বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের। ফের দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে কোম্পানিটির সবচেয়ে সমালোচিত মডেলের বিমান বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স। যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড্ডয়নের সময় আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ উড়োজাহাজের টায়ারে আগুন ধরে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ফ্লাইটটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং যাত্রীদের জরুরি স্লাইড ব্যবহার করে বের করে আনা হয়।
স্থানীয় সময় শনিবার (২৬ জুলাই) বেলা পৌনে ৩টায় এ ঘটনা ঘটে। ফ্লাইট ৩০২৩ ডেনভার থেকে ১৭৩ যাত্রী ও ছয়জন ক্রুসহ মায়ামির উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। রানওয়েতে ট্যাক্সি করার সময় উড়োজাহাজটির ল্যান্ডিং গিয়ারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে বাম পাশের পেছনের অংশে ধোঁয়া ও আগুন দেখা যায়।
ঘটনার পরপরই বিমানের যাত্রীরা আতঙ্কে জরুরি নির্গমন স্লাইড দিয়ে বেরিয়ে যান। অনেককে হাতব্যাগ হাতে টারমাকে দৌড়াতে দেখা গেছে। এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে। ফুটেজে বিমানের নিচ থেকে ঘন কালো ধোঁয়া ও পরে আগুন দেখা যায়। পরে মিনিটখানেকের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
আমেরিকান এয়ারলাইন্স এক বিবৃতিতে জানায়, উড্ডয়নের ঠিক আগমুহূর্তে ল্যান্ডিং গিয়ারের এক টায়ারে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়। বলা হয়, সব যাত্রী ও ক্রু নিরাপদে বিমান থেকে নেমেছেন। বিমানটিতে থাকা ১৭৩ যাত্রী ও ছয়জন ক্রু সদস্যকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ছয়জন যাত্রী সামান্য আহত হয়েছেন। আমেরিকান এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, সমস্যাটি ছিল টায়ারজনিত। বিকল্প একটি উড়োজাহাজে যাত্রীদের মায়ামি পাঠানো হয় একই দিনেই।
বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ উড়োজাহাজ। ছবি: সংগৃহীত
উল্লেখ্য, এটি ২০২৫ সালে ডেনভার বিমানবন্দরে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজে আগুন লাগার দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে মার্চ মাসে আরেকটি বোয়িং ৭৩৭-এর ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়, তবে তখন যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। পরপর এমন ঘটনার ফলে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যদিও এখনো দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সংযোগ প্রমাণিত হয়নি।
এর আগে পরপর দুই বছর বড় দুটি দুর্ঘটনার শিকার হয় বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের বিমানটি। ২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়ার বেসরকারি বিমান সংস্থা লায়ন এয়ারের ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের ফ্লাইট ৬১০ জাকার্তা থেকে উড্ডয়নের পর জাভা সাগরে বিধ্বস্ত হয়। এতে ১৮৯ জন যাত্রী ও ক্রুর সবাই নিহত হন।
এর পরের বছর ২০১৯ সালে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের একই মডেলের একটি বিমান আদ্দিস আবাবা থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর বিধ্বস্ত হয়। এতে বিমানের ১৫৭ যাত্রী ও ক্রুরা সবাই নিহত হন। এটি ছিল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনা, যার ফলে বিশ্বজুড়ে এ মডেলের বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তারপর দীর্ঘ তদন্ত, সফটওয়্যার আপডেট এবং পাইলট ট্রেনিংয়ের পর অনেক দেশ আবার বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স চালাতে দেয় এবং ২০২২ সাল থেকে এই মডেলের বিমান যাত্রীসেবা দিতে শুরু করে।
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ায় বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের একটি বিমান অবতরণ করার সময় ল্যান্ডিং গিয়ারের ত্রুটির কারণে রানওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে দেয়ালে আঘাত করে এবং এতে বিস্ফোরণে বিমানে থাকা ১৮১ জনের মধ্যে ১৭৯ জন মারা যায়।
অতিসম্প্রতি ভারতের আহমেদাবাদে অত্যাধুনিক মডেলের বিমান বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড্ডয়নের পরপরই বিধ্বস্ত হয় এবং একজন ছাড়া ওই বিমানে থাকা ২৪২ যাত্রী ও ক্রুর সবাই মারা যায়।
তাছাড়াও, সম্প্রতি যেসব দেশে ছোটখাটো বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে, সব ক্ষেত্রেই বোয়িংয়ের নাম উঠে এসেছে। ঘন ঘন বিমান দুর্ঘটনায় এখন বোয়িংয়ের নির্মাণমান, নিরাপত্তা ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। সেদিক থেকে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠন ‘এয়ারবাস’ এর কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায় নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেক মন্তব্য থেকে দেখা যায় অনেকেই বোয়িং বিমানে না চড়ার কথা বলছেন।
যদিও আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সংস্থা বলছে পরিস্থিতি এখনো এমন হয় নি যে বোয়িংকে ভ্রমণের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। প্রতিদিন যে হারে বিমান চলাচল করে সে তুলনায় দুর্ঘটনার হার খুবই নগণ্য। সূত্র: দি ইকোনোমিক টাইমস
মাহফুজ/