কবি-লেখকদের কল্পনাশক্তি প্রখর। শব্দে শব্দে তারা ছবি আঁকেন। শব্দগুলো পড়তে পড়তে চোখের সামনে সেসব ছবি ফুটে ওঠে কল্পনায়। কবি নজরুলের মতো কল্পনা করতে ইচ্ছে করে, একজন তরুণী ফুলের বাগানে হেঁটে বেড়াচ্ছে, পরনে তার ফুলছাপা নীল-শাড়ি, খোঁপায় জড়ানো বেলি ফুলের মালা। সে মালা থেকে সুগন্ধে মাতোয়ারা গ্রীষ্মের সকাল অথবা বর্ষার বিকেল। কিংবা এটাও হতে পারে, সেই তরুণী ঝুমবৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বাগান থেকে বেলি ফুল তুলছে মালা গাঁথবে বলে। বেলি ফুল তুলতে তুলতে সেই তরুণীকে দেখে মনে হচ্ছে- ‘হাসতে তুমি দুলিয়ে ডাল,/ গোলাব হয়ে ফুটন্ত গাল!’ সেসব তোলা বেলি ফুলের মালা গেঁথে হয়তো তিনি সন্ধ্যেবেলায় অপেক্ষা করছেন কারও জন্য, জানালা খুলে বসে আছেন কারও জন্য পথ চেয়ে। অবশেষে তিনি এলেন তরুণীটিকে দেখে মনে মনে হয়তো গেয়ে উঠলেন নজরুলসংগীতের কয়েকটা পঙক্তি-
‘তার পুষ্পধনু দোলে শিমুল শাখায়
তার কামনা কাঁপে গো ভোমরা পাখায়,
সে খোঁপাতে বেল-ফুলের মালা জড়ায়
সে কুসমী শাড়ি পরায় নীল-বসনায়
সে আঁধার মনে জ্বালে লাল রোশনাই
সে শুকনো বনে ফাগুন আগুন ধরায়’
বসন্তে যে রাগের শুরু, গ্রীষ্ম-বর্ষায় তা অনুরাগে রূপ নেয়, এরপর আসে মিলনের কাল। বেলি ফুলকে কবি নজরুল তার গান ও কবিতায় বারবার বেল ফুল বলেছেন। নজরুলের গানে বেল ফুলের নাম শুনে একটা সন্দেহ এসেছিল মনে, তাহলে কি তিনি এ ফুল বলতে বেল ফলের ফুলকে বুঝিয়েছেন? কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলাম যে বেল ফুলের সুগন্ধ থাকলেও তাতে তো মালা হয় না। নামে কী যায় আসে? তিনি এ ফুলের যে সৌরভমাখা সরস বর্ণনা দিয়েছেন তাতে সে ফুল ঠাঁই পেয়েছে সুন্দরীদের মাথায় খোঁপার অলংকার হয়ে। প্রাচীনকালে মেয়েদের অঙ্গরাগ বা দেহসজ্জায় ফুলের গুরুত্ব ছিল সবার আগে। একালেও নানাবিধ অলংকারের মধ্যে মেয়েরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বেলি ফুলের গাজরা বা বেলি ফুলের মালা পরেন। এমনকি কবি নজরুল পুরুষ তথা শিবকেও বলেছেন বেলি ফুলকে জটায় ধারণ করতে- ‘ধুতুরা ফুল খুলিয়া ফেলি/ জটাতে পরো চম্পা বেলী/ শ্মশানে নব-জীবন, শিব, জাগিয়ে তোলো\’ এ গানে এসে নজরুলের কাছে শুনি বেল না, বেলি ফুলের কথা।
বেলি, বেলী, বেল। এর নাম যাই হোক, ফুলটি আমাদের খুবই পরিচিত ও আপন। এ দেশের প্রায় বাগানে এ ফুলের গাছ দেখা যায়। বেলি একটি গুল্মজাতীয় গাছ যার কাণ্ড বেশি শক্ত নয়। লতানো প্রকৃতির ডালপালা হলেও তা সাধারণত এক মিটারের বেশি লম্বা হয় না। পাতা গাঢ় সবুজ, চকচকে ও ডিম্বাকার। বেলি ফুল গুচ্ছাকারে জন্মে, রঙে ধবধবে সাদা ও অত্যন্ত মিষ্টি গন্ধযুক্ত। রাতের বেলা ফুটে গাছ চারপাশের পরিবেশ সৌরভময় করে তোলে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ফুল ফোটে অর্থাৎ বসন্ত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুম ধরেই এ ফুল পাওয়া যায়। এর অন্যতম তিনটি জাত হলো- রাই বেলি, মোতিয়া বেলি ও খইয়া বেলি। রাই বেলি ফুল বেলি ফুলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সৌরভে সেরা। ফুল কম ফুটলেও পুষ্পপ্রেমীদের কাছে এ জাতের বেলি ফুলের কদর সবচেয়ে বেশি। ফুল ডাবল অর্থাৎ ফুলের পাপড়ি অন্যান্য বেলির চেয়ে বেশি ও একাধিক স্তরে সেগুলো সাজানো থাকে। অন্যদিকে মোতিয়া বেলির ফুল ডাবল হলেও রাই বেলির চেয়ে আকারে ছোট, কিন্তু খইয়া বেলির চেয়ে বড় ও পাপড়িও বেশি থাকে, সুগন্ধযুক্ত। খইয়া বেলি আকারে সবচেয়ে ছোট হলেও ফোটে অজস্র। ফুল সিংগল বা একহারা, পাপড়ি থাকে এক সারিতে তারার মতো।
সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জঙ্গলে বন বেলি নামে আর এক ধরনের বেলি ফুল দেখেছিলাম, তার ফুলও এক সারি পাপড়িবিশিষ্ট, তারার মতো, পাপড়ি সরু ও লম্বা, সুগন্ধ আছে, গাছটা কিছুটা লতানো স্বভাবের। বেলি ফুলের গাছ ছোট ঝাড়যুক্ত। গাছের ডাল থেকে চারা তৈরি করা যায়। এই বেলি ফুল মালা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। বেলির ইংরেজি নাম Arabian jasmine, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Jasminum sambac ও গোত্র Oleaceae. ইংরেজি নাম অ্যারাবিয়ান জেসমিন হলেও আসলে এটি এসেছে ভুটান ও ভারত থেকে, তাই সে একান্তই আমাদের এ অঞ্চলের ফুল। এ ফুল থেকে সুগন্ধি বা পারফিউম ও সুগন্ধি জেসমিন চা তৈরি হয়। ফিলিপিন্সে এটি জাতীয় ফুলের মর্যাদা পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় ফুল তিনটি, তার একটি হচ্ছে বেলি ফুল।