১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরে অভ্যুত্থানে বিজয়ী হওয়ার কথা কি কেউ মনে রেখেছে? দেশের মানুষ কি তীব্র আকাঙ্ক্ষায় প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তা ভুলে যাওয়া বা ভুলিয়ে দেওয়া একটা দেশের সংগ্রামী ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার শামিল। যদিও কিভাবে ক্ষমতার ওপরের স্তরে ক্ষমতার হাত বদল হয় সে খবর সাধারণ মানুষ পায় না বা রাখে না। ফলে তাদের কাছে তাদের জীবনধারণের সমস্যাটাই প্রধান। কিন্তু যখন জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ে আর জীবনের সংকট ও রাজনৈতিকসংকট একাকার হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ আর নির্লিপ্ত থাকেন না। তারা নেমে আসেন আন্দোলনের পথে। ৮২ থেকে ৯০ এমনি করে মানুষ নেমেছে বারবার এবং ৯০ সালে বিজয়ী হয়েছিল সামরিক স্বৈরাচার এরশাদকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ দেশের মানুষ একটা ঘোষণা শুনেছিল। দেশ দুর্নীতি আর অরাজকতায় ছেয়ে গেছে। এ অবস্থা চলতে পারে না, চলতে দেওয়া উচিত না। মন্ত্রীর বাসা থেকে সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করার ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা দখল করে সেনাপ্রধান এরশাদ। এরশাদ যেহেতু ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে বিএনপির কাছ থেকে তাই আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক ও সমর্থনসূচক। একটি গুলিও চলেনি, এক ফোঁটাও রক্ত ঝরেনি, দেশে একটি নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে, এ রকম একটি বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল তাদের পত্রিকায়। ফলে এর সুযোগ নিয়েছিল সামরিক শাসক। সামরিক শাসন জারী করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা হয়েছিল। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে এরশাদ প্রকাশ করতে শুরু করলেন তার পরিকল্পনাসমূহ। চিনতে অসুবিধা হলো না সামরিক শাসকের চেহারা এবং বুঝতে পারা গেল সামরিক শাসনের উদ্দেশ্য। কিভাবে দেশের অর্থনীতিকে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করা যায় সেই উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব দাবি উচ্চারিত হয়েছিল তা সব সময় শাসকদের লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে তাই সেসব ভুলিয়ে দেওয়া, মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার নানা পরিকল্পনা নিতে থাকে। দুর্নীতির শিকড়ে পানি ঢেলে শুধু ডালপালা ছাঁটলেই দুর্নীতি দূর হয় না বরং নতুন করে দুর্নীতিবাজরা শক্তিশালী হয়ে উঠে। এরশাদের কর্মকাণ্ডে মানুষ বুঝতে শুরু করল পুরোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে নতুন দুর্নীতিবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দেশ। দুর্নীতির নতুন চক্র তৈরি হচ্ছে।
প্রথম আক্রমণ এল শিক্ষার ওপর। এরশাদ ক্ষমতায় এসেই ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ড. মজিদ খানের শিক্ষা সুপারিশ প্রণয়নের যে চেষ্টা করল, সেখানে স্পষ্ট করেই বলা হলো শিক্ষা সবার জন্য নয়। শিক্ষা হবে মেধা এবং টাকার ভিত্তিতে। শিক্ষার সুযোগ না পেলে দরিদ্র কৃষক-শ্রমিকের সন্তান মেধাবী হবে কেমন করে আর যাদের টাকা নেই তারা শিক্ষা পাবে কীভাবে? শিক্ষার ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গড়ে উঠল ছাত্র আন্দোলন। জাফর, জয়নাল, মোজাম্মেল, কাঞ্চন, দিপালি সাহার রক্তে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসমাজ চ্যালেঞ্জ করল সামরিক শাসনকে।
পরবর্তী আক্রমণ এল আরও কৌশলে। ভাষার দাবিতে আন্দোলন ও রক্ত দিয়ে যে ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে দেশের মানুষ তা বারবার সমস্ত আন্দোলনে জনগণকে প্রেরণা দেয়। সব ধর্ম, লিঙ্গ, জাতিসত্তার সংগ্রামী মানুষের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে শহিদ মিনার। এরশাদ শহিদ মিনারে মোনাজাত ও দোয়া অনুষ্ঠানের কথা বলে এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে নষ্ট করার আয়োজন করেছিল। ছাত্র-জনতা সেই অপকৌশল পরাস্ত করে দেয়।
এসব ঘটনায় রাজনৈতিক দলসমূহ একত্রিত হতে শুরু করে। গড়ে উঠতে থাকে আন্দোলনের নানা সংস্থা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকল, চিনিকল সব লোকসান করে এই অজুহাত দেখিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে এরশাদ। কিন্তু যে কথা আড়াল করে তা হলো এটা ছিল বিশ্বব্যাংক প্রণীত স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসির বাংলাদেশে বাস্তবায়ন। শিল্প কারখানা বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে গড়ে উঠে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ বা স্কপ। কৃষকদের ফসলের ন্যায্য দাম, খেতমজুরদের দৈনিক মজুরি নির্ধারণ এবং সার বীজ পানি ও কীটনাশকের দাবিতে গড়ে উঠে ১৭টি খেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের আন্দোলন। নারী সংগঠনসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গড়ে তোলেন ঐক্যবদ্ধ নারী সমাজ। সাংস্কৃতিক কর্মীরাও গড়ে তোলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। হরিপুরের তেল ক্ষেত্র সিমিটার নামে এক ভুয়া কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও গড়ে উঠে আন্দোলন। প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসকদের সংগঠন প্রক্চি আন্দোলনের নামে তাদের পেশার মূল্যায়নের দাবিতে। সমাজের প্রতিটি অংশেই নাড়া দেয় এই সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। দমন-পীড়ন মোকাবিলা করে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা দেশে। রাজনৈতিক দলসমূহের জোট ১৫ দল ও ৭ দল গড়ে উঠে।
সামরিক শাসন তো বেশি দিন চলতে পারে না। ফলে তার বৈধতার জন্য নির্বাচন ঘোষণা হলো। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা নিয়ে বিতর্কে ১৫ দলীয় জোট ভেঙে যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট এবং জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। বামপন্থিদের জোট ৫ দল এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে সংবিধানের ৭ম সংশোধনী এনে সামরিক শাসনের বৈধতা নিয়ে নেয়। এরপর এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন নতুন রূপ গ্রহণ করে। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নুর হোসেন বুকে-পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ লিখে পুলিশ বিডিআর-এর গুলিতে আত্মাহুতি দিলে আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। আন্দোলনের মুখে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে আন্দোলনকে বিভক্ত করার লক্ষ্যে নতুন নির্বাচন দেয় এরশাদ। কিন্তু কোনো আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। অনুগত এবং রাতারাতি তৈরি করা বিরোধী জোটের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নামে একটা তামাশার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সংবিধানে ৮ সংশোধনী এনে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একজন স্বৈরাচার অবৈধভাবে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের নামে প্রহসন করে রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্র পাল্টে দিল। এটা কি ট্র্যাজেডি না কমেডি তা নিয়ে বিতর্ক চলবে বহুদিন।
আন্দোলনে কখনো জোয়ার এসেছে কখনো লেগেছে ভাটার টান। সংগ্রাম থেকে ছিটকে পড়েছে অনেকে। দালালির খাতায় নাম লিখিয়েছে অনেক বড় নেতা। কিন্তু আন্দোলন থামেনি। ১৯৯০ সালের ১০ আগস্ট জেহাদের মৃত্যু ছাত্র সংগঠনগুলোকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিল। গড়ে উঠল সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। ১৯ নভেম্বর আন্দোলনরত ৮ দল, ৭ দল এবং ৫ দল মিলে ঘোষণা করল সরকার পতন ও দেশ পরিচালনার লক্ষ্যে তিন জোটের রূপরেখা। ২৭ নভেম্বর ডা. মিলনের মৃত্যু যে আন্দোলনের অগ্ন্যুৎপাত ঘটাল তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা প্রদান করে। ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক পদত্যাগের মাধ্যমে স্বৈরাচারের বিদায় ঘটে।
আজ থেকে ৩৫ বছর আগের সেই দিন যেন আরও বহুদিন আমাদের স্মৃতিতে থাকবে। যখনই কোনো আন্দোলন গড়ে উঠবে তখনই ৯০-এর অভ্যুত্থানের কথা আন্দোলনকারীরা উল্লেখ করবেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠবে আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাগুলো কি বাস্তবায়িত হয়েছে। স্বৈরাচার কি বিদায় হয়েছে, গণতন্ত্র কি মুক্তি পেয়েছে? ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজের অবৈধ কাজকে আড়াল করার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কি বন্ধ হয়েছে? ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি কি বন্ধ করা গেছে? দেশের সম্পদ কি ব্যক্তি বা বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া বন্ধ হয়েছে? একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কি চালু কিংবা স্থায়ী হয়েছে? শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কৃষকের ফসলের লাভজনক দাম, নারীর মর্যাদা, আদিবাসীর স্বীকৃতি, সম্মান ও নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হয়েছে? সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন কি বন্ধ হয়েছে? শোষণ, লুণ্ঠন, টাকা পাচার বন্ধ করে দেশের উন্নয়নের সুফল কি দেশের আপামর জনতা পাচ্ছেন? এক কথায় উত্তর, না। ফলে মানুষ বারবার ফুঁসে উঠছেন, নেমে আসছেন আন্দোলনের পথে। ২০২৪ সাল ছিল সেই অপূর্ণ স্বপ্নের বাস্তবায়নের সংগ্রামের লক্ষ্যেই পরিচালিত আন্দোলন। নব্বই যেন পেছন থেকে সামনে এগিয়ে দিচ্ছে আমাদের।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]
.jpg)


