সময়টা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস। গন্তব্য মরুর বুক সংযুক্ত আরব আমিরাতে এশিয়া কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট কাভার করা। যাওয়ার সব পরিকল্পনাই চূড়ান্ত। সঙ্গী প্রিয় বন্ধুদের একজন বাংলাদেশ প্রতিদিনের আসিফ ইকবাল। ঢাকা কিংবা দেশের বাইরে কোনো টুর্নামেন্ট একসঙ্গে কাভার করতে গেলে একজন আরেকজনের সফরসঙ্গী হয়ে যাই। আমাদের গন্তব্য দুবাই হয়ে আবুধাবি যাওয়া। ১০ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে দুবাই সময় রাত ১টার দিকে গিয়ে পৌঁছাব। সেখান থেকে রাতেই আবুধাবি যাওয়া। কিন্তু হঠাৎ করেই আসিফ তার যাওয়ার তারিখ পরিবর্তন করে পিছিয়ে দেয়। এতে করে সমস্যায় পড়ে যাই আমি। সমস্যা বলতে মধ্যরাতে দুবাই নেমে একাকী আবুধাবি যাওয়া নিয়ে।
অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করতে দেশের বাইরে একাধিকবার একা গিয়েছি। যাওয়ার তালিকায় আছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশও। কেউ না কেউ এসে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করেছেন। একা সফর করলে আমার এয়ারপোর্টে নেমে নতুন কোনো জায়গায় যেতে মনের ভেতর কেমন জানি একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু আসিফ সঙ্গী হবে মনে করে পরিচিত অনেকে থাকার পরও কাউকে এয়ারপোর্টে আসার জন্য বলিনি। এর আগে ২০১৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রথম গিয়েছিলাম এভাবে একাই। দুবাইয়ে থাকায় এয়ারপোর্টে নেমে ট্যাক্সি নিয়ে সরাসরি চলে গিয়েছিলাম হোটেলে। তাই একা যাওয়ার দিধাটা খুব বেশি প্রভাব লাগেনি।
এবার দুবাই নামার পরের দিনই এশিয়া কাপে বাংলাদেশের প্রথম খেলা। সিদ্ধান্ত নেই যেভাবেই হোক দুবাই নেমে রাতেই চলে যাব আবুধাবি। দেশে থাকতেই আমার এলাকা নারায়ণগঞ্জের জামতলার ছোট ভাই ইয়াসিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে মধ্যরাতে দুবাই থেকে আবুধাবি যাওয়ার ব্যবস্থা কী তা জানাতে বলি। এদিকে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের প্রিয় এক বন্ধু স্বপন বিষয়টি জানতো। সে আবার নিজ থেকেই আজমানে বসবাসরত নারায়ণগঞ্জের বন্দরের দেলোয়ার ভাইকে আমার সমস্যার কথাটি জানায়। দেলোয়ার ভাই এয়ারপোর্টে আসবেন বলে স্বপন আমাকে নিশ্চিত করে। ২০২১ সালে আমি যখন দ্বিতীয়বার মরুর বুকে গিয়েছিলাম, তখন এই দেলোয়ার ভাই আমাকে অনেক সময় দিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। দেলোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় আবার স্বপনের মাধ্যমেই।
এদিকে ইয়াসিন আবার যখন আমাকে ফোন করল, তখন আমার অবাক হওয়ার পালা। আবুধাবি আসা নিয়ে আমি যেন কোনো টেনশন না করি। দেলোয়ার নামে তার সন্দ্বীপের এক বন্ধুকে নিয়ে সে চলে আসবে। এতদূর থেকে আসতে তাকে বারবার বারণ করেছি। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সে আসবেই। জানাল, এর আগে আমি দুবার আবুধাবিতে এলেও কখনো তার সঙ্গে দেখা হয়নি। এবার আর সে সুযোগটি হাতছাড়া করতে চায় না। অগত্যা তার কথাতেই আমাকে সায় দিতে হলো। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রথমে গিয়ে তার ওখানে উঠতে হবে বলেও জানাল। তার পর যদি ভালো না লাগে, তা হলে হোটেলে। কিন্তু আমি তার এ প্রস্তাবে আর রাজি হইনি। শুধু প্রথমে গিয়ে তার ওখানে উঠব বলে জানাই। পরে হোটেলে চলে যাব। দেশে থাকতেই তার মাধ্যমে রামাদা হোটেলে রুম বুকিং করে রেখেছিলাম।
বিদেশে একাকী নেমে নিজ গন্তব্যে যাওয়ার টেনশন দূর হওয়ার পর যথারীতি ১০ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত তারিখেই যাত্রা করে যথাসময়েই দুবাই পৌঁছি। আমি এয়ারপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা সারতে সারতেই দুজনেই তাদের গাড়ি নিয়ে চলে আসেন। মধ্যরাতে দুবাই এয়ারপোর্টের বাইরে ত্রিপক্ষীয় আড্ডা বেশ জমে ওঠে। বেশকিছু সময় পার করে তারপর আজমানের দেলোয়ার ভাইকে বিদায় দিয়ে ইয়াসিনের গাড়িতে উঠে পড়ি।
দুবাই থেকে আবুধাবি দুই ঘণ্টার মতো যাত্রা। ইয়াসিন ও তার বন্ধু দেলোয়ারের সঙ্গে গল্প করতে করতেই আবুধাবির কাছাকাছি চলে আসি। যাত্রপথে দুজনের কাছ থেকে আবুধাবি সম্বন্ধে মোটামুটি ভালো একটা ধারণা পেয়ে যাই। তারাও বাংলাদেশ সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে চান। আসার পথে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে রাতের দুবাই আর আবুধাবিও দেখা হয়ে যায়। দুবাই সরগরম থাকলেও আবুধাবি ছিল নীরব। আলো ঝলমলে সুউচ্চ বিল্ডিংগুলো মুগ্ধতা ছড়িয়ে অন্যরকম এক মায়ার জালে আবদ্ধ করে ফেলে। গন্তব্যস্থল খালিদিয়ায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভোর হয়ে যায়। একটু ফ্রেশ হয়েই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাই। সে দিনই বাংলাদেশের খেলা থাকায় এবং অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড সংগ্রহ করার জন্য স্টেডিয়ামে একটু তাড়াতাড়ি যাওয়ার তাড়া ছিল। আবার হোটেল চেক ইন করতে হবে। তাই খুব বেশি সময় ঘুমাতে পারিনি। নাশতা খাওয়ার পর ইয়াসিন ও দেলোয়ার জানাল দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে হবে। আবুধাবির শেখের বাড়ি থেকে খাবার আসবে।
আমি প্রথমে ভেবেছিলাম সাধারণ কোনো শেখ হবেন। পরিচয় জানতে চাইলে দেলোয়ার জানাল এই শেখ হলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি ও আবুধাবির শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নায়িহান। মাস্টার আবুল বশার নামে সন্দ্বীপের একজন প্রবাসী বাংলাদেশি রাষ্ট্রপতির বাসভবনের ফুড ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত। তিনিই খাবার পাঠাবেন। এভাবে তিনি প্রায় খাবার পাঠিয়ে থাকেন। দুপুরের খেতে বসে এত খাবার দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। আমি আবার সে রকম ভোজনরসিক না হওয়ায় খুব কমই খাবারের স্বাদ নিতে পেরেছি। কিন্তু ইয়াসিন-দেলোয়ার জানাল এই খাবারই শেষ নয়, আরেক দিন আসতে হবে। সেদিন খাবারের মেন্যুতে আরও বেশি খাবার থাকবে!
খালিদিয়া থেকে চলে আসার পর পেশাগত কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু প্রতিদিনই ইয়াসিন একাধিকবার ফোন করে খোঁজখবর নিত। সেই সঙ্গে আবার কবে খেতে আসব সেটি জানতে চায়। সঙ্গে বাংলাদেশে আরও যারা থাকছেন তাদেরকেও নিয়ে আসতে বলে। আমার সঙ্গে রুমমেট হিসেবে সমকালের সঞ্জয় সাহা পিয়াল ছাড়াও একই হোটেলে ছিল প্রথম আলোর মাহমুদুল হাসান বাপ্পি ও ডেইলি স্টারের একুশ তাপাদার। এসিসির মিডিয়া বিভাগ থেকে জানানো হয়েছিল ১৪ সেপ্টেম্বর দুবাইতে পাকিস্তান-ভারত ম্যাচ বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কাভার করার কোনো সুযোগ নেই। তাই ১৪ তারিখই শেখের বাড়ির খাবারের ভূরিভোজ করার দিন চূড়ান্ত করা হয়। বাপ্পি ও একুশ তাদের কাজ থাকায় যেতে পারেনি। আমি আর পিয়াল যাই।
এদিকে আমরা আসব বলে খালিদিয়ায় আগে থেকেই প্রবাসী কিছু বাংলাদেশি ভাই এসেছিলেন। এখানে যারা এসেছিলেন একমাত্র ইয়াসিন ছাড়া বাকি সবাই সন্দ্বীপের বাসিন্দা। আলাপচারিতায় জানা গেল সন্দ্বীপের বাসিন্দাই বেশি বসবাস করেন। গড়ে উঠেছে সন্দ্বীপ অ্যাসোসিয়েশন ইউ এ ই। সংগঠনটি বেশ শক্তিশালী। সেই সংগঠনেরই সভাপতি আবার মাস্টার আবুল বশার, যিনি এই খাবারের মহাযজ্ঞের আয়োজক। ১৯৯০ সালে কাজে যোগ দিয়ে এখন ফুড ইনচার্জ। বর্তমান রাষ্ট্রপতি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নায়িহানের আগে তার পিতা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান এবং মাতা শেখ ফাতেমা বিনতে মোবারক জীবিত থাকাকালীন সময়েও কাজ করেছেন। ১৯৮৭ সালে মরুর বুকে আসার আগে দেশে শিক্ষকতা করতেন। তিনি এসেছিলেন মোটামুটি সন্দ্বীপ অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটি নিয়েই। তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা হাজি আব্দুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মিঠু, সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, দপ্তর সম্পাদক আকতার হোসেন, সহ-প্রচার সম্পাদক শিহাব উদ্দিন রকি, কার্যনির্বাহী সদস্য হাজি হেদায়েত, মোহাম্মদ ফারভেজ। পরিচয়পর্ব শেষে খুব বেশি সময় গল্প করার সুযোগ হয়নি। খাওয়ার জন্য তাড়া দেওয়া হলো। ঘরে প্রবেশ করার সময় দেখেছিলাম পুরো রুম মোড়ক দিয়ে ঢাকা বিভিন্ন খাবারের পাত্রে ভরপুর। সত্যি করে বলতে, খাবারের ঠেলায় সবার ঠিকমতো বসার জায়গায়ও হচ্ছিল না!
এত খাবার দেখে আমার সঙ্গে পিয়ালও বিস্ময় প্রকাশ করে। গুনে দেখি প্রায় ২০ পদ। একটু একটু করে স্বাদ নেওয়াও কঠিন! আমি এবং পিয়াল দুজনেই আবার সে রকম ভোজনরসিক না। একে একে যখন খাবারের পাত্রের মোড়ক সরানো শুরু হলো, তখন আরেক দফা বিস্ময়। লোভ সামলানো কঠিন। শেখের বাড়ির খাবার বলে কথা! এলাহী কাণ্ড। খাবারের তালিকায় ছিল মোশন কারি, মোশন কাবাব, মোশন টিক্কা, স্যামন ফিশ ফ্রাই, সেহেরি ফিশ ফ্রাই, মুরগির রোস্ট, চিকেন বিরিয়ানি, চিকেন কারি, চিকেন কাবাব, গরুর মাংসের কারি, রুই ফিশ কারি, প্রন ফিশ কারি, মাছের গ্রিল, সাদা ভাত, ফ্রায়েড রাইস, মোশন বিরিয়ানি, আরবি সালাদ, অ্যাভোকাডো জুস, মিষ্টি, কেক। শুরু হলো ভোজনপর্ব। কিন্তু আমি আর পিয়াল শুরুতেই আউট। অনেক খাবারের স্বাদই নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে যে কয়টি খাবার খেয়েছিলাম স্বাদ ছিল অসাধারণ। মুখে লেগে থাকার মতো।



