মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন পূরণ হয়নি দেশের জনগণের। সে কারণেই বারবার রাজপথে নামে। ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যে অভ্যুত্থানের জন্ম দিয়েছিল, তার চেতনার বিপরীত পথে হাঁটতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই ধস নেমেছে। নির্বাচন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করে মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করা হয়েছে।...

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর দেশের মাটিতে পা রাখলেন তারেক রহমান। মায়ের অসুস্থতা, ভাইয়ের মৃত্যু, তার অনুপস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে এতদিন। এবার তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা রাজনীতিতে অনেক জটিলতার অবসান ঘটাবে, এই প্রত্যাশা সবার। দেশে প্রত্যাবর্তন সব সময় আনন্দের। নিজের দেশ পরিত্যাগ করতে চায় না কেউ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেউ যখন দেশ পরিত্যাগ করে, তখন বুঝতে হবে দেশে বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে। দরিদ্রদের জন্য দেশে টিকে থাকা কঠিন তার কাজ এবং ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা নেই বলে, ধনীদের বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হয় সম্পদের সুরক্ষার জন্য, তারা বাড়ি, ব্যাংক ব্যালান্স গড়ে তোলেন। দুর্নীতিবাজরা দেশের সম্পদ লুটপাট করে নিজেদের আখের গুছিয়ে উন্নত জীবন ভোগ করতে বিদেশে পাড়ি জমান। মধ্যবিত্তরা হাঁসফাঁস করেন আর সন্তানের উন্নত ভবিষ্যতের পথ খুঁজতে বিদেশে সন্তানকে পাঠান। কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে দেশে থাকলে জেলে পচতে হবে, না হলে মরতে হবে এ কারণে অনেকে দেশ ছাড়েন। যারা বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়েন, তাদের জন্য ফিরে আসার মতো আনন্দের আর কী আছে? যদি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে থাকেন, তাহলে আনন্দ শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকে না, দল এবং সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তারেক রহমানের ফিরে আসা এখন রাজনীতির আগ্রহের কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনীতি সমাজের পরিচালিকা শক্তি, এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। যদিও বুঝতে পারার সমস্যা আছে। অনেকে বুঝতে পারেন না, অনেকে বুঝতে চান না, অনেকে আবার বুঝেও স্বীকার করেন না যে সমাজ রাজনীতির মধ্যেই আবর্তিত হয়, তারা বলেন আমরা রাজনীতির মধ্যে নেই। কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে রাজনীতি বন্ধ করার কথা বলেন, রাজনীতিমুক্ত সমাজ গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এটাও যে একটা রাজনীতি, তা বুঝতে বেশি সময় লাগে না। ধরা পড়ে যায় তাদের জারিজুরি। রাজনীতিবিহীন সমাজের কথা বলে আসলে তারা প্রশ্নবিহীন ও প্রতিবাদহীন পরিবেশ তৈরি করতে চান। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা এবং রাজনীতি নিয়ে মানুষের ধারণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিগত রাজনীতি মানুষকে কিছুটা রাজনীতিবিমুখ করলেও মানুষ শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতেই সমাধান প্রত্যাশা করেন। গত ১৫ বছরের দুঃশাসন এবং তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের পটভূমিতেই দেশের মানুষ এখন একটা রাজনৈতিক সমাধান আশা করছেন।
সামাজিক জীব বলেই মানুষ টিকে থাকার সংগ্রামে কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করলে তা আবার শিক্ষা হিসেবে সমাজে ছড়িয়ে দেয়। হাজার বছরের অভিজ্ঞতায় মানুষ দেখেছে এবং ভাবে যে একা বাঁচা সম্ভব নয়। কিন্তু তারপরও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাকে বিচ্ছিন্ন করে সবার কাছ থেকে। কিন্তু যখন সমস্যার সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন প্রধানত নিজের এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের ভালো হোক, এটাই সাধারণভাবে মানুষ চায়। কারণ শেষ পর্যন্ত সবাই ভালো না থাকলে এককভাবে নিজের ভালো থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে। সমাজের অস্থিরতা ব্যক্তির জীবনকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশ এর এক অনন্য নজির। কিন্তু মানুষ তো শান্তি চায়। অধরা সেই শান্তি খুঁজতেই বারবার মানুষ পথে নামে। আন্দোলনের পথে অশান্তির সমাধান খুঁজতে চেষ্টা করে। একা এবং একত্রিতভাবে মানুষ চেষ্টা করে তার প্রত্যাশা পূরণের। সমাজে যেহেতু পরস্পরবিরোধী চিন্তার অবস্থান আছে, তাই বাধা থাকে পদে পদে। তাই সেসব অতিক্রম করার লড়াই করতে হয়, এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাওয়া এবং লক্ষ্যের পথে অবিচল থাকার বিকল্প নেই। প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মধ্যেও ভবিষ্যতের আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
ব্যক্তি সমাজ এবং রাজনীতিতে কিছু প্রতীক্ষার অবসান হয় কিছু প্রতীক্ষা অন্তহীন মনে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে অনেকেই ভাবতে পারেননি যে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার অবসান হবে। প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে সময়েও রাজনৈতিক কারণেই অনেকে লড়েছিলেন স্বৈরাচারীব্যবস্থা অবসানের লক্ষ্যে। অনেক মতপার্থক্য সত্ত্বেও এক প্রশ্নে একটা সাধারণ ঐক্য ঘটেছিল গণমানুষের মধ্যে। সেটা হলো স্বৈরশাসনের অবসান হোক, নির্বাচনের পথে দেশ ফিরুক, দমন-পীড়নের পথ নয়, রাজনীতিতে যুক্তিতর্ক করার পরিবেশ আসুক। গণতন্ত্রের স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে এই স্লোগান খুব উচ্চারিত হয়েছিল এবং জনগণ, বিশেষ করে তরুণ সমাজকে আকর্ষণ করেছিল, তা হলো উই ওয়ান্ট জাস্টিস। প্রতিহিংসা নয়, রাজনীতি হোক ন্যায়বিচারের। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সেই স্লোগানের বিপরীত পথেই যেন হাঁটতে শুরু করল অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশ। মব ভায়োলেন্স প্রথমে মব জাস্টিস নামে অভিহিত হতে শুরু করল, তারপর বলা হলো এসব হচ্ছে প্রেশার গ্রুপের কাজ। জনজীবনের সমস্যা সমাধানের চাইতে উত্তেজনা তৈরি করে দেশকে অস্থির করে রাখার প্রবণতা এবং নানা ধরনের চুক্তির আয়োজন করা মানুষকে ভাবিয়ে তুলছিল। একটা প্রশ্ন ভেসে বেড়িয়েছে বাতাসে, কী হচ্ছে এসব? কেউ কি দেখার নেই?
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং মৃত্যুবরণ করা রাজনীতিতে যে অশনিসংকেতের সূচনা করেছিল, তার পরবর্তী সময়ে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দেওয়া, ছায়ানট, উদীচী অফিসে আগুন দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্রনেতাদের বক্তব্য অনেক কিছু দৃশ্যমান করেছে, ভাবিয়ে তুলেছে অনেককে। দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে? নির্বাচন যাতে না হয়, সেই পরিবেশ কি তৈরি হচ্ছে? নির্বাচন না হলে কীভাবে চলবে দেশ? নির্বাচনে আমূল কোনো পরিবর্তন হবে না কিন্তু একটা জবাবদিহির পরিবেশ তো তৈরি হতে পারে। যা খুশি তা করতে পারার এই অপতৎপরতা বন্ধ না হলে কেউ যে নিরাপদ নন, তা সবাই উপলব্ধি করেছেন। বন্দুকধারী প্রহরী বা গানম্যান নেওয়ার আগ্রহ থেকে বোঝা যায় কী পরিমাণ উদ্বেগে আছেন তারা। অপবাদ দিয়ে কাউকে হত্যাযজ্ঞ করার ভীতিকর প্রক্রিয়া ছিল আগে থেকেই, এখন সেটার ভয় সংক্রমিত হয়েছে অভ্যুত্থানের সামনের কাতারে থাকা নেতাদের মধ্যেও। নির্বাচন যেন এই অবস্থার অবসান ঘটায়, সেই প্রত্যাশা মানুষের।
মনে হচ্ছে, দেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গণতন্ত্রে উত্তরণ। কিন্তু অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে দেখানোই শুধু নয়, তাচ্ছিল্য করার পদক্ষেপ লক্ষ্য করা গেছে গত কয়েক মাসে। পরাজয়ের গ্লানি থেকে মুক্ত হতে পারা সহজ নয়, ফলে স্বাধীনতাযুদ্ধকে বিতর্কিত করে যে তৃপ্তি তারা পেতে চান, সেটা তাদের হীনম্মন্যতাজনিত ব্যাপার। ক্ষমতায় যারা আছেন এবং আসবেন, তাদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। একটি দেশের আত্মপরিচয় তার মুক্তিসংগ্রামের গৌরবের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভবিষ্যৎ সরকারকে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। স্বৈরশাসন ধ্বংস করে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং কেড়ে নেয় গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করতে হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু নয়, নিরাপদে থাকার অধিকারও থাকতে হবে। বাজারকে সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করা না গেলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। পাশাপাশি অর্থনীতিকে দুর্নীতি ও লুটপাটের কবল থেকে রক্ষা করতে হবে। কৃষি ও শিল্পের বিকাশ ঘটাতে না পারলে বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে না। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই দুই ক্ষেত্রে বরাদ্দ যেমন দরকার, তেমনি বাণিজ্যিক থাবা থেকে মুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়াও দরকার। আগামী সরকারের কাছে সেই প্রত্যাশাও থাকবে মানুষের।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন পূরণ হয়নি দেশের জনগণের। সে কারণেই বারবার রাজপথে নামে। ২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যে অভ্যুত্থানের জন্ম দিয়েছিল, তার চেতনার বিপরীত পথে হাঁটতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রেই ধস নেমেছে। নির্বাচন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করে মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে দেশ যেন গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়, সেই চাওয়া এখন সবার।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]

