

বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যও ফিনল্যান্ড সুপরিচিত। পাশাপাশি প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ডেনমার্ক: সুখী মানুষের দেশ

ডেনমার্ককে প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর একটি বলা হয়। নাগরিকদের উচ্চ জীবনমান, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রাজধানী কোপেনহেগেন তার রঙিন নৌবন্দর, সাইকেল সংস্কৃতি এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনার জন্য বিখ্যাত।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ডেনমার্ক বিশ্বের অগ্রগামী দেশগুলোর অন্যতম। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও সবুজ অর্থনীতির বিকাশেও দেশটির ভূমিকা প্রশংসিত।

আইসল্যান্ড: আগুন ও বরফের দেশ 

আইসল্যান্ড প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। আগ্নেয়গিরি, হিমবাহ, গেইসার, উষ্ণ প্রস্রবণ এবং জলপ্রপাতের অপূর্ব সমন্বয় দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে।

রাজধানী রেইকিয়াভিক পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরাঞ্চলীয় রাজধানী শহর। এখানে প্রকৃতির অপরিসীম শক্তি এবং আধুনিক জীবনযাত্রা পাশাপাশি অবস্থান করছে।

আইসল্যান্ডের ভূপ্রকৃতি যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি এর প্রাকৃতিক পরিবেশও পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।

কেন নর্ডিক দেশগুলো বিশ্বে অনন্য?

নর্ডিক দেশগুলোর সাফল্যের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য-

উন্নত এবং বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচের শিক্ষা ব্যবস্থা
শক্তিশালী ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা
পরিবেশবান্ধব নীতি ও টেকসই উন্নয়ন
দুর্নীতির নিম্ন হার
নারী-পুরুষের সমতা
শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার
প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ

এখানকার মানুষ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসেন। বনভূমিতে হাঁটা, হ্রদের ধারে সময় কাটানো, মাছ ধরা, স্কিইং কিংবা পরিবার নিয়ে কটেজে অবকাশ যাপন তাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভবিষ্যতের জন্য একটি অনুপ্রেরণা

নর্ডিক দেশগুলো শুধু পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় নয়; মানবিক উন্নয়ন, সুশাসন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বিশ্বের জন্য এক অনুকরণীয় উদাহরণ।

আধুনিক সভ্যতার অগ্রযাত্রায় কীভাবে পরিবেশ, মানুষ এবং উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, তার সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই অঞ্চল। উন্নয়ন যে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের জীবনমান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত- নর্ডিক দেশগুলো তারই বাস্তব উদাহরণ।

বরফে আচ্ছাদিত পাহাড়, সবুজ বনভূমি, নীল হ্রদ, মনোমুগ্ধকর ফিয়র্ড এবং উন্নত জীবনব্যবস্থার সমন্বয়ে নর্ডিক অঞ্চল সত্যিই পৃথিবীর এক অনন্য সৌন্দর্যের নাম। একবার যে এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও জীবনধারা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়, তার হৃদয়ে নর্ডিক দেশগুলোর জন্য একটি বিশেষ স্থান তৈরি হয়ে যায়।

আমান/

যশোর জেলার দর্শনীয় ও ভ্রমণযোগ্য স্থান

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম
যশোর জেলার দর্শনীয় ও ভ্রমণযোগ্য স্থান
গদখালী ফুলের গ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ফুলচাষ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ছবি এআই

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। এই জেলায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, শতবর্ষী স্থাপনা, ধর্মীয় নিদর্শন, সবুজ উদ্যান এবং বিনোদনকেন্দ্র। পরিবার, বন্ধু বা একক ভ্রমণ—সব ধরনের পর্যটকের জন্যই যশোরে রয়েছে আকর্ষণীয় অনেক গন্তব্য। চলুন জেনে নেওয়া যাক যশোর জেলার কয়েকটি ভ্রমণযোগ্য স্থানের কথা।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান, সাগরদাঁড়ি
বাংলা সাহিত্যের অমর কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান। এখানে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি, জাদুঘর এবং কপোতাক্ষ নদের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।

কপোতাক্ষ নদ
যশোরের ঐতিহাসিক নদীগুলোর অন্যতম। নদীর তীরবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

যশোর আইটি পার্ক
আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র। প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান।

যশোর কালেক্টরেট পার্ক
শহরের মাঝখানে অবস্থিত পরিচ্ছন্ন ও সবুজ পার্ক। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য উপযোগী।

যশোর পৌর পার্ক
শিশু ও পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদনের জন্য জনপ্রিয় একটি পার্ক।

যশোর ইনস্টিটিউট
ঔপনিবেশিক আমলের ঐতিহাসিক স্থাপনা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয়।

মনিরামপুর জমিদার বাড়ি
প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। অতীতের জমিদারি ঐতিহ্যের সাক্ষী এই ভবন।

নওয়াপাড়া নদীবন্দর
ভৈরব নদের তীরে অবস্থিত ব্যস্ত নদীবন্দর। নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।

ভৈরব নদ
যশোরের অন্যতম প্রধান নদী। নদীতীরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে।

চাঁচড়া শিব মন্দির
প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা। এর ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্ব রয়েছে।

বেনাপোল জিরো পয়েন্ট
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। সীমান্ত এলাকার ব্যস্ততা ও পরিবেশ দেখার সুযোগ রয়েছে।

বেনাপোল স্থলবন্দর এলাকা
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

গদখালী ফুলের গ্রাম
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ফুলচাষ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ফুলে ভরা ক্ষেতের সৌন্দর্য দর্শকদের মুগ্ধ করে।

ঝিকরগাছা ফুলবাগান এলাকা
বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ ও রঙিন প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য জনপ্রিয়।

বকচরা ইকো পার্ক
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য উপযুক্ত একটি বিনোদনকেন্দ্র। সবুজ পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, যশোর
মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ দেয়।

শামস-উল-হুদা স্টেডিয়াম
যশোরের প্রধান ক্রীড়া ভেন্যু। ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে পরিচিত স্থান।

চৌগাছা রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ
অতীতের জমিদারি ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

কেশবপুরের প্রাচীন মন্দিরসমূহ
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বসম্পন্ন কয়েকটি মন্দির নিয়ে গড়ে উঠেছে এই এলাকা।

খাজুরা গ্রামাঞ্চল
গ্রামীণ জীবন, সবুজ প্রকৃতি এবং শান্ত পরিবেশ উপভোগের জন্য আদর্শ স্থান।

দিনে দিনেই ঘুরে আসুন মৈনট ঘাট থেকে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
দিনে দিনেই ঘুরে আসুন মৈনট ঘাট থেকে
ঢাকার দোহার উপজেলায় অবস্থিত মৈনট ঘাটটি রাজধানী থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে।

ঢাকার কাছে একদিনের ছুটিতে ঘুরে আসার মতো দারুণ এক আকর্ষণীয় জায়গা মৈনট ঘাট, যা অনেকের কাছে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিত। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে পরিবার, বন্ধুবান্ধব কিংবা প্রিয়জনদের নিয়ে ঢাকার বাইরে পুরো দিন কাটানোর জন্য এটি হতে পারে এক চমৎকার গন্তব্য।
ঢাকার দোহার উপজেলায় অবস্থিত এ ঘাটটি রাজধানী থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে। ফলে খুব সহজেই সকাল সকাল রওনা হয়ে সারা দিন ঘুরে সন্ধ্যার মধ্যেই আবার ঘরে ফিরে আসা সম্ভব। 
এখানে এসে যখন আপনি দাঁড়াবেন, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠবে পদ্মা নদীর এক অন্তহীন ও সুবিশাল জলরাশি। পদ্মার বুকে হেলেদুলে ভেসে চলা জেলেদের নৌকা, মৃদু বাতাস আর নদীর পাড় ধরে হেঁটে বেড়ানোর অনুভূতি আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও শহরের কোলাহল ভুলিয়ে দেবে। এই চমৎকার পরিবেশের কারণেই ভ্রমণপিয়াসীদের কাছে এটি মিনি কক্সবাজার হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

 

মৈনট ঘাট যাওয়ার উপায়

ঢাকা শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকেই আপনি খুব সহজে দোহারে আসতে পারবেন। যাতায়াতের জন্য নিচে কয়েকটি সহজ ও সুবিধাজনক বিকল্প মাধ্যম তুলে ধরা হলো–
১. সরাসরি বাস সার্ভিস: গুলিস্তান মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ‘যমুনা ডিলাক্স’ বাস ছেড়ে যায়। এই রুটে এটিই একমাত্র বাস যা আপনাকে একেবারে ঘাটের কাছাকাছি নামিয়ে দেবে। রাস্তা ফাঁকা থাকলে সাধারণত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। তবে মনে রাখবেন, মৈনট ঘাট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে আসে সন্ধ্যা ৬টায়। তাই ফেরার তাড়া থাকলে অবশ্যই ৬টার আগেই বাসস্ট্যান্ডে উপস্থিত হতে হবে।
২. মুন্সীগঞ্জ হয়ে যাতায়াত: গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া এলাকা থেকে আপনি ‘নগর পরিবহন’-এর বাসেও আসতে পারেন। নগর পরিবহন নবাবগঞ্জের রাস্তা ব্যবহার না করে মুন্সীগঞ্জ হয়ে যাতায়াত করে। এই বাসে এলে আপনাকে নামতে হবে কার্তিকপুর বাজারে। সেখান থেকে সহজে ঘাটে যাওয়া যায়।
৩. সিএনজি: ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে কদমতলী থেকে কার্তিকপুর বাজার পর্যন্ত লোকাল সিএনজি পাওয়া যায়। জনপ্রতি ভাড়া সাধারণত ১৮০ থেকে ২০০ টাকার মতো। কার্তিকপুর বাজারে নেমে সেখান থেকে যেকোনো অটোরিকশায় চড়ে আপনি অনায়াসেই মৈনট ঘাট চলে যেতে পারবেন।

 

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখতে এখানে সারা বছরই পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। তবে একেক ঋতুতে মৈনট ঘাটের সৌন্দর্য একেক রকম রূপ ধারণ করে–
• বর্ষাকাল: আপনি যদি পদ্মার উত্তাল রূপ, বিশাল ঢেউ আর চারপাশের সতেজ সবুজ প্রকৃতি দেখতে চান, তবে বর্ষাকাল আপনার জন্য সেরা সময়।
• শরৎকাল: সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের দিকে এই অঞ্চলের নদীর চারপাশ কাশফুলে ছেয়ে যায়। মনোরম নীল আকাশ আর সাদা কাশফুলের এই কম্বিনেশন ছবি তোলার জন্য দারুণ এক পরিবেশ তৈরি করে।
• শীতকাল: শীতের সময়ে পদ্মা নদী থাকে একদম শান্ত। এই সময়ে মৈনট ঘাট যাওয়ার পথে রাস্তার দুপাশে মাইলের পর মাইল সোনালি সরিষাখেতের দেখা মেলে। এছাড়া শীতকালে নদীর বুকে ছোট-বড় অসংখ্য চর জেগে ওঠে। স্পিডবোট বা নৌকা ভাড়া করে সেই নির্জন চরে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা।

 

দর্শনীয় স্থান ও আশপাশের পুরাকীর্তি

মৈনট ঘাটের মূল সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি আপনি এর কাছাকাছি এলাকার কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জমিদার বাড়ি ঘুরে দেখতে পারেন। ঘাট এলাকায় পৌঁছানোর আগেই বান্দুরা নামক স্থানে চোখে পড়বে প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো ইতিহাস জড়ানো ‘কোকিল প্যারি জমিদার বাড়ি’। স্থানীয় মানুষ একে ‘কালাকোপা জমিদার বাড়ি’ নামেও ডাকেন। ভাগ্যকুলের তৎকালীন বিখ্যাত জমিদার যদুনাথ রায় তার সন্তানদের বসবাসের জন্য এই দৃষ্টিনন্দন বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন।
এই বাড়ির ঠিক কাছাকাছি এলাকাতেই রয়েছে আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক প্রাচীন ভবন, যার মধ্যে জজবাড়ি, উকিলবাড়ি এবং আন্ধারকোঠা অন্যতম। প্রতিটি স্থাপনাই জমিদার যদুনাথ রায়ের কীর্তি। আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হয়ে থাকেন কিংবা পুরোনো দিনের স্থাপত্যশৈলী ও পুরাকীর্তি দেখতে ভালোবাসেন, তবে মৈনট ঘাট যাওয়ার পথে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোয় একবার ঢুঁ মারতে ভুলবেন না।

খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা

ভ্রমণের সময় খাওয়া-দাওয়ার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মৈনট ঘাটে ঋতুভেদে খাবারের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা থাকে–
• শুকনো ও শীতকালীন মৌসুম: এই সময়ে নদীর পাড়ে অসংখ্য অস্থায়ী খাবারের হোটেল ও দোকান গড়ে ওঠে। পদ্মার একদম টাটকা ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করার মজাই আলাদা। 
• বর্ষাকাল: বর্ষার সময়ে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘাটের সব অস্থায়ী দোকানপাট বন্ধ থাকে। তখন দুপুরের খাবারের জন্য আপনাকে কাছেই অবস্থিত কার্তিকপুর বাজারে যেতে হবে। এই বাজারে চলনসই ও মাঝারি মানের বেশ কিছু ভাতের হোটেল রয়েছে।
• মিষ্টির স্বাদ: কার্তিকপুর বাজারে এলে বিখ্যাত ‘রণজিৎ মোদক’ এবং ‘নিরঞ্জন মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’-এর রসগোল্লা চেখে দেখতে একদম ভুলবেন না। মিষ্টির পাশাপাশি এখানকার সুস্বাদু টক ও মিষ্টি দইও বেশ জনপ্রিয়।

 

রাতযাপনের সুবিধা

পর্যটকদের রাতে থাকার জন্য মৈনট ঘাট বা এর আশপাশে ভালো মানের কোনো হোটেল, গেস্টহাউস, বোর্ডিং কিংবা আধুনিক রিসোর্ট গড়ে ওঠেনি। এরপরও যদি আপনি বিশেষ প্রয়োজনে সেখানে রাত কাটাতে চান, তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে কোনো বাসা বা থাকার জায়গা ম্যানেজ করতে হবে। অন্যথায়, ডে ট্যুর বা দিনের আলো থাকতেই ঘুরে ঢাকায় ফিরে আসাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ভ্রমণকালীন সতর্কতা

যেকোনো ট্যুর সুন্দর ও নিরাপদ করতে কিছু নিয়মকানুন মেনে চলা উচিত। মৈনট ঘাট ভ্রমণের সময় নিচের বিষয়গুলো বিশেষভাবে খেয়াল রাখুন–
• সাঁতার ও গোসল: আপনি যদি ভালো সাঁতার না জানেন, তবে পদ্মা নদীতে গোসল করার সময় একদমই বেশি গভীরে যাবেন না। পদ্মার স্রোত অত্যন্ত তীব্র ও বিপজ্জনক হতে পারে।
• পরিবেশ রক্ষা: চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টার, প্লাস্টিকের পানির বোতল কিংবা যেকোনো ধরনের বর্জ্য নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলুন। নদীর পানি বা ঘাটের পরিবেশ নোংরা করবেন না।
• বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ: নদী বা চরের আশপাশে পাখি শিকার করা অথবা পাখিদের বিরক্ত করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
• সামাজিক শিষ্টাচার: জনসমক্ষে বা অপরিচিত মানুষের সামনে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকুন। স্থানীয় দোকানদার, অটোরিকশাচালক ও ট্রলারের মাঝিসহ সবার সঙ্গে সব সময় মার্জিত ও বিনয়ী ব্যবহার করুন। কাউকে কখনো ছোট করে দেখবেন না।
• নারীদের প্রতি সম্মান: আপনার কোনো আচরণ বা কথায় যেন একক বা দলবদ্ধভাবে ঘুরতে আসা কোনো নারী পর্যটক কিংবা স্থানীয় নারীরা বিন্দুমাত্র অস্বস্তি বা বিরক্তিবোধ না করেন, সেদিকে সর্বোচ্চ খেয়াল রাখুন।