একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর। আজকের শিশুই আগামী দিনের নাগরিক, নেতা ও কর্মক্ষম জনশক্তি। তাই একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও মানবিক দেশ গড়তে হলে প্রথমেই প্রয়োজন শিশুদের সুষ্ঠু, মানবিক ও মননশীল বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা।
কেবল শারীরিক বিকাশ নয়। শিশুদের চিন্তাশক্তি, কৌতূহল, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা তাদের পরিণত করে দায়িত্বশীল নাগরিকে। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ- এ তিনের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া শিশুদের মননশীল বিকাশ অসম্ভব। একটি চিন্তাশীল প্রজন্মই পারে জাতিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে এবং ‘স্মাট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার বর্ণিত বিষয়াবলিকে সামনে রেখে শিশুসাহিত্যিকদের নিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির’ উদ্যোগে ২৪-২৫ অক্টোবর ২০২৫ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য ‘শিশুসাহিত্য উৎসব।’ দেশের খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিকদের সরব উপস্থিতিতে গবেষকদের গবেষণায় এ অনুষ্ঠানে আলোচনায় উঠে এসেছে দেশের আগামী প্রজন্মকে যদি সত্যিকার অর্থে প্রকৃত আদর্শিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হয় তবে প্রয়োজন শিশুদের মননশীল বিকাশ। হলভর্তি শিশু-কিশোর এবং তাদের অভিভাবকদের উপস্থিতিতে শিশুসাহিত্যিক ও মনোবিজ্ঞানীসহ দেশের বিভিন্ন স্তরের সাহিত্যিকরা এ বিষয়ে তাদের গবেষণালব্ধ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি প্রতি বছর এ সময়ে নিয়মিত এ ধরনের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে থাকে। এ ধরনের জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান উদ্যাপনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাতেই হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খ্যাতিমান সাহিত্যিকরা এ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছেন। এবারে ভিন্ন আঙ্গিকে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্বে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা হয়েছে। অনুষ্ঠানে একটি পর্বে আমার আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে। শিশুসাহিত্য উৎসবের দ্বিতীয় দিনের শেষাংশের বিশেষ পর্বে বই কীভাবে কাছে টানতে পারে শিক্ষার্থীদের এবং শিশুদের পাঠবিষয়ক ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে বক্তারা তাদের গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ শ্রোতাদের কাছে তুলে ধরেন।
আলোচিত বিষয়াবলিকে সামনে রেখে আমি শিশুদের মননশীল বিকাশ ও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুষ্ঠু সমাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে করণীয় বিষয়ে সংক্ষিপ্তকারে এখানে তুলে ধরছি।
আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে সরকার ওলট-পালট হয়েছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, ভালোমন্দ না দেখে পূর্ববর্তী সরকারের সব বিষয়কে মোটামুটি অকার্যকর করে ফেলেছে। পরবর্তী সরকার এসে আবার নতুন করে সবকিছু করেছে। ফলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় একটি প্রতিবন্ধকতা সবসময় ছিল। তাছাড়া বিগত সময়ে বাংলাদেশ অনেক বেশি বৈদেশিক অনুদাননির্ভর হয়ে পড়েছিল। অনেক সময় দাতা দেশগুলোর পরামর্শে চলতে হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অগ্রসরমুখী চিন্তাভাবনাসহ সংস্কার ও পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে অনেক কিছু করা প্রয়োজন।
শিশুদের মননশীল বিকাশ হলো তাদের বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং মানসিক গঠনকে ধাপে ধাপে বিকশিত করার প্রক্রিয়া। এটি শুধু পাঠ্যবিষয়ক জ্ঞানার্জনের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিশুদের চিন্তাশক্তি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দক্ষতা এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনার বিকাশকেও অন্তর্ভুক্ত করে। একটি শিশুর মননশীল বিকাশ তার সামগ্রিক ব্যক্তিত্ব, ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সামাজিক সংহতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পরিবার হলো শিশুদের প্রথম শিক্ষক। শিশু যখন জন্মায়, তার শেখার প্রাথমিক পরিবেশ পরিবার। পিতা-মাতা শিশুদের প্রতি যত্নশীল, উৎসাহব্যঞ্জক এবং সহানুভূতিশীল থাকলে শিশু স্বাভাবিকভাবে তাদের চিন্তাশক্তি ও আবেগ প্রকাশ করতে শেখে। গল্পপাঠ, চিত্রাঙ্কন, খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কার্যক্রম শিশুদের কল্পনাশক্তি ও মননশীল বিকাশকে উৎসাহিতি করে। এ ছাড়া শিশুদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার সুযোগ দিলে তাদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি আরও বিকাশিত হয়।
বিদ্যালয় হলো শিশুদের শিক্ষার দ্বিতীয় স্তর, যেখানে তারা সমাজের সঙ্গে মেলামেশা করতে শেখে। শিক্ষকের দিকনির্দেশনা, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা এবং বিতর্কমূলক পাঠক্রম শিশুদের সমস্যা সমাধান ও বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা বৃদ্ধি করে। দলগত কার্যক্রম ও সহপাঠী শিশুদের সঙ্গে সহযোগিতা শিশুদের সামাজিক দক্ষতা ও দলগত মানসিকতাকেও বৃদ্ধি করে। এভাবে বিদ্যালয় শিশুদের মননশীল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সমাজও শিশুদের বিকাশে বিশেষ অবদান রাখে। নিরাপদ, সহায়ক এবং সমৃদ্ধ সামাজিক পরিবেশ শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক বিকাশকে উৎসাহিত করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং পরিবেশসংক্রান্ত কার্যক্রম শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করে। সমাজ শিশুদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যা তাদের সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
শিশুদের মননশীল বিকাশের জন্য মূল উপাদান হলো উৎসাহ, স্বাধীনতা এবং অভিজ্ঞতার সুযোগ। অভিভাবক ও শিক্ষকরা যখন শিশুদের নিজের পছন্দ অনুযায়ী চিন্তা করতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করেন, তখন শিশুরা কেবল বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে নয়, চরিত্রগত দিক থেকেও বিকশিত হয়। সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সামাজিক সংহতি শিশুর মননশীল বিকাশের অন্যতম প্রধান দিক।
শিশুদের মননশীল বিকাশের জন্য নিয়মিত উৎসাহ প্রদান করা, বিভিন্ন নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করা এবং শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের কখনোই অপ্রয়োজনীয় চাপ দেওয়া উচিত নয়; বরং তাদের শিখতে আগ্রহী করে তোলা, ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া এবং সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তাদের চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করা উচিত।
পৃথিবীর বহু উন্নত দেশ আছে যেখানে পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীর মান নির্ধারণ হয় না কিংবা দক্ষতা বাচাই হয় না। শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের মধ্যদিয়ে অর্থাৎ নিয়মিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে দক্ষতা যাচাই হয়। শিক্ষার ভিত্তিটুকু শক্ত করতে হলে আমাদের প্রধানত তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। দক্ষ শিক্ষক, সক্ষম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিয়মিত মনিটরিং। দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় অনেকদিন কোনো সংস্কার হয়নি। দিনের পর দিন একইভাবে চলতে গিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। ক্রমপরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে আমরা বদলাতে পারিনি। ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে সঠিক পাঠ না দিয়ে, পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোচিং-বাণিজ্যের মাধ্যমে গাইড বইনির্ভর একটি সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে। যেটি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে দেখা যায় না। শিক্ষাব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। মানুষের চাহিদা এবং যুগের প্রয়োজনে এটি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা উচিত। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ন্যূনতম কতগুলো বিষয়ে অবশ্যই জ্ঞানার্জন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক শ্রেণির ক্ষেত্রে পড়ালেখার পাশাপাশি দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাক্রম বিশ্বব্যাপী চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। শিক্ষাক্রমে কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। বিজ্ঞান, মানবিক, বাণিজ্য ইত্যাদি বিভাজন করেই শিক্ষার্থীদের আমরা আরেকটি ধাঁধার মধ্যে ফেলে দিয়েছি। সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন-পরিমার্জন করা এখন সময়ের দাবি।
তরুণ প্রজন্মকে উন্নত বিশ্বের চিন্তাচেতনায় উন্নত করতে শিশুদের মানসিক বিকাশ জরুরি। এ বিষয়ে শিশু-কিশোরদের নিয়ে যারা কাজ করেন এবং লেখালেখি করেন তাদের দায়িত্ব অনেক। বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি শিশুদের মানসিক বিকাশ ও মননশীলতা তৈরির প্রয়োজনে শিশুদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার বিষয়ে কাজ করে চলছে। তাদের ওই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ গঠনে আরও বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের দায়বদ্ধতা রয়েছে।
দেশের মানবিক প্রজন্মই রাষ্ট্রকে দাঁড় করাতে পারে শক্ত ভিত্তিতে। মননশীল, নৈতিক ও উদ্ভাবনী শিশুদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ। যে দেশ হবে ভবিষ্যতের গর্ব, জ্ঞান ও মানবিকতার আলোকস্তম্ভ।
আজকে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, একটি আদর্শ সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ গঠনের জন্য যা প্রয়োজন তা যেন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে নজর দেওয়ার জোর তাগিদ রইল।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
E-mail: [email protected]
.jpg)


