২৬ বৈশাখ ১৪৩৩, দুপুরবেলা। সকাল থেকে মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে গাছপালা দেখে বেড়াচ্ছি। পদ্মপুকুর থেকে শুরু করে নানা পথ আর বনজঙ্গল ঘুরে রোদের মধ্যে হাঁসফাঁস লাগছে। একটু ছায়ায় বসে জিরোতে চাই, তেষ্টাও পেয়েছে। ক্যানটিনের পথ ধরলাম। নার্সারির পাশে লতানে ফুলগাছের সুড়ঙ্গ, ওটা পেরিয়ে ক্যানটিনের কাছে যাওয়ার আগেই একটা গাছে বেয়ে ওঠা হাতিলতার ঝোপ দেখছিলাম। হঠাৎ পায়ের কাছে বুনো আগাছাগুলোর দিকে চোখ পড়ল, ছোট্ট কালচে কী যেন দলার মতো মনে হলো, সবুজ পাতার ওপর চকচক করছে। নিচু হয়ে তাকাতেই বুঝতে বাকি রইল না যে, ওটা ময়লা না, একটা মাকড়সা। কী অপরূপ! তার শ্যামরূপ আমাকে মুগ্ধ করে ফেলল।
বসে দুটি ছবি তুলতেই মনে হলো, বাছাধন বোধ হয় আমার উপস্থিতি টের পেয়েছে। পাত্তা না দিয়ে সটকে পড়ল পাতার আড়ালে। কিছুক্ষণ পর দুটি জোড় পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। অপেক্ষা। ৫ মিনিট, ১০ মিনিট, ১১ মিনিটও চলে গেল। কিন্তু বাছাধনের কোনো খবর নেই, পাতার আড়াল থেকে আর বের হলো না। তাই রাগ হলো। পাতা উল্টেই ওকে বের করতে হবে। এই ভেবে জোড়া লাগা পাতা দুটির দুই হাতে ধরে একটু একটু করে সাবধানে আলগা করার চেষ্টা করলাম। পাতা দুটি কেউ যেন আঠা দিয়ে একটির সঙ্গে একটি জোড়া লাগিয়ে দিয়েছে। অদ্ভুত তো! খোলার পর ফক্কা, আমাকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়েছে ওটা। শুধু শুধুই বসে বসে তার আগমনের অপেক্ষা করেছি। পাতার খানিকটা অংশ ভেজা, থুতুর মতো রসযুক্ত, চটচটে আঠাল।
জানি যে, মাকড়সা আছে দুই রকমের। একধরনের মাকড়সা শুধু জাল বোনে, জালের ফাঁদে শিকার আটকে খায়। এদের বলে জাল বুনুনি মাকড়সা। আর একধরনের মাকড়সা আছে যারা ওসব জালটাল বোনে না, বাসাও বাঁধে না, শুধু ঘুরে বেড়ায় আর শিকার দেখলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ও খায়। এ দলের মাকড়সাগুলোকে তাই ভবঘুরে মাকড়সা বলা হয়। লাফারু মাকড়সারা এই ভবঘুরেদের দলে। তবে এ লাফারু মাকড়সাকে দেখলাম বাসা বাঁধতে। সে বাসাও অন্য কোনো মাকড়সার সঙ্গে মেলে না।
বাসায় ফিরে এসে মাকড়সাটাকে চেনার জন্য বসলাম। ঘাঁটাঘাঁটি করে মোটামুটিভাবে ওকে চেনা গেল, ওটা সল্টিসিডি গোত্রের Thiania bhamoensis প্রজাতির মাকড়সা, ইংরেজি নাম Small Jumping spider বা Metallic Blue Jumper, বাংলা নাম ছোট লাফানো মাকড়সা। অন্য নাম হতে পারে তামাটে লাফারু মাকড়সা অথবা ধাতব নীলচে লাফারু মাকড়সা। ওরা লড়াই করে বলে ওদের ফাইটিং স্পাইডার বা লড়াকু মাকড়সাও বলে। এ মাকড়সার প্রজাতিগত নামের শেষাংশ এসেছে মায়ানমারের ভামো নামক একটি স্থানের নাম থেকে।
এ মাকড়সার আবাসস্থল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। মায়ানমার থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত অনেক দেশে এদের দেখা যায়। বাংলাদেশে ২০১৪ সালে মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ও ২০১৬ সালে আগারগাঁওয়ে এ প্রজাতির মাকড়সা দেখা গিয়েছিল বলে জানা গেছে। এ দেশের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে এদের দেখা যায়। এ প্রজাতির মাকড়সারা ঝকঝকে সবুজ-নীল বিশেষ নকশাদার ডোরা দাগযুক্ত, উদর তামাটে ও মাথা কালচে রঙের। স্ত্রীরা বেশি সবুজ, পুরুষরা বেশি নীল। সামনে থেকে দেখলে স্ত্রী মাকড়সার মুখ দেখায় কালো, পুরুষদের মুখ দেখায় সাদা। পূর্ণদৈর্ঘ্য ৫.৯৫ মিলিমিটার। পা কালো ব্যান্ডযুক্ত, শক্ত কাঁটাওয়ালা ও পশমাবৃত। পেট চোঙ্গার মতো। পিঠের ওপর সাদা আঁশের মতো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দাগ।
এ প্রজাতির মাকড়সা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ডাইকন লি ও সাথিদের একটা গবেষণাপত্র পেলাম। তাতে দেখলাম, গবেষকরা দাবি করেছেন যে, তারাই প্রথম এ মাকড়সার বাসা তৈরি ও লড়াই করার বিষয়টা বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাতে তাদের মনে হয়েছে যে, সল্টিসিডি গোত্রের মাকড়সারা সাধারণত কোনো বাসা বানায় না, ব্যতিক্রম হলো এ মাকড়সা। এই মাকড়সারা একজোড়া চওড়া সবুজ পাতা একসঙ্গে মুখোমুখি পট্টির মতো জোড়া বেঁধে তার আশ্রয়স্থল তৈরি করে, যা লাফারু মাকড়সাদের স্বভাববিরুদ্ধ। সে বাসার ওইটুকু চিপার মধ্যেই তারা আশ্রয় নেয়, দেহকে তখন ছোট করে ফেলে, সেখানেই খোলস বদলায় ও ডিম পাড়ে। পাতা দুটি যুক্ত করতে একটি রিভেট তৈরির জন্য একটি মাকড়সার প্রায় আধা ঘণ্টা সময় লাগে। বাসাগুলোয় স্ত্রী, পুরুষ ও বাচ্চা মাকড়সারা মিলেমিশে থাকে। বাসা তৈরির জন্য এরা স্পাইডার লিলি ও পাতাবাহারজাতীয় গাছের পাতাকে বেশি পছন্দ করে। সাদা উপবৃত্তাকার ডিমের থলিগুলো মাকড়ার দেহের আকারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বড় হয়। ওগুলো বাসার ভেতরেই থাকে। গবেষকরা ওদের আচার-আচরণ দেখার জন্য গবেষণাগারে পুরুষদের মধ্যে জোড়ায় জোড়ায় লড়াইয়ের আয়োজন করেছিলেন। সে লড়াইয়ে ওদের ১২ রকমের আচরণ তারা লক্ষ্য করেছিলেন।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ