১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ইনস্টিটিউট ফর পলিসি, গভর্ন্যান্স এবং ডেভেলপম্যান্ট কর্তৃক আয়োজিত হোটেল ওয়েস্টিনে একটি চিন্তাকর্ষক গোলটেবিল অনুষ্ঠান হয়ে গেল। কর্মসূচিটির বিষয়বস্তু ছিল ‘Towards a Comprehensive Foreign Policy of Bangladesh’। অনুষ্ঠানটিতে বাংলাদেশ সরকারের এক সময়ের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মোহাম্মেদ হুমায়ূন কবির তার বুদ্ধিদীপ্ত মনীষা এবং দীর্ঘ পেশাজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে প্রদত্ত মূল বক্তব্যের সূচনার মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু করেন। অনুষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় লক্ষণীয় বিষয় ছিল ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রেক্ষাপট। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী এবং জাতীয় নাগরিক দলসহ বিশ্ববিদ্যালয়, চিন্তাশীল প্রতিষ্ঠান এবং সুশীল সমাজের সদস্যবৃন্দ। বস্তুত, উপস্থিত সবাই বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতির ওপর নিজস্ব ধারণা জ্ঞাপনের মুক্ত আলোচনার এক সুন্দর পরিবেশ পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনার প্রারম্ভেই যে বিষয়টি তর্কের সূচনা করে সেটি হলো এ নীতির মূল নির্যাস, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কাহারো সাথে বৈরিতা নয়’ FRIENDSHIP TO ALL, MALICE TO NONE. এখানে সূক্ষ্ম জিজ্ঞাসু হলো কীভাবে এ পলিসি বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাস্তবে কার্যকর করা যায়। এটা আদৌ কি সম্ভব, না কেবলমাত্র উদার মনোভাবের এক অলীক দৃষ্টিভঙ্গি। পররাষ্ট্রনীতির এহেন দৃষ্টিভঙ্গির দার্শনিক ব্যাখ্যা একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা উত্তর পাব যে, এ নীতির একটি শর্ত রয়েছে এবং সেটি হলো ‘কোনো শত্রু’ থাকতে পারবে না। তাত্ত্বিকভাবে এটা ভাববাদের (IDEALISM) দার্শনিক মনোভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত, এবং কূটনৈতিক পেশা অনুশীলনের ক্ষেত্রে উদার পথ (LIBERAL APPROACH) অবলম্বনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতাকে বোঝায়। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি বাক্যটিকে কেবলমাত্র তার আক্ষরিক মূল্যের (Face Value) আলোকে বিচার করলে ভুল হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে Real Politik বলে একটি বিষয় আছে। এর সারবস্তুটি বাস্তববাদী রাজনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেকোনো নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে তার আক্ষরিক মূল্যে বিচার করার আগে, তার মর্মার্থকে গুরুত্বসহকারে অভিজ্ঞতাপ্রসূত পরীক্ষার আলোকে মূল্যায়ন করা অনস্বীকার্য।
একটি রাষ্ট্র তার ক্ষমতার উপাদান (Elements of Power) ব্যতীত আন্তর্জাতিক মণ্ডলে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। জাতীয় ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় জাতীয় স্বার্থের মাপকাঠিতে। যে রাষ্ট্র যত বেশি ক্ষমতাধর, সে জাতির জাতীয় স্বার্থ তত উচ্চাভিলাষী। আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থায় কোনো উপরিকাঠামো চালিত নির্বাচিত কর্তৃত্ব (Supra-National Authority) না থাকায়, সেখানে বিরাজ করে এক ধরনের নৈরাজ্য। এ অরাজতকতাকে মোকাবিলা করাই জাতীয় নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য এবং কর্তব্য।
ক্ষমতার উপাদানগুলোকে সহজভাবে ‘DIEM’ শব্দ দ্বারা আখ্যায়িত করতে পারি। DIEM শব্দটি চারটি শব্দের অক্ষর দ্বারা গঠিত। সম্প্রসারণ করলে দাঁড়ায় ‘D’-তে Diplomacy, ‘I’-তে Information, ‘E’-তে Economic এবং ‘M’-তে Military. Diplomacy বলতে একটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক নৈপুণ্যকে বুঝি। Information বলতে গণমাধ্যমের প্রভাবকে বোঝায়, Economic হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রগতিশীলতা এবং Military বলতে সামরিক ক্ষমতার ফলপ্রদ প্রতিরক্ষা। এখানে ‘কূটনীতি’ মূলত: পররাষ্ট্র দপ্তরের কূটনীতিবিদদের বিশেষায়িত ক্ষেত্র, যেমন নাকি ‘সামরিক’ হলো সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারদের স্বতন্ত্র বিশেষায়িত পেশা। কিন্তু এই দুই পেশার মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে, এ সত্যটি আমরা অনেকেই নীতিনির্ধারক হিসেবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হই না।
অবএব, পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত উদারবাদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা, যাতে করে নীতিবাক্যাটি কেবলমাত্র অনাবিল বাগ্মিতায় না পর্যবেসিত হয়। আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে যে বিষয়টির অনুপস্থিতি রয়েছে সেটি হলো সামরিক প্রতিরক্ষার (Military Defence) গুরুত্ব। উদাহরণস্বরূপ সিঙ্গাপুর একটি ছোট রাষ্ট্র কিন্তু তার পররাষ্ট্রনীতি বাস্তববাদী (Pragmatism) তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রনীতির একটি মূল বক্তব্য হলো, ‘সিঙ্গাপুরকে সর্বদা অবশ্যম্ভাবীভাবে নিশ্চিত করতে হবে একটি বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রতিরোধক সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা তার পররাষ্ট্রনীতিকে ফলপ্রসূ করতে জোরালো ভূমিকা পালন করবে’... Singapore must always maintain a credible and deterrent military defence as the fundamental underpinning for an effective foreign policy.’ ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কাহারো সাথে বৈরিতা নয়’ এ আপ্তবাক্যটি আমাদের কূটনীতিবিদদের দ্ব্যর্থক এবং অস্পষ্ট দিকনির্দেশনার দিকে পরিচালনা করতে পারে, যদি না আমরা এ আপ্ত-বাক্যটিকে বাস্তববাদী জ্ঞানের আলোকে পরিচালিত এবং প্রায়োগিক কূটনৈতিক অনুশীলনে রূপান্তরিত করতে পারি। যদি শান্তিই পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র লক্ষ্য হয়, তবে সে লক্ষ্য সব সময়ই পূরণ হবে আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে। যদি শান্তি অর্জিত হয় জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে, সেই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা (State Power) দুর্বল হয়ে পড়ে। অতএব, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সামরিক প্রতিরোধক (Military Deterrence) হলো পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা রেখা (Line of Defence)।
একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তার বহির্বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাদেশের জনসাধারণ অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, কিন্তু নিজের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করতে প্রস্তুত নয়। প্রত্যেক রাষ্ট্রই এ আদর্শিক অবস্থান থেকে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত করতে চায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেসব রাষ্ট্র উচ্চ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তারা অনুরূপ রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হবে। সে ক্ষেত্রে, পররাষ্ট্রনীতিতে সর্বজনীন বন্ধুত্বের আদর্শগুলোর সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি তখনই হয় যখন রাষ্ট্র তার সরকারের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কষাঘাতে তার নিরীহ জনসাধারণকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে দ্বিধাবোধ করে না। এ কারণেই বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতিকে বহির্বিশ্বে যৌক্তিক বৈধতা দিতে গেলে প্রমাণ করতে হবে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। যে রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানুষের স্বাধীনতার প্রতি সাংবিধানিকভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং তদরূপ ক্রিয়াশীল, সে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সম্পর্ক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তত বেশি সমাদৃত হবে।
সেমিনারটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘সর্বাঙ্গীন পররাষ্ট্রনীতি (Comprehensive Foreign Policy)’। বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক এবং জটিল। পররাষ্ট্র সম্পর্কিত জ্ঞানের একটি চ্যালেঞ্জ হলো বিষয় সুনির্দিষ্টকরণের অনিশ্চয়তা। কোন বিষয়কে বাদ দিয়ে কোন বিষয়কে পররাষ্ট্র সম্পর্কিত ‘একাডেমিক ডিসিপ্লিনের’ মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে কিংবা যাবে না, তা নিয়ে তার্কিক দ্বন্দ্ব। অনেকেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে পররাষ্ট্রবিষয়ক জ্ঞানের আওতাভুক্ত করতে চান না। যেখানে পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের জন্য রয়েছে একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’, তদরূপ ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান’ হলো রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের চারণভূমি। কিন্তু এ ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে ত্রুটিমুক্ত (Full-Proof) নয়। আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি ঘরোয়া রাজনীতি কীভাবে একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অনুপ্রাণিত এবং প্রভাবিত করে থাকে। একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরস্পরের সম্পূরক এবং আন্তঃপ্রভাবক।
হেনরি কিসিঞ্জার তার বিখ্যাত Diplomacy বইতে দেখিয়েছেন একজন কূটনীতিবিদের কী ধরনের প্রজ্ঞা এবং পেশাগত জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। সঠিক পররাষ্ট্র কৌশলের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শ দিতে একটি শক্তিশালী এবং উৎকৃষ্ট ফরেন সার্ভিসের সংস্কৃতি জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরার জন্য অবশ্যম্ভাবী। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সবচেয়ে মেধাসম্পন্ন পদপ্রার্থীরা কূটনৈতিক চাকরিতে প্রবেশ করেন। তাদের মেধার ধীশক্তির প্রাগ্রসরমান টেকসই নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন অবিচ্ছিন্ন পেশাগত মানোন্নয়ন এবং সামরিক বাহিনীর সর্বস্তরের অফিসারদের প্রাসঙ্গিক নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
বর্তমানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা শিক্ষার জন্য আসেন কিন্তু ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সামরিক কর্মকর্তাদের শিক্ষার কোনোরকম সুযোগ আছে বলে আমার ধারণা নেই। স্ট্রাটেজিক স্টাডিস (Strategic Studies)-এর ওপর ব্যবহারিক জ্ঞান উন্নত করার অনেক সুযোগের মধ্যে একটি হলো কূটনীতিবিদ এবং সামরিক কর্মকর্তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছাত্র এবং শিক্ষক বিনিময়ের কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা। কিন্তু এ ব্যাপারে দুই পক্ষের উদ্যোগ এবং মনোবৃত্তি থাকতে হবে।
আমরা যদি War is an Instrument of Politics এবং Peace is an Instrument of Diplomacy-কে জাতীয় নীতি নির্ধারণে আপ্তবাক্য হিসেবে ধরে নিই, তবে War এবং Peace-এর মধ্যে যে অনস্বীকার্য সম্পর্ক রয়েছে, তার পেশাগত অনুশীলন জাতীয় স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পররাষ্ট্রনীতি, সামরিকনীতির মতোই রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার চাবিকাঠি। কেবলমাত্র শান্তির প্রবচনকে ধ্রুব সত্য মানলে, যুদ্ধের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ এবং শান্তি একই মুদ্রার দুই পিঠ। এবং উভয়ের মূল লক্ষ্য হলো জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে জাতীয় নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা এবং সিএএবির সাবেক চেয়ারম্যান
.jpg)
.jpg)
