সম্ভবত কয়েক বছর আগে কোনো একটি নাটকের সংলাপ ছিল ‘হচ্ছেটা কী?’ আসলেই হচ্ছেটা কী? আমরা কী দেখছি? অস্থির হয়ে যাচ্ছে চারপাশ। কী যেন শুরু হয়েছে, মানুষের মধ্যে ভয়াবহ এক উন্মাদনা, জিঘাংসা, পশুর আচরণ লক্ষ করছি আমরা? একের পর এক নির্মম, নিষ্ঠুর ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেই চলেছে। ছেলে মাকে, মেয়ে বাবাকে, বাবা সন্তানকে, ভাই ভাইকে, স্বামী স্ত্রীকে আর স্ত্রী স্বামীকে খুন করছে। রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে পারিবারিক সম্পর্কের পবিত্র বন্ধন। কেন? মাগুড়ার নিভৃত গ্রামের অবুঝ শিশু আছিয়া, নরপশুরা নির্মমভাবে তাকে ধর্ষণ করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল। চরম বেদনায় হাসপাতালে কাতরাতে কাতরাতে শেষ হয়ে গেল তার ক্ষণিকের জীবন। জীবন কি এতই ঠুনকো এবং সস্তা হয়ে গেছে? সারা দেশে এরকম অসংখ্য ধর্ষণ হচ্ছে। বিশেষ করে আছিয়ার বয়সী অসংখ্য শিশুকে ধর্ষণ করে আবার অনেককে মেরেও ফেলছে। বীভৎস ও ভয়াবহ শব্দ দুটিই এখানে খাটে। যারা ধর্ষিত হচ্ছে, রাস্তাঘাটে, অফিস-আদালতে, বাড়িঘরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং অমানসিক নির্যাতনে মারা যাচ্ছে- এটি কি কাম্য? অথচ এ ঘটনাগুলো অহরহ ঘটছে। একজন মানুষের মৃত্যু যেন পানিভাতের মতো হয়ে গেছে। একজনের জন্য কান্না থামার আগেই ঘটে যাচ্ছে আরেকটি ঘটনা। প্রিয়জন হারিয়ে যে পথ চলতে হয়, তা শুধু একা হয় না- তা হয় শোকের ভারে পাথরের মতো কঠিন।
বর্তমান সময়ে মানুষ যেন নিজের রাগ আর ইচ্ছার দাস হয়ে উঠেছে। মন চাইছে তো কারও গায়ে হাত তুলছে, কাউকে নির্যাতন করছে, কিছু ভাঙছে, কিছু ধ্বংস করছে। যখন যা ইচ্ছা করছে, তাই করছে। কিন্তু একবারও কি ভাবছেন- যাকে আঘাত করছেন, তিনি হয়তো আপনার জন্মদাতা বাবা অথবা গর্ভধারিণী মা? তিনি হতে পারেন আপনার ভাই, আপনার মেয়ের বয়সী কেউ, আপনার পড়শি, সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি কিংবা দেশের একজন কৃতী সন্তান। এমনকি তিনি যদি হন একজন রিকশাচালক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা সাধারণ চাকরিজীবী। তবু কি তাকে এভাবে নিঃসংকোচে আঘাত করার অধিকার আপনার আছে? কোথাও কোথাও তো তাকে একেবারে শেষ করে দিচ্ছেন- এ কেমন মানুষ হওয়া?
মানবিক মূল্যবোধ তবে কি বিদায় নিল সমাজ থেকে? এই বাংলাদেশ কি আমাদের কাম্য? সবাই জানি, নৈরাজ্য কখনো শান্তি আনে না, স্বস্তি দেয় না সমাজে। আমরা এও জানি, পুকুরে ঢিল দিলে সেখান থেকে উত্থিত ঢেউ ধীরে ধীরে পাড়ের সবখানেই খাবি খায়। এও জানি, পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে, সেই আগুনের তাপ বা উত্তাপ আপনারও লাগে। তাই কোনো হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ বা অস্থিরতা যেকোনো সুস্থ সমাজকে নষ্ট করে। আমরা একটি উন্নয়নশীল দেশ, সেজন্য আমাদের এগোতে হবে সুন্দর করে, শান্তিপূর্ণভাবে এবং কাজের মাধ্যমে। হত্যা-ধ্বংস, নৈরাজ্য সেই অভিযাত্রাকে পিছিয়ে দেয়।
এসব অস্থিরতা, নৈরাজ্য, হত্যা, মারামারিকে ইদানীং যেটিকে হচ্ছে ‘মব সন্ত্রাস’। এসব ঘটনা কি শুধুই অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ঘটছে? নাকি এর পেছনে আছে আরও গভীর কোনো সামাজিক, নৈতিক বা মানসিক অবক্ষয়ের কারণ? আমাদের প্রশ্ন করা দরকার- এই হিংসা, অমানবিকতা আসলে কোথা থেকে আসছে? নাকি পরস্পরের প্রতি প্রেমহীনতার কারণে, হচ্ছে? এসব ভাববার সময় হয়েছে। কারণ, আপনার পছন্দ না আপনি একজন শিক্ষককে পিটাচ্ছেন, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে পিটাচ্ছেন, একজন যুবককে, যে ব্যবসা করছে, তার সঙ্গে মব করে তাকে তুলে দিচ্ছেন, একজন নারীর চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে ফেলে দিয়ে তারপর লাথি মারছেন, একজন বাসযাত্রী ছাত্রীকে ধর্ষণ করছেন, একজন রিকশাওয়ালার রিকশাটি গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন, একটি চায়ের দোকান ভেঙে দিচ্ছেন, এতে কি হচ্ছে? এতে এককথায় সুন্দর সমাজ গঠনে অন্তরায় হচ্ছে। আমাদের কি একটু ভাবতে হবে না যে, আমরা যে কাজটি করছি, সেটি করলে ভালো হবে না খারাপ হবে? কারণ আপনি আমি আমরা সবাই সমাজের অংশ। বিশেষ করে আমাদের সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম, যারা আগামীর কাণ্ডারি, তাদের কোনো ধ্বংসাত্মক কাজে ঠেলে দেওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে আমাদের দেশটা অনেক সুন্দর, আমাদের আছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। সংস্কৃতির সড়ক পরিষ্কার রাখতে হবে।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর এ ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারই চাই।’ এ চাওয়া তো সবার। এটাকে বলে স্বপ্ন, প্রতিটি মানুষ স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে। আপনি তো একজনের স্বপ্নকে নষ্ট করতে পারেন না। কেউ যদি অন্যায় করে তাকে আইন দেখবে। আপনি আইন হাতে তুলে নেবেন কেন? ইদানীং দেখা যাচ্ছে, দেশের মানুষ খুব অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। বিশেষ করে গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের প্রচণ্ডভাবে নৈতিক স্খলন ঘটছে। আমরা মুরুব্বিকে সম্মান করছি না, মান্য করছি না, একই সঙ্গে ছোটদেরও গণ্য করছি না। এ কথা সত্য যে, তথ্যপ্রবাহের অবাধ স্রোতে তরুণ প্রজন্ম গা ভাসিয়ে দিয়েছে। তারা অনলাইন থেকে ভালোটা নিচ্ছে না, এর কুফলটা নিয়েই দৌড়াচ্ছে। তাদের আমরা নৈতিকভাবে জীবন গঠন সম্পর্কে সবক দিতে পারছি না? আমাদের তো সবারই জানা যে, একটি আদর্শভিত্তিক সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা খুবই প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। নীতির প্রশ্নে যেমন আপস চলে না, তেমনি অন্যায়ের ক্ষেত্রেও না। তাই সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অন্যায়, অপরাধ, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয় ঢুকে পড়েছে, তা আর অবহেলার জায়গা নেই। এসব ব্যাধিকে এখনই ছেঁটে ফেলতে হবে, কেটে ফেলতে হবে, শুদ্ধ করতে হবে, কারণ এগুলো ক্যানসারের মতো- যদি সময়মতো রোধ না করা যায়, পুরো সমাজকেই গ্রাস করে ফেলবে।
যদি প্রতিদিন অশান্তি, খারাপ খবর, হত্যা-ধ্বংস, অপরাধের আয়নায় মুখ দেখি, তাহলে সূর্যের আলো আমাদের আলোকিত করবে কি? আমরা খারাপে খারাপে ডুবে গেলে, আমাদের উদ্ধার করবে কে? আসলে ডুবে যাওয়া বা সেখান থেকে উদ্ধার এই পর্যন্ত আমাদের যেন যেতে না হয়। যতটুকু পিছিয়ে গেছি আর যেন সেদিকে না যাই। আমরা মনে রাখি, আমি একজন স্বতন্ত্র মানুষ, আমার নিজস্ব স্বপ্ন আছে, আমার পরিবার ও সমাজ আছে, সেই স্বপ্ন নিয়ে ত্রিমাত্রিক মঞ্চে সাজাব। দেশটা সুন্দর, এখন আমরা যদি সুন্দর হই তাহলেই মঙ্গল। এ কথা ঠিক, রাজনৈতিক আপ-ডাউন, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, ব্যক্তিক দুঃখ-কষ্ট থাকবেই। এজন্য সব সময় সংগ্রাম করতে হয়। আসুন আমরা যার যার কাজে আনন্দ খুঁজি। অন্যের ক্ষতি না করি, অন্যায়, অপরাধ থেকে দূরে সরে থাকি। আমার ছেলেমেয়ে, ভাই-ভাতিজা এবং পড়শির সন্তানকে বলি, তোমরা নিজের জীবন গঠনে ব্যস্ত থাকো। ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ বলা শেখো। ব্যক্তিটি তুমি, দেশটি তোমার, কাজেই তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে এ দুটিকে এগিয়ে নেবে। তুমি ঠিক মানেই, তোমার পৃথিবী ঠিক।
লেখক: কবি

