সম্প্রতি ইসরায়েলের একটি অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার ডেটাবেস ফাঁস হয়েছে এবং এতে দাবি করা হয়েছে গাজায় ইসরায়েলের বর্বরতায় নিহতদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক, যাদের হামাস কিংবা অন্য সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই। ইসরায়েল দাবি করে আসছে, তাদের লক্ষ্য হামাস যোদ্ধারা, বেসামরিক মানুষ নয়। কিন্তু তাদেরই গোয়েন্দা সংস্থার ফাঁস হওয়া সামরিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। এ প্রতিবেদনে হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) যোদ্ধাদের মৃত্যুর হিসাবও রাখা হয়েছে।
সেই ডেটাবেস অনুযায়ী, গত মে মাস পর্যন্ত ইসরায়েল গাজায় প্রায় ৮,৯০০ যোদ্ধাকে হত্যা করেছে বলে অনুমান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১,৫৭০ জনের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে ‘সম্ভবত নিহত’ হিসেবে। ডেটাবেস আরও বলছে, গাজায় মোট সক্রিয় যোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৪৭ হাজার ৬৫৩ জন, তাদের মধ্যে ৩৪ হাজার ৯৭৩ জন হামাসের এবং ১২ হাজার ৭০২ জন পিআইজের।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২২ মাসের অভিযানে ইসরায়েল অন্তত ৬২ হাজার ৬৮৬ জনকে হত্যা করেছে এবং আহত করেছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫১ জনকে। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ।
প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। দ্য ল্যানসেট মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত একটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ৯ মাসে নিহতের সংখ্যা ঘোষিত সংখ্যার তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি হতে পারে। অনেক লাশ বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পুড়ে যায়, দখলকৃত এলাকায় পড়ে থাকে বা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় যেখানে উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারেন না। ফলে এসব লাশ হিসেবের মধ্যেও আসে না।
এদিকে নেতানিয়াহুর কট্টর-ডানপন্থি জোটের কয়েকজন সদস্য প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের জীবনের প্রতি কোনো গুরুত্ব দেখাননি। গত মাসে ইসরায়েলি ঐতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রী আমিখাই এলিয়াহু বলেন, সরকার দ্রুত গাজাকে মুছে ফেলছে, আর আমরা এই অশুভ শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করছি। গোটা গাজা হবে ইহুদিদের। সম্প্রতি ইসরায়েলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধান আহারন হালিভার ফাঁস হওয়া অডিওতে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক নিহত ইসরায়েলির জন্য ৫০ জন ফিলিস্তিনির প্রাণহানি ঘটতে হবে। গাজায় ৫০ হাজার মানুষের প্রাণহানি অপরিহার্য ছিল।’
গবেষণা প্রতিষ্ঠান উপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের গবেষক থেরেস পেটারসন বলেছেন, নিহতদের মধ্যে প্রায় ৮৩ শতাংশ যদি বেসামরিক হয়, তা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। বিশেষ করে এত দীর্ঘসময় ধরে চলা এক যুদ্ধে এ হার নজিরবিহীন। সম্প্রতি আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক মৃত্যুর হার মাত্র তিন শতাংশ। অথচ গাজায় তা ৮৩ শতাংশ।
ইসরায়েলি ম্যাগাজিন ‘‘+972’’ এর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহতদের ৮৩ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক যাদের হামাস কিংবা অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই। ছবি: সংগৃহীত
অনাহারে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮৯
গাজা উপত্যকায় খাদ্যসংকটের কারণে সৃষ্ট অনাহারে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৯ জনে, এর মধ্যে রয়েছে ১১৫ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় অনাহারে আরও ৮ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে এক শিশু। এদিকে জাতিসংঘের পর গাজায় দুর্ভিক্ষের ঘোষণা দিয়েছে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (IPC)।
সংস্থাটি অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে দাবি করেছে গাজার জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫ লাখ ১৪ হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষের মধ্যে রয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। মেডিকেল এইড প্যালেস্টাইন জানায়, গাজায় মেডিকেল কর্মীদের অবস্থাও দিন দিন অবনতি হচ্ছে। অনেক স্বাস্থ্যকর্মী খাদ্যের অভাবে বার বার অজ্ঞান হচ্ছেন। তাদের শরীর চালানোর মতো ন্যূনতম ক্যালরিও তারা গ্রহণ করতে পারছেন না।
ত্রাণ খুঁজতে গিয়ে নিহত আরও সাতজন
এদিকে রবিবার সকাল থেকে গাজাজুড়ে অন্তত ১৬ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। নিহতদের মধ্যে অন্তত সাতজন ত্রাণপ্রত্যাশী ছিলেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত GHF খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে খাবারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তখনই তাদের লক্ষ্য করে গুলি করে ইসরায়েলি বাহিনী।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৪ জন নিহত ও ২৭৮ জন আহত ফিলিস্তিনির দেহ আনা হয়েছে। মে মাসের শেষে GHF স্থাপনের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ত্রাণপ্রত্যাশীর মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,০৯৫ জনে, আহত ১৫,৪৩১-এর বেশি। সূত্র: আল-জাজিরা