আলোচনা এবং উত্তেজনার দেশে এখন আলোচনার অন্যতম বিষয় গণভোটের প্রশ্ন এবং উত্তর নিয়ে। উত্তর খুবই সহজ, হ্যাঁ অথবা না। কিন্তু প্রশ্নগুলো সহজ নয়। সাধারণত প্রশ্নের ওপরই নির্ভর করে উত্তর কেমন দিতে হবে। ফলে জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে কপালে ঘাম ছুটে যায়। আর যদি প্রশ্ন হয় কৌশলী তাহলে উত্তর দেওয়া বিপজ্জনক। যেমন- যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি এখনো আগের মতোই চুরি করেন? তাহলে উত্তর কী হবে? হ্যাঁ বললে চোর সাব্যস্ত হবেন, না বললে আগে চুরি করতেন এটা স্বীকার করে নেওয়া হয়। ফলে হ্যাঁ অথবা না এই দুই শব্দে সব উত্তর দেওয়া যায় না। এরকম একটা প্রশ্নের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভোটাররা। গণভোটে চার প্রশ্নের এক উত্তর যে কীভাবে তারা দেবেন, এনিয়ে বিতর্ক চলছে।
গণ-অভ্যুত্থান ছিল রাজনৈতিক উত্তেজনার উচ্চতম রূপ। মানুষের আকাঙ্ক্ষা আর অপমান মিলে এমন এক রসায়ন তৈরি হয় তা যেন ভয় ভুলিয়ে দেয়। যে জীবন এত প্রিয় সেই জীবনের ঝুঁকি নিতেও তখন দ্বিধা করে না। সব দাবি কেন্দ্রীভূত হয়ে একটি লক্ষ্যে পরিণত হয়। তা হলো, সরকারের উচ্ছেদ। গণ-অভ্যুত্থানে তেমনি মানুষ উচ্ছেদ করেছে সরকারকে। কিন্তু তার পরই শুরু হলো পরবর্তী সরকার গঠনের প্রশ্ন এবং পথ অন্বেষণ। গণমানুষের এত প্রত্যাশা পূরণ হবে কীভাবে? পুরোনো দুঃশাসনের অবসান করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে কীভাবে? দল অনেক, পথ অনেক। তাই বিতর্ক যেন শেষ হতেই চায় না। এর সঙ্গে সরকারের নানা কথা ও কর্মকাণ্ডে তৈরি হয়েছে সংশয়, নির্বাচন কি হবে? নির্বাচন না হলে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে কার কাছে এবং কী পদ্ধতিতে? সনদ ছাড়া নির্বাচন নয়, গণভোট ছাড়া নির্বাচন নয় এই বিতর্ক ছাপিয়ে গেল সবকিছুকে। আলোচনা থেকে হারিয়ে গেল জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা আর তা বাস্তবায়নের কথা। নির্বাচন হবে কি না হবে, এ আশঙ্কা যেন সত্যি রূপ নিতে শুরু করল। এরকম পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে করার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।
তার ভাষণ অনুযায়ী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোটের আয়োজন করা হবে। চারটি বিষয় নিয়ে একটি প্রশ্নে অনুষ্ঠিত হবে এ গণভোট। গণভোটে সম্মতি পেলে আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে শুধু নিম্নকক্ষে নয়, উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ অনুমোদন করা হয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টা ভাষণ দিয়ে বলেন, ‘আমাদের আরেকটি গুরুদায়িত্ব হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সব প্রস্তুতি গ্রহণ করছি।’
রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত প্রায় ৯ মাস ধরে যে কাজ করেছে সে কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই সনদে সংবিধানবিষয়ক ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিছু প্রস্তাবে সামান্য ভিন্নমত আছে। বাকি অল্প কিছু প্রস্তাবে আপাতদৃষ্টে মনে হয় অনেক দূরত্ব আছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, এসব প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও আসলে মতভিন্নতা খুব গভীর নয়। কেউ সংস্কারটা সংবিধানে করতে চেয়েছেন, কেউ আইনের মাধ্যমে করতে চেয়েছেন। কিন্তু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, নীতি ও লক্ষ্য নিয়ে কারও মধ্যে মতভেদ নেই। কাজেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশ্য বক্তব্য যতখানি পরস্পরবিরোধী অবস্থান আছে বলে মনে হয়, জুলাই সনদ সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে ততখানি মতপার্থক্য দেখা যায় না। এটি অনন্য অর্জন। এতে জাতি এগিয়ে যেতে সাহসী হবে।
এ সাহসে উজ্জীবিত হয়ে তিনি জানালেন, ‘আমরা সব বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোটের আয়োজন করা হবে। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের মতো গণভোটও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এতে সংস্কারের লক্ষ্য কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হবে না। নির্বাচন আরও উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে।’ যেহেতু গণভোটের কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই, তাই গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে বলে তিনি জানান।
কেমন হবে গণভোট- এ ক্ষেত্রে উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, চারটি বিষয় নিয়ে একটি প্রশ্নে হবে গণভোট। প্রশ্নটি হবে এ রকম: ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কারসম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’ বিষয় চারটি হবে নিম্নরূপ-
ক. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘গণভোটের দিন এ চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে আপনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে আপনার মতামত জানাবেন।’
সংসদের উচ্চকক্ষ কীভাবে গঠিত হবে তা জানাতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এ প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এর মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। পাশাপাশি জুলাই সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান প্রধান উপদেষ্টা।
সবই কেমন যেন জটিল হয়ে গেল আবার। উদাহরণ দিয়ে বলা যাক! চারটি বিষয়ে একটি প্রশ্ন, উত্তর হবে হ্যাঁ অথবা না। চারটি বিষয়ের মধ্যে অনেক বিষয় আছে। গণমানুষকে সেগুলো ব্যাখ্যা এবং জানানোর উপায় কী হবে? তারা না জেনে না বুঝে কি ব্যালট পেপারে সিল দেবেন? যিনি উচ্চকক্ষ চান না অথচ বাকিগুলো চান তিনি কীভাবে ভোট দেবেন? আর সংবিধান সংশোধনের একমাত্র এখতিয়ার কেবলমাত্র নির্বাচিত জাতীয় সংসদের। তাছাড়া একটা সময় পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮০ দিন জাতীয় সংসদ দ্বৈত সত্তা নিয়ে চলবে, অর্থাৎ একই সঙ্গে সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করার যে কথা বলা হয়েছে। এটা তো সংবিধানসম্মত নয় এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে কোনো ঐকমত্য হয়নি।
এখন সংকট তৈরি হলো এভাবে, যদি হ্যাঁ জয়যুক্ত হয় এবং একই দিনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যারা বিজয়ী হবেন তারা যদি তাদের নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে না চান তাহলে কী হবে? আবার যদি না ভোট বিজয়ী হয় তাহলে কী হবে? ফলে অতীতের গণভোটের মতোই এবারের গণভোট কি লোক দেখানো হবে? গণভোটে সংবিধান সংশোধন হয় না। সংবিধান সংশোধন হয় সংসদে। ফলে হ্যাঁ জয়যুক্ত করতে গণভোটকে গণতামাশায় রূপান্তরিত করা হবে না তো? ইতোমধ্যেই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে হাঁটতে গিয়ে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, নারী, আদিবাসী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার বিপন্ন হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়েনি বরং কমেছে। বিদেশিদের সঙ্গে অসম চুক্তিগুলো বাতিল তো হয়নি বরং নতুন নতুন চুক্তি হচ্ছে। একদিকে নির্বাচন অন্যদিকে জুলাই এর আকাঙ্ক্ষা ধারণ করার পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব ছিল সরকারের। তা তো হলোই না বরং গণভোটের গণবিড়ম্বনা তৈরি হলো।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]

