অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক সবচেয়ে তলানিতে পৌঁছেছে। দুই দেশের সম্পর্ক এভাবে আর কতদিন চলতে পারে, তা নিয়ে রয়েছে নানা মত। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা প্রত্যাশা করছেন বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টে যাবে। লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কূটনৈতিক প্রতিবেদক রবিউল হক
নির্বাচিত সরকারের নীতিমালা সম্পর্কের মোড় ঘোরাবে: হুমায়ুন কবির, সাবেক রাষ্ট্রদূত
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতা নেবে, তাদের একটি নীতিমালা অবশ্যই থাকবে। সে অনুযায়ী নতুন সরকার এসে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবে। এটা উভয় দেশের পক্ষ থেকেই স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দিল্লির পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে ক্রিকেট নিয়ে যে টানাপোড়েন চলছে, সেটা নিরসনেরও হয়তো উদ্যোগ নেবে দিল্লি। পারস্পরিক অপপ্রচারের বিষয়েও দুই পক্ষ চেষ্টা করলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে বাংলাদেশের সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর, যার ওপর আবার স্বাভাবিক হবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক।
সংকট কাটাতে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে: রিভা গাঙ্গুলি দাস, সাবেক হাইকমিশনার
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিক। কিন্তু একটি শ্রেণির রাজনৈতিক বক্তব্য ও ফায়দার কারণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আজ সংকটে। যেকোনো ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক বাস্তবভিত্তিক হওয়া উচিত। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেউ কারও কাছে নতজানু নয়। দুই দেশের মধ্যে এ পর্যন্ত যেসব চুক্তি হয়েছে, সেখানে নতজানুর প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। এর পরও নতজানু কথাটা বলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য। তবে বিভিন্ন সময় ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের যেকোনো নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক করতে আপত্তি নেই। সম্প্রতি ঢাকা থেকে দিল্লি সফরে আসা কূটনৈতিক রিপোর্টারদের একটি প্রতিনিধিদলকেও একই কথা বলেছেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি। এটা ভারতের অফিশিয়াল অবস্থান। কাজেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের এই অস্থিরতা কাটাতে আমাদের বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষো করতে হবে।
নির্বাচিত সরকারই পারবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে: ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আর সময় নেই ও কারণও নেই। নির্বাচনের পরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে এটা ধরে নেওয়া যায়। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হবে। ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য নেতিবাচক দৃষ্টিতে এবং সিরিয়াসভাবে নিয়েছে ভারত। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও ভারতবিরোধী বক্তব্য দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা ছিল। আবার ভারতে বাংলাদেশবিরোধী অপ্রপচার এবং দু-দেশের হাইকমিশনারকে পাল্টা তলবে সম্পর্ক তলানিতে এসেছে। তবে নির্বাচনের আগে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে লাভ হবে না। কারণ, এই সরকারের সময় আছে আর মাত্র এক মাস। কাজেই নির্বাচিত সরকারের দিকেই আমাদের তাকাতে হবে।
ঢাকা-দিল্লি সংকট সৃষ্টিতে রাজনৈতিক প্রশ্রয় আছে: শ্রুতি পাট্টানায়েক, রিসার্চ ফেলো, মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, দিল্লি
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা আগে কখনো দেখিনি। এই সংকট তৈরি করে উভয় দেশের কিছু রাজনৈতিক দল ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে। আবার সরকারের দায়িত্বশীল পদে থেকেও এই কাজটি করা হয়েছে। তারা দুই দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে নিয়ে গেছে। দুটি দেশের সম্পর্কে সব সময় উত্থান-পতন থাকে। আবার পারস্পরিক স্বার্থে একে-অপরের প্রতি নির্ভরশীলতায়ও থাকে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে। প্রতিবেশী এই দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও কাউকে বাদ দিয়ে নয়। কাজেই একে-অপরকে দূরে রেখে ভালো কিছু আশা করা যায় না। তবে বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলে একটি স্থিতিশীল সরকার আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হবে–এটাই প্রত্যাশা।
.jpg)


