একজন পরিচিত মুখকে গুলি করা এক ঢিলে অনেক পাখি মারার শামিল হতে পারে। এর ফলে জনমনে আতঙ্ক বাড়বে, রাজনৈতিক পক্ষগুলো পরস্পরকে সন্দেহ করবে, পাল্টাপালটি আক্রমণ হবে, নেতা-কর্মীরা পরস্পরের প্রতি মারমুখী হয়ে উঠতে পারে। ফলে নির্বাচনি প্রচারণার ক্ষেত্রে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়বে। যার কিছুটা প্রভাব এবং দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে অস্থিরতা তৈরি করার এ এক পরিকল্পিত এবং কার্যকর অস্ত্র।…
অভ্যুত্থানের পর থেকে আকাঙ্ক্ষা এবং উত্তেজনা নিয়েই বাংলাদেশ চলছে। কিন্তু নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরদিন একজন প্রার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়াকে কোনো স্বাভাবিক বিষয় বলে মনে করা কঠিন। সংশয় আর উত্তেজনা যেন পিছু ছাড়ছেই না। সংশয় নির্বাচন নিয়ে আর উত্তেজনা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে। এতদিন সংশয় ছিল নির্বাচন হবে কি না এ প্রশ্নে আর এখন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে কীভাবে অংশ নেবে, প্রচার করবে এবং নির্বাচনের ফল কী হবে আর সেই ফল কীভাবে গ্রহণ করবে সে বিষয় নিয়ে ভাবনায়। নির্বাচন গণতন্ত্রের চর্চার বিষয় হিসেবে না দেখে যেকোনো মূল্যে বিজয় অর্জন করা বা প্রতিপক্ষকে যেকোনোভাবে হারিয়ে দেওয়াই মুখ্য হয়ে থাকে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন এলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ভোটারদের কীভাবে প্রভাবিত করবে কিংবা কীভাবে প্রলুব্ধ করবে অথবা কীভাবে আতঙ্কিত করবে এনিয়ে নির্বাচনি পরিকল্পনা সাজিয়ে থাকে। প্রতিবারের মতো এসব বিষয় তো আছেই। এর সঙ্গে হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া উত্তেজনায় নতুন মাত্রা তৈরি করল।
শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা কি একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা? ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, এটা একটা বার্তা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহজ নয়, স্বাভাবিক নয় এবং সামনে আরও জটিলতা হতে পারে, এ ধরনের বার্তা কি কেউ দিতে চান? আর বার্তাটা খুব সোজা, রাজনীতির মাঠে যাকে নিয়ে একটু বিতর্ক আছে, যার উত্তেজনা সৃষ্টির প্রবণতা এবং ক্ষমতা আছে, যে একটু আলাদা, যার সমর্থন থাকলেও দলের শক্তি তেমন নেই এবং ক্ষমতায় যেতে পারে এমন দলগুলোর সরাসরি জোটে নেই, তাকে আঘাত করে ভীতি ছড়ানো। এর ফলে পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি তেমন নেই, আতঙ্কিত করার উদ্দেশ্য সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
ঘটনাটা ঘটেছে গত ১২ ডিসেম্বর। একটা ব্যস্ত এলাকা তবে শুক্রবার বলে কিছুটা লোক চলাচল কম। বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায়, দিনের বেলা, জুমার পরে মোটরসাইকেল আরোহীরা গুলি করে পালিয়েছে। হাদি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি প্রচারণার কাজে বেশ কিছুদিন ধরে ব্যস্ত ছিলেন।
এ হামলা এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিকটা হলো সময় নির্বাচন। তফসিল ঘোষণার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এমন একটা হামলা, এটাকে শুধু প্রতিশোধমূলক হামলা বলে সাব্যস্ত করলে প্রকৃত দিক আড়াল হয়ে যেতে পারে। তফসিল ঘোষণার পরপরই ঘটনাটা ঘটেছে, আর নানা আশঙ্কা ও সন্দেহের পর দেশ এখন ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনকে সম্পন্ন করার প্রস্তুতিতে দাঁড়িয়ে আছে। ২৯ ডিসেম্বর থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সময়। এ সময়কে নিরাপদ এবং সন্দেহমুক্ত রাখা সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এ মুহূর্তে একজন পরিচিত মুখকে গুলি করা এক ঢিলে অনেক পাখি মারার শামিল হতে পারে। এর ফলে জনমনে আতঙ্ক বাড়বে, রাজনৈতিক পক্ষগুলো পরস্পরকে সন্দেহ করবে, পাল্টাপালটি আক্রমণ হবে, নেতা-কর্মীরা পরস্পরের প্রতি মারমুখী হয়ে উঠতে পারে। ফলে নির্বাচনি প্রচারণার ক্ষেত্রে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়বে। যার কিছুটা প্রভাব এবং দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে অস্থিরতা তৈরি করার এ এক পরিকল্পিত এবং কার্যকর অস্ত্র।
প্রশ্ন উঠতে পারে- হাদি কেন আক্রান্ত হলেন? অভ্যুত্থানের পর হাদির ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা হতে পারে কিন্তু তিনি যে একের পর এক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারতেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি জনপরিসরে দৃশ্যমান ছিলেন, শক্ত ভাষায় কথা বলতেন, গালি দিতেন। ফলে তার কথা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু যারা উত্তেজনা পছন্দ করেন তারা তার উত্তেজক ভাষাকেও পছন্দ করতেন। তার কথার সঙ্গে যেমন কিছু মানুষ একমত হয়েছেন, তেমনি অনেকে বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু এটা তো ঠিক যে, তার কথা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেত। ফলে দল না থাকলেও তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রতি আক্রমণ তাই হালকাভাবে নেওয়া উচিত হবে না। রাজনীতির ক্ষেত্রে এ যেন এক বিপজ্জনক সতর্কবার্তা। গত ১৫ বছরের ভয়ের শাসন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যেন মার খেতে যাচ্ছে। আতঙ্কের পরিবেশ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। হাদির ওপর আক্রমণ ভয় ও আতঙ্কের মাত্রা যেন বাড়িয়ে দিল।
গুলিবিদ্ধ হাদি হাসপাতালে আছেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রধান উপদেষ্টা বসেছেন তিনটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। বুঝতে চাইছেন বা বুঝাতে চাইছেন পরিস্থিতির গভীরতা। নির্বাচনের বিকল্প নেই আবার নির্বাচন নিয়ে সংশয় দূর করা যাচ্ছে না, এক জটিল সমীকরণ সমাধান করতে হচ্ছে তাকে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির দায় তিনি কোনোভাবেই এড়াতে পারবেন কি? কেউ কি নিজেকে নিরাপদ ভাবেন? এত বড় গণ-অভ্যুত্থানের পর কেন এমন পরিস্থিতি হলো তা কি বিশ্লেষণের দাবি রাখে না? অবশ্যই রাখে। কাউকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া, দলবদ্ধভাবে হামলা করা, হত্যাযোগ্য করে ফেলার ঘটনা তো ঘটছেই। এখন রাস্তায় গুলি খেয়ে মরার মতো এমন পরিবেশ কি আগে কখনো দেখেছে বাংলাদেশ? কেউ কেউ তো প্রকাশ্যেই বলছেন, হত্যা প্রচেষ্টার ঘটনা আরও ঘটতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আছে এমন কথা কয়েকদিন আগেও শোনা গেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, পুলিশ দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চাইতে সামাজিক শৃঙ্খলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মব সৃষ্টি করে হামলার ঘটনাগুলো সেই সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তিটা দুর্বল করে দিয়েছে। অভ্যুত্থানের পর তাৎক্ষণিক এমন কিছু বিষয় হতে পারে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মব তৈরি করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নিয়ে সরকারের সতর্ক থাকা, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার কাজে যথেষ্ট অবহেলা হয়েছে। ফলে যে সংকট তৈরি হয়েছে তার খেসারত বহুদিন দিতে হতে পারে।
হাদির ওপর হামলার এ দুঃখজনক ও আতঙ্কসৃষ্টিকারী ঘটনার পর আর কিন্তু অবহেলার সুযোগ নেই। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রচারণার ক্ষেত্রে আচরণবিধি মেনে চলতে যেন রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য হয়, সে পদক্ষেপ গ্রহণ এখন জরুরি। প্রয়োজনে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে কথা বলে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে দলবদলের, দলে যোগ দেওয়ার বা দল ছাড়ার ঘটনা ঘটতে পারে। এসব নিয়ে জাতীয় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে উত্তেজনাও তৈরি হতে পারে। একটা সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচনের জন্য এসব নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]
.jpg)


