প্রায় ১১ বছর আগের কথা। বিরল ও দুর্লভ পাখি এবং বন্যপ্রাণীর সন্ধানে এসেছি হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। দুপুরের খাবার সেরে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে ডরমিটরির পেছন দিক দিয়ে ছড়ায় নেমে গেলাম। সেগুনগাছের ফলের থোকায় ফোকাস করে একটিমাত্র টেস্ট ক্লিক করে দ্বিতীয় ক্লিক করতেই শাটার বিকল হয়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও আর ঠিক করতে পারলাম না। যদিও সঙ্গে একটি বিকল্প ক্যামেরা রয়েছে। কিন্তু সেটা দিয়ে স্থির হয়ে বসে থাকা বা ধীরে চলা প্রাণীদের ছবি ভালো তোলা গেলেও দ্রুতগামী ও উড়ন্ত পাখি-প্রাণীর ছবি তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। কাজেই এবারের ট্রিপটাই নষ্ট হয়ে গেল মনে হয়! মনটা একেবারেই খারাপ হয়ে গেল।
পরদিন সকালে ওই বিকল্প ক্যামেরার ওপর ভরসা করেই ছড়ায় নামলাম। প্রায় আড়াই ঘণ্টা বিভিন্ন স্থানে পাখি-প্রাণী খুঁজে বেলা ১০টা ৪৯ মিনিটে শুকনো ছড়ার বালির ওপর দিয়ে ছোট্ট একটি নলাকার প্রাণীকে ধীরগতিতে এঁকেবেঁকে চলে যেতে দেখলাম।
প্রাণীটিকে বেশ কবছর ধরে খুঁজছিলাম। কিন্তু এতবার সাতছড়ি, লাউয়াছড়া ও কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে গিয়েও কোনো দিনই প্রাণীটির দেখা পেলাম না। দ্রুত বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ওর কিছু ছবি তুলে নিলাম। সঙ্গে থাকা সাতছড়ির গাইড প্রসেনজিৎ দেববর্মা একটি সরু শুকনো ডাল প্রাণীটির সামনে আলতো করে ধরতেই সে ওটা বেয়ে খানিকটা উঠে কয়েলের মতো ডালটিকে পেঁচিয়ে ছোবল মারার মতো ভঙ্গি করে থাকল। সাড়ে ১৪ মিনিট প্রাণীটির সঙ্গে সময় কাটিয়ে একটি গাছের ডালে রাখতেই সে ঝোপের ভেতরে চলে গেল। দেহের রং দেখে এটিকে একটি স্ত্রী প্রাণী বলেই মনে হলো।
পরদিন সকালে ছড়ায় হাঁটার সময় আরেকটি একই প্রজাতির প্রাণীর সঙ্গে দেখা হলো। তবে ওর দেহের রং গতকালেরটির থেকে কিছুটা হালকা ও উজ্জ্বল। রং দেখে মনে হলো এটি পুরুষ। ওর বেশ কিছু ছবি তোলার পর প্রসেনজিৎ প্রাণীটিকে আলতো করে সরু ডালে তুলল। আমি ভালোভাবে লক্ষ করলাম প্রাণীটির হার্টবিট বেড়ে গেছে। সে বেশ ভয় পাচ্ছে মনে হলো। অথচ ওর ছবি দেখলে যে কেউ মনে করতে পারে যে প্রাণীটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও বিষাক্ত। ছবিতে প্রাণীটির চেহারা যতটাই ভয়ংকর মনে হোক না কেন, ও যে আসলে একটা ভীতু প্রাণী তার প্রমাণ তো পেলাম। যা হোক, প্রসেনজিৎকে বললাম দ্রুত প্রাণীটিকে ছেড়ে দিতে। বড় একটি পাতার ওপর নামিয়ে দিতেই সে দ্রুত ঝোপের ভেতর হারিয়ে গেল। দুই দিনে একটি নতুন প্রাণীর স্ত্রী-পুরুষের দেখা পেয়ে ও ছবি তুলতে পেরে ক্যামেরা নষ্ট হওয়ার দুঃখ ভুলে গেলাম।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দেখা নলাকার এই প্রাণীটি আর কেউ নয়, এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন একটি নির্বিষ সাপ। নাম তার পাহাড়ি বা নকল বোড়া সাপ। ইংরেজি নাম Mock Viper বা Common Mock Viper। স্যামোডাইনেস্টেস (Psammodynastes) গোত্রের সাপটির বৈজ্ঞানিক নাম Psammodynastes pulverulentus। এরা চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বাংলাদেশ ছাড়াও উত্তর-পূর্ব ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং চীনের কয়েকটি অঞ্চলে দেখা যায়।
এটি ছোট, নলাকার ও মসৃণ আঁশযুক্ত সাপ। সচরাচর দৈর্ঘ্য ৪০ থেকে ৬৫ সেন্টিমিটার। সর্বোচ্চ ৭৭ সেন্টিমিটার হতে পারে। দেহের রঙে বেশ তারতম্য রয়েছে। স্ত্রীগুলো সচরাচর গাঢ় ও পুরুষগুলো হালকা রঙের। দেহের ওপরটা হালকা থেকে গাঢ় বাদামি বা ধূসর ও মাথায় বৈশিষ্ট্যসূচক দ্বিধাবিভক্ত নকশা রয়েছে। হালকা ও গাঢ় বাদামি ডোরা দেহের দৈর্ঘ্য বরাবর চলে গেছে, যা কালো রঙের ছোট ছোট ফোঁটার কারণে মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এই ফোঁটাগুলোর মাঝখানটা সাদা। দেহের নিচটা ফ্যাকাশে, যাতে বাদামি রঙের ফুটকি রয়েছে।
নকল বোড়া সমতল ভূমি ও পাহাড়ি বনাঞ্চলে বাস করে। এরা মূলত স্থলজ প্রাণী। তবে ঝোপজঙ্গল ও গাছে চড়তে পারে এবং গাছের ডাল থেকে পানির ওপর ঝুলে থাকতে দেখা যায়। নিশাচর ও দিবাচর সাপগুলো সচরাচর একাকী বিচরণ করে। এরা অবিষধর বা নির্বিষ সাপ। ভয় পেলে বোড়া সাপের মতো দ্রুত ছোবল মারে ও নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। আর সে কারণেই ভিন্ন গোত্রের সদস্য হয়েও তাদের এই নাম। এদের প্রধান খাদ্য ব্যাঙ, টিকটিকি, ছোট সাপ ইত্যাদি।
সচরাচর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর বংশবৃদ্ধির সময়। স্ত্রী সাপ পরিবেশে ডিম পাড়ে না, বরং নিষিক্ত ডিম্বাণু বা ডিম জরায়ুতে অবস্থান করে। এখানেই ভ্রুণ বৃদ্ধি লাভ করে ও বাচ্চা ফোটে। এরপর বাচ্চগুলো মায়ের জরায়ু থেকে পরিবেশে বেরিয়ে আসে। স্ত্রী সাপ একসঙ্গে ৩ থেকে ১০টি বাচ্চার জন্ম দেয়।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়