পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিতে প্রকৃতিকন্যা সিলেটের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে জেলার প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। ঈদের পরদিন (২২ মার্চ) থেকে জল-পাথরে একাকার হয়ে, সবুজ টিলা, চা-বাগান ও জলাবনের কাছাকাছি গিয়ে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভ্রমণপ্রেমীরা। সাদাপাথর, জাফলং জিরো পয়েন্ট, লাক্কাতুড়া চা-বাগান, শ্রীপুর লেক, রাংপানি, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, উৎমাছড়াসহ সিলেটের সবকটি পর্যটন স্পটে ছুটছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
সিলেট নগরীর কাছাকাছি ও যোগাযোগের সুব্যবস্থা থাকায় জল-পাথরের দেশখ্যাত সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে থাকে। সঙ্গে প্রকৃতিকন্যা জাফলং, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টও পর্যটকদের চাহিদার শীর্ষে আছে। এ ছাড়া শাহজালাল (রা.) ও শাহপরান (রা.) এর মাজারও পর্যটকদের পছন্দের জায়গা।
একই সঙ্গে নগরীর আশপাশের চা-বাগান এলাকাগুলোতেও ছিল উপচেপড়া ভিড়। লাক্কাতুড়া ও মালনিছড়া চা-বাগানে ঈদের দিন থেকেই শুরু হয় স্থানীয় দর্শনার্থীদের পদচারণা। আর সিলেটের বাইরে থেকে আসা পর্যটকরা বিভিন্ন উপজেলার পর্যটন স্পট ঘুরে বিকেলে সবুজ চা-বাগানে এসে ভ্রমণ শেষ করেন।
এদিকে পর্যটকদের এই ব্যাপক আগমনে সিলেটে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে ফিরে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য। বিশেষ করে নৌকার মাঝি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী, ফটোগ্রাফার, পর্যটন এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পড়েছে।
সাদাপাথরের নৌকার মাঝি সাহাব উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদের আগে শুক্র ও শনিবার কিছু পর্যটক আসতেন। তাই আমাদের আয় একেবারেই কম ছিল। তবে এবারের ঈদের ছুটিতে অনেক পর্যটক এসেছেন। পর্যটক বাড়ায় আমাদের আয় বেড়েছে। এবার নির্বাচনের পরে দেশ একটু শান্ত হয়েছে। তাই মানুষজন ভয়-ডর ছাড়া ঘুরতে আসছেন।’
এখনো বর্ষাকাল শুরু হয়নি। তাই জল-পাথরের খেলা দেখতে ও ঠাণ্ডা জলে গাঁ ভেজাতে পর্যটকদের কিছু দূর হেঁটে যেতে হয়। তবে এই হাঁটার ক্লান্তি দূর হয়ে যায় পাথর বেয়ে নেমে আসা জলের স্রোত ধারায় গাঁ এলিয়ে। ছেলে-বুড়ো সবাই নিজেদের মতো করে আনন্দ-উল্লাস-হৈচৈ করেন প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে। আর এত সুন্দর প্রকৃতির কাছে আসার স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তোলা, ভিডিও করাতো আছেই।
সাদাপাথর, জাফলংসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ছবি তোলার জন্যও আছে ভালো ব্যবস্থা। এসব এলাকার পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ফটোগ্রাফি সোসাইটি। এসব সংগঠনে আছেন শতাধিক ফটোগ্রাফার। যারা নির্দিষ্ট ফি এর বিনিময়ে পর্যটকদের ছবি তোলে দেন।
কোম্পানীগঞ্জ ফটোগ্রাফি সোসাইটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আনোয়ার হোসেন সুমন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদ-উৎসবের ছুটিতেই মূলত পর্যটকরা সাদাপাথর আসেন। পর্যটক আসলে সবার ব্যবসা ভালো হয়। অনেক দিন পর সাদাপাথরে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। এজন্য সবাই অনেক খুশি।’
জাফলং ইন হোটেলের ম্যানেজার আব্দুল মুকিত জায়গিরদার জনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের হোটেলের সব রুম বুকিং হয়ে গিয়েছিল ঈদের আগের দিনই। অনেক পর্যটককে আমরা ফিরিয়ে দিয়েছি রুম বুকিং থাকার কারণে।’
জাফলং বল্লাঘাট পর্যটনকেন্দ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি হোসেন মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘পর্যটনকেন্দ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসার সিজন হলো ঈদ। দুই ঈদে আমরা পর্যটকদের বরণের জন্য প্রস্তুতি নেই। এবারও ঈদের ছুটিতে প্রচুর পর্যটক জাফলংয়ে বেড়াতে এসেছেন। তাই আমাদের হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ স্থানীয় সব ব্যবসায়ীদের মধ্যে কর্মচঞ্চলতা এসেছে। আমাদের আতিথেয়তায় পর্যটকরা খুশি হলে আমরাও খুশি।’
সিলেট নগরীর পানসী রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘উৎসব বা সরকারি ছুটিতে সিলেটে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ে। তবে এবার পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়। আমাদের স্টাফরা অতিথিদের খাবার টেবিল ম্যানেজ করে দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। নির্বাচন-পরবর্তী দেশ এখন অনেকটা স্থিতিশীল। দেশের পরিস্থিতি এরকম স্থিতিশীল থাকলে সারা বছরই পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে সিলেট।’
এসজি/



