চারদিকে চা-বাগান ঘেরা একটি উঁচু পাহাড়। শ্রীমঙ্গলের বিলাসছড়া অরণ্যসংলগ্ন এম আর খান চা-বাগানের এই পাহাড়ে রয়েছে নানান সব বুনো গাছপালা। ছোট ছোট ঝোপঝাড়ও আছে। সময়টা ২০০৮ সালের মার্চ মাস। পাখিদের কলকাকলিতে পুরো এলাকায় বসন্ত বিরাজ করছে। হাঁড়িচাচা ডেকে ডেকে বৃক্ষ শাখায় শাখায় পায়চারি করছে। দুটি সবুজ মালকোয়া খাবার খুঁজছে আমডালে। বেনেবউ, দোয়েল, সিপাহি বুলবুলি, ছোট ফিঙ্গে, ভাতশালিকদের আনাগোনাও ব্যাপক। পাহাড়ি টিলাটির নানান প্রজাতির গাছপালার মধ্যে আছে একটি আমলকীগাছ। সে গাছটির শাখায় আছে ফুটবল আকৃতির একটি গেছো পিঁপড়ার বাসা। দুটি খয়রা বাদামি বর্ণের পাখি কথা বলাবলি করছে ফুটবল আকৃতির পিঁপড়ার বাসার ওপরে বসে।
কালো রঙের ঠোঁটের এ পাখির নাম হলো খয়রা কাঠকুড়ালি। খুব সহজে তাদের দর্শন পাওয়া যায় না। হঠাৎ পুরুষ পাখিটা উড়ে গেল পাহাড়ের ঢালের একটি ঝোপে। নারী পাখিটি ঢুকে বসে রইল পিঁপড়ার বাসায়। পাখিটির কালো ঠেঁটিটি শুধু দেখা যাচ্ছিল। এক ঘণ্টা চুপচাপ বসেছিলাম সম্পূর্ণ পাখিটির ছবি তোলার জন্য, কিন্তু সে পিঁপড়ার বাসা থেকে বেরই হলো না। তাই বাসার মধ্যে থাকা অবস্থার ছবি তুলে ক্ষান্ত দিতে হলো। এরা খুব লাজুকপ্রকৃতির, সেটা ওদের হাবভাব দেখে বোঝা গেল। বড় আকৃতির কালো গেছো পিঁপড়ার বাসায় গর্ত করে বাসা বানিয়েছে। গ্রামগাঁয়ে এই পিঁপড়ার বাসাকে পাখির বাসা ভেবেছি ছেলেবেলায়। এই প্রথমবার দেখা পেলাম পিঁপড়ার বাসায় আবাস গড়েছে খয়রা কাঠকুড়ালি।
খয়রা কাঠকুড়ালির পালক লালচে বাদামি। সারা দেহে কালচে পাথালির দাগ রয়েছে। পুরুষটির চোখের পাশে সিঁদুর লাল ছোপ আছে, নারীর নেই। আমাদের দেশের পাহাড়ি বন, চা-বাগানের কাছের আলোময় স্থানে এদের কদাচিৎ দেখা যায়। এরা বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি। এরা মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করে। আর্দ্র পাতাঝরা বন, শালবন, চিরসবুজ বন এবং গ্রামীণ বনে বাস করে। ঢাকা শহরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা যায়।
এ পাখির প্রধান খাদ্য গেছো পিঁপড়া (Cremastogaster)। বিরাটাকার বাসা থেকে পিঁপড়া খায়। বসন্তে আবার ওই পিঁপড়ার বাসায় গর্ত খুঁড়ে তাতে নিজেদের বাসা বানায়। খয়রা কাঠকুড়ালির বৈজ্ঞানিক নাম Celeus brachyurus। মজার ব্যাপার হলো, খয়রা কাঠকুড়ালি ও গেছো পিঁপড়াদের মধ্যে রয়েছে একধরনের অভিনব সম্পর্ক। পৃথিবীতে নানান ধরনের জীবকুলের মধ্যে মিথোজীবিতামূলক সম্পর্ক দেখা যায়। এ ধরনের সম্পর্কের ফলে উভয় জীবই একে অপরের দ্বারা উপকৃত হয়। কিন্তু খয়রা কাঠকুড়ালি ও কালো গেছো পিঁপড়ার বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে মজার ও আশ্চর্যের ব্যাপার বলেছেন। খয়রা কাঠকুড়ালির প্রধান খাদ্য হলো এই পিঁপড়া। অপরদিকে গেছো পিঁপড়াদের অন্যতম একটি খাদ্য হলো পাখির ডিম। বসন্তে যখন খয়রা কাঠকুড়ালি ডিম পাড়ার জন্য ফুটবল আকৃতির গেছো পিঁপড়ার বাসার এক প্রান্তে ছয় ইঞ্চির মতো জায়গা গর্ত করে বাসা বানায়, তখন গেছো পিঁপড়ার অনেক লার্ভাও ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তখনো এ পাখিকে গেছো পিঁপড়ারা আক্রমণ করে না। এমনকি কখনো ডিম ও বাচ্চাদেরও আক্রমণ করে না। কেন করে না সে রহস্য জানা যায়নি। কিন্তু এ সময়ে খয়রা কাঠকুড়ালি পিঁপড়াদের খায় না। অভিনব এ ব্যাপারটি নিয়ে বিজ্ঞানীরাও কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তবে বাসা বাঁধা, খাদ্য ও প্রজাতি রক্ষার জন্য খয়রা কাঠকুড়ালি গেছো পিঁপড়াদের ওপর নির্ভরশীল।
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার