পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে কোনো কোনো প্রজাতি নিয়মিত আমাদের দেশে আসে। আবার কোনোটি আসে অনিয়মিত। পাখিরা তাদের জীবনের প্রয়োজনে পরিযায়ী হয়। তাদের এই পরিযানের গন্তব্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। আমারে দেশে শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত ও বর্ষার সময় পরিযায়ী পাখিরা আসে।
শীতের সময় বিশেষ করে জলাচর প্রজাতির পাখিরা আসে। আবার অনেক প্রজাতির পাখি এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পথে মাঝখানে কোথাও যাত্রাবিরতি করে। এই বিরতি কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে। পাখিরা যাত্রাবিরতি দেয় সাধারণত খাবার ও বিশ্রামের জন্য। তবে বড় ধরনের ঝড়ের আশঙ্কা থাকলে পাখিরা বিরতি দেয় নিরাপদ জায়গায়। যেসব পাখি কিছুদিনের জন্য আমারে দেশে যাত্রাবিরতি দেয় তাদের আমরা পান্থ পরিযায়ী পাখি বা প্যাসেজ মাইগ্রেন্ট বার্ড বলে থাকি। বেগুনি-পিঠ শালিক আমাদের দেশে অনিয়মিত বা বিরল পান্থ পরিযায়ী পাখি হতে পারে।
বেগুনি-পিঠ শালিক বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কয়েকবার দেখা গেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া এলাকায় প্রথমবার একটি বেগুনি-পিঠ শালিক দেখা গিয়েছিল। তার পরে ২০১০ সালের ৩১ অক্টোবর মধুপুরের শালবনে এ পাখি দেখা গেছে। ২০১৫ সালে ১৮ এপ্রিল ঢাকার জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে প্রথম বেগুনি-পিঠশালিক আমি দেখতে পাই। দুটি ঝাঁকে ৩৫টি পাখি গুনে ছিলাম। পাখিগুলো ওড়ার গতিপথের দিক লক্ষ করে প্রায় ১৫ মিনিট খোঁজ করার পর একটি বড় রেইনট্রি গাছের উঁচু ডালে ছোট ছোট পাঁচ-সাতটি দল খুঁজে পাই। পাখিগুলো ডালে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। কিছু পাখি শরীরের পালক খুঁটছিল। কয়েকটি নিচু গলায় সুরেলা স্বরে ডাকাডাকি করছিল। কিছুক্ষণ পর কয়েকটি পাখি রেইনট্রি গাছের নিচে অপেক্ষাকৃত মাঝারি উঁচু শেওড়া গাছে পাকা ফল খেতে এল।
কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা গেল, এ পাখিরা গাছের ওপরে থাকতে পছন্দ করে। নিজেদের একটু আড়াল করে রাখতে ভালোবাসে। তবে খাওয়ার প্রয়োজনে ছোট গাছে আসে। ওড়ার সময় ছোট থেকে মাঝারি ঝাঁকে উড়ে বেড়ায়। খুবই দ্রুতগতিতে ওড়ে। খাবারের জন্য এদের মাটিতে নামতে দেখা যায়নি। অন্য প্রজাতির শালিক বিশেষ করে গো শালিক, ভাত শালিক, ঝুঁটি শালিক ও খয়রালেজ কাঠশালিকের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় না। তবে এদের চালচলনের অনেক বৈশিষ্ট্যে খয়রালেজ কাঠশালিকের সঙ্গে মিল আছে। এরা সাধারণত গাছের পাকা ফল খেতে ভালোবাসে। এরা পাকা ফলের গাছে প্রায়ই আসে। সাধারণত সকালের দিকে খাবার খায়। দুপুরে ভরা পাতার গাছের মগডালে বিশ্রাম নেয়।
পুরুষ পাখি ওপরে গাঢ় পালক থাকে, নিচে সাদা। ডানা বেগুনি, সবুজ এবং কমলা রঙের। মেয়ে পাখির সাধারণ আকৃতি একই রকম, ওপরে বাদামি, নিচে ধূসর। এরা বন এবং তৃণভূমির মধ্যে খোলা জায়গা পছন্দ করে। তবে খোলা কৃষিখেতে খাবার খেতে যায়। প্রায়শই বিশাল ঝাঁকে জড়ো হয়। এরা বাসা বাঁধে মে-জুন মাসে। বাংলাশে বাদে মঙ্গোলিয়া, চীন, কম্বোডিয়া, ভারত, ইরান, জাপান, লাওস, নরওয়ে, মায়ানমার, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশে এ পাখি দেখা যায়।
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার