অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকত বন্ডি বিচে ভয়াবহ বন্দুক হামলার সময় এক আততায়ীর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সাহসী ব্যক্তি হিসেবে সামনে এসেছেন আহমেদ আল আহমেদ। শরণার্থী পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি দুই কন্যার বাবা। তার অসীম সাহসিকতার জন্য তাকে ‘বাস্তব জীবনের নায়ক’ আখ্যা দিয়েছেন নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিনস।
গতকাল রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) বন্ডি বিচে ইহুদিদের একটি সমাবেশ ও আশপাশের সৈকত এলাকায় হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। হামলাকারীরা ছিলেন বাবা-ছেলে। এ সময় ৪৩ বছর বয়সী আহমেদ আল আহমেদ নিজের জীবন বাজি রেখে এক বন্দুকধারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তার হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নাটকীয় ভিডিওতে দেখা যায়, একটি গাড়ির আড়ালে অবস্থান নিয়ে থাকা আহমেদ হঠাৎ গুলিবর্ষণ করা এক হামলাকারীর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সাইরেনের শব্দ ও গুলির আওয়াজের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড দু’জনের ধস্তাধস্তি চলে। শেষ পর্যন্ত হামলাকারীর হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হন আহমেদ। পরে তিনি সেই অস্ত্র তাক করলে হামলাকারী পিছু হটে।
হামলার সময় অন্য এক বন্দুকধারীর গুলিতে আহমেদ নিজেও আহত হন। তার কাঁধে একাধিক গুলি লাগে এবং কয়েকটি গুলি এখনো শরীরের ভেতরে রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবিসি।
সোমবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহমেদ আল আহমেদের সঙ্গে দেখা করেন নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিনস। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে মিনস লেখেন, “আহমেদ একজন বাস্তব জীবনের নায়ক। গত রাতে অসাধারণ সাহসিকতার সঙ্গে তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক সন্ত্রাসীর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেন। এতে নিঃসন্দেহে অসংখ্য মানুষের প্রাণ বেঁচেছে।”
তিনি আরও বলেন, “এখনই তার সঙ্গে সময় কাটাতে পারা এবং নিউ সাউথ ওয়েলসের মানুষের কৃতজ্ঞতা পৌঁছে দিতে পারা আমার জন্য সম্মানের।”
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের নেতৃত্বে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কও আহমেদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “এই হামলার বিরুদ্ধে সব অস্ট্রেলিয়ান একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে—পুলিশ, জরুরি সেবাকর্মীরা এবং এমনকি আহমেদ আল আহমেদের মতো একজন সাধারণ নাগরিকও, যিনি নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে হামলাকারীদের মোকাবিলা করেছেন।”
আহমেদের পরিবার জানিয়েছে, তিনি দুই কন্যার বাবা এবং তাদের বয়স তিন ও ছয় বছর। তার বাবা এবিসিকে বলেন, “সে যখন এই কাজটি করেছে, তখন সে কারও পটভূমি বা পরিচয় ভাবেনি। রাস্তায় যারা মরছিল, তাদের বাঁচানোর কথাই ভেবেছে। সে কোনো জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য করে না। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় একজন নাগরিক আরেকজনের থেকে আলাদা নয়।”
পরিবারের সদস্যরা জানান, আহমেদের বাবা-মা সম্প্রতি সিরিয়া থেকে সিডনিতে এসেছেন। তবে আহমেদ নিজে ২০০৬ সালেই অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন। পরিবারটির সুনির্দিষ্ট নাগরিকত্ব এখনো স্পষ্ট নয়।
সেন্ট জর্জ হাসপাতালের বাইরে ৭ নিউজকে আহমেদের চাচাতো ভাই মুস্তাফা বলেন, “সে ভালো আছে, তবে এখনো অস্ত্রোপচার হয়নি। নিঃসন্দেহে সে একজন নায়ক—কারণ অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে সে নিজের জীবন হারাতেও পারত।”
বন্ডি বিচের এই মর্মান্তিক ঘটনায় আহমেদ আল আহমেদের সাহসিকতা অস্ট্রেলিয়াজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, তার আত্মত্যাগী পদক্ষেপ না থাকলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা
মাাহফুজ/