পরিবারব্যবস্থাকে যতদিন পর্যন্ত পরিবারের সব সদস্যের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থায় পরিণত করা না যাবে ততদিন পর্যন্ত এরূপ সংঘাত-সহিংসতা চলবে। পরিবারে নারী ও শিশুসহ সব প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে পরিবারে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করার বা চর্চা করার যে শিক্ষা তা শৈশব থেকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তিকে পরিবার এবং সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার উপযুক্ত ব্যক্তিতে পরিণত করার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।...
বাংলাদেশে সমাজব্যবস্থা টিকে থাকার ক্ষেত্রে পরিবার এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে গঠিত সম্পর্কগুলোর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে এবং তা অন্যতম হিসেবে বিবেচ্য। চলতি সময়ে বেশ কিছু ঘটনা নানাভাবে প্রশ্ন তৈরি করছে যে, পারিবারিক প্রেক্ষাপটে কিংবা সামাজিক পরিসরে যে সম্পর্কগুলো দীর্ঘদিন ধরে আস্থার, নির্ভরতার এবং পরস্পর বিশ্বাসের মধ্যদিয়ে পরিচালিত হয়েছে সেই সম্পর্কগুলো এত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে কেন? সেই সম্পর্কগুলো অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ছে কেন? পরিচিত বা রক্তের সম্পর্কের কেউ হত্যাকারী হিসেবে কেন আবির্ভূত হচ্ছে? যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেই ঘটনাগুলোর সামগ্রিক বাস্তবতা কিংবা সেই ঘটনাগুলোর পেছনের কারণগুলো সম্পর্ক তছনছ করে ফেলছে। যারা এ ঘটনা সৃষ্টি করেছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে সেই কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই হত্যা বা নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা তৈরি করার একটি অনুকূল সময়ের অনুসন্ধানে মনোযোগী ছিলেন। সমাজের মধ্যে একটি শ্রেণি তৈরি হয়েছে যারা পাওয়া না পাওয়া, ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, সমাজের মধ্যে সামাজিক অনুশাসনগুলো যথাযথ চর্চা না করা ইত্যাদি প্রসঙ্গ নানাভাবে অপরাধ প্রক্রিয়ায় ধাবিত করে। অন্যদিকে, সমাজের মধ্যে সৃষ্ট সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব, মোটাদাগে এ বিষয়গুলো মানুষকে নানাভাবে অনভিপ্রেত পরিস্থিতির মুখোমুখি করছে।
বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় নানা মাত্রিক উপকরণ রয়েছে, যা প্রতিটি দেশের সমাজব্যবস্থায় স্বতন্ত্রভাবে বিদ্যমান। যে উপকরণগুলো একজন ব্যক্তিকে পরিবারের পরিসর থেকে রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডল পর্যন্ত নানা আঙ্গিকে নানা ধরনে নানা পরিচয়ে তাকে প্রস্তুত করে। সেখানে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যক্তিত্বের বিকাশ, সামাজিক সম্পর্কগুলো অনুশীলন কিংবা চর্চা করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দীক্ষা দেয়। সামাজিক প্রেক্ষাপটে সমাজে সবার জন্য নিরাপদ এবং আস্থার ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার যে চিরাচরিত শিক্ষাদীক্ষা বিরাজমান ছিল তা ক্রমান্বয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে।
আমাদের সমাজব্যবস্থায় চলমান অসহিষ্ণতার বিপরীতে অতীতে সামাজিক সম্পর্কগুলো এক ধরনের কার্যকর যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে। চলতি সময়ে এসে আমাদের সমাজব্যবস্থা তথা জীবনব্যবস্থায় বেশ কিছু প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ায় মানুষের মধ্যে বস্তুগত প্রাপ্যতা-অপ্রাপ্যতাকে কেন্দ্র করে কিংবা ব্যক্তি ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজের সন্তান, পরিবারের আপনজন কিংবা সমাজের অন্য একজন ব্যক্তিকে আঘাত করা, ক্ষতি করা এবং সর্বোচ্চ আঘাত হিসেবে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। এখন বিষয় হচ্ছে, যে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এ হত্যাকাণ্ডগুলো বা এ ধরনের পারিবারিক বা সামাজিক নৃশংসতা কি নতুন? এগুলো একেবারে নতুন নয়! এ ধরনের ঘটনাগুলো এর আগেও ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটার পরে সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এবং সর্বোপরি গণমাধ্যমে সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। গণমাধ্যমে সমাজের নানা ধরনের অসঙ্গতি-অনিয়ম, ত্রুটিযুক্ত জীবন বা সমাজব্যবস্থায় বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা তুলে ধরা হয়। কিন্তু দায়িত্ব কিংবা ব্যবস্থা গ্রহণের দায় রাষ্ট্রের অর্থাৎ সরকার এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর। এ প্রশ্নে মোটাদাগে এক ধরনের ব্যত্যয় লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যবস্থার নামে যা হচ্ছে তা অপরাধ প্রতিরোধ বা সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কতটুকু কার্যকর?
আসকের তথ্য মতে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৮৫ জন নারী বিভিন্ন কারণে খুন হয়েছেন। নারীর প্রতি সহিংসতা হিসেবে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৮০ জন নারী, এর মধ্যে ২০ জন শিশু। এসব ঘটনা আমাদের সামনে বেশ কিছু ত্রুটি দৃশ্যমান করছে। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে নারীর প্রতি সহিংসতার এ অসুখগুলো নানাভাবে পরিবার ও সমাজব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। সেই প্রভাবের পরিসর কিংবা সেই প্রভাবের বিস্তরণ থেকে মুক্তির উপায় হিসাবে যে ব্যবস্থাগুলোর প্রয়োজন ছিল সেই ব্যবস্থাগুলো যথাযথভাবে গ্রহণ করা হয়নি। কারণগুলোর পরিসর কিংবা প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করলে যে প্রেক্ষাপটগুলো সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান, সেগুলো হলো- এখানে পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের অপরাধগুলোর বিচারে দীর্ঘসূত্রতা দৃশ্যমান। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করি, অভিযুক্ত বা অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা। পরিসংখ্যান বলছে, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের শিকার কিংবা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হলো প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। অতীতে এরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এবং যে প্রবণতা তাতে এটি মনে হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের পরিবারের সদস্য কিংবা মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে নিয়ে আমাদের দেশে রাজনৈতিক পরিসরে কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর যে প্রতিশ্রুতি তা শুধু তাদের আশ্বাস-বিশ্বাসের মধ্যে আবৃত রাখার কৌশল। এখান থেকে তাদের অবস্থার পরিবর্তন কিংবা সমাজের মধ্যে এমন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা যে ব্যবস্থা একজন প্রান্তিক মানুষকে ক্ষমতায়িত করবে। সেটি তার নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে ক্ষমতায়িত করবে। তার সম্পর্ককে চলমান রাখার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বিকাশের প্রশ্নে তাকে ক্ষমতায়িত করবে। সমাজে তার মতামত প্রকাশ কিংবা ন্যূনতম জীবনধারা বা কাঠামো নির্মাণ এবং সেটা চলমান রাখার প্রশ্নে ক্ষমতায়িত করবে। এই ক্ষমতায়িত না করার ফলে দীর্ঘদিন ধরে যে শূন্যতা তৈরি হয়ে আছে তার সূত্র ধরে কর্মের ঘাটতি, দরিদ্রতা কিংবা সম্পর্কগত ভঙ্গুরতা এবং এই আর্থিকসংকট থেকে সৃষ্ট পরিবার এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে মনোমালিন্য কিংবা দ্বন্দ্ব মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। মানুষের নিরাপদ বসবাস কিংবা জীবন পরিচালনার সুযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে।
সমাজে বিদ্যমান অস্থিরতার বিষয়গুলোকে সামনে রেখে যে বা যারা মনে করেন তিনি আর বাস্তবতাকে বা পরিবারকে বহন করতে পারছেন না কিংবা আরেকটি অনৈতিক কিংবা আইন এবং সমাজের রীতিবহির্ভূত সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে চলতি সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চাচ্ছেন তারাই মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন ভয়ংকর, জড়িয়ে পড়েন নৃশংস ঘটনায়। কতটা মর্মান্তিক ও পৈশাচিক, যে সন্তান হত্যার কিছু সময় আগে কিংবা এক দিন আগেও যে ব্যক্তিকে বাবা বলে সম্বোধন করেছে, সন্তানের প্রয়োজনে বাবার কাছে বারবার গিয়েছে, সেই বাবাই একদিন পরে কিংবা কিছু সময় পরে সেই সন্তানকে হত্যা করলেন। এর দায় কি শুধু যিনি হত্যা করলেন তার নাকি আমাদের সমাজব্যবস্থায় বিদ্যমান কাঠামো ও স্তরবিন্যাসের মধ্যেও নিহিত? আচরণ ও চাহিদাগত অস্থিরতার মতো সামাজিক অসুখ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের কাবু করে রাখছে, আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখছে। রাষ্ট্রের অসম নীতি ও ক্ষমতাবানদের প্রতি অতি আদুরে দৃষ্টি সমাজের একটি গোষ্ঠীকে নানা প্রশ্নে ক্ষমতাবান, নানা প্রশ্নে অর্থবিত্তের কিংবা বৈধ-অবৈধ উপায়ে উপার্জনের ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে। সেসব ক্ষমতাবান কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিরীক্ষকরা সমাজের পুরো বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
এ ঘুনে ধরা সমাজ কিংবা সমাজের নানা স্তরে নানা পর্যায়ে চলমান বৈষম্য এবং নানা প্রশ্নে ক্ষমতাবানদের যে দাপট তা শৃঙ্খলাবদ্ধ করা প্রয়োজন। ক্ষমতাবানদের আধিপত্য বিস্তারের উদাহরণ পরিবার থেকে রাষ্ট্র সর্বত্র দৃশ্যমান। সমাজের যারা দুর্বল কিংবা পিছিয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা ভঙ্গুর সম্পর্কগুলোর ওপরেই অত্যাচার-নিপীড়ন বেশি হচ্ছে। আরও একধাপ এগিয়ে হত্যা করা কিংবা নিঃশেষ করে দেওয়ার যে অপরাধমূলক তৎপরতা গ্রহণ করছে কিংবা ভাবছে তা রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ঘাটতি প্রকাশ করছে।
বাংলাদেশে পারিবারিক প্রেক্ষাপটে হোক কিংবা সামাজিক প্রেক্ষাপটেই হোক, সংঘটিত অপরাধে মূল কারণগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। শুধু উপসর্গ সমাধান করে, উপসর্গের পেছনে ছুটে মূল কারণগুলো সমাধান করা যাবে না। পরিবারব্যবস্থাকে যতদিন পর্যন্ত পরিবারের সব সদস্যের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থায় পরিণত করা না যাবে ততদিন পর্যন্ত এরূপ সংঘাত-সহিংসতা চলবে। পরিবারে নারী ও শিশুসহ সব প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে পরিবারে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করার বা চর্চা করার যে শিক্ষা তা শৈশব থেকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তিকে পরিবার এবং সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার উপযুক্ত ব্যক্তিতে পরিণত করার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায়, ব্যক্তি বিরুদ্ধাচরণ করবে ব্যক্তির, সম্পর্কের ও চলমান সমাজব্যবস্থার।
লেখক: সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ
শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
