যান্ত্রিকতার এ যুগেও মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায়নি, বরং তা নতুন রূপে ফিরে এসেছে। কংক্রিটের জঙ্গলে ঘেরা এ নগরীর হাজার হাজার বাড়ির ছাদ এখন ছোট ছোট সবুজ বাগানে পরিণত হয়েছে। এগুলো এখন আর শুধু শখের বাগান নয়; অর্থনৈতিক সাপোর্টের পাশাপাশি শহরের অতিরিক্ত তাপ কমাতে, বাতাসে অক্সিজেন বাড়াতে এবং পরিবেশকে কিছুটা হলেও সহনীয় করে তুলতে বেশ ভূমিকা রাখছে।...

রাজধানী ঢাকা দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন লাখো মানুষের কর্মব্যস্ততা, যানজট ও কোলাহলে মুখরিত থাকে এ শহর; কখনো থেমে থাকে না শহরের গতি। তবে ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতরেও প্রকৃতি তার অস্তিত্ব ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। যদিও মানুষের অসচেতনতার কাছে প্রকৃতি হেরে যাচ্ছে বারবার, তথাপিও চেষ্টা করছে ঘুরে দাঁড়াতে। নগরায়ণের চাপ, জলাভূমি ভরাট ও দূষণের কারণে জীববৈচিত্র্য দিন দিন সংকুচিত হলেও শহরের পার্ক, খাল, ছাদবাগান এবং রাস্তার ধারের গাছপালা, প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
এক সময়কার ‘৫২ বাজার ৫৩ গলি’র এ শহরটিতে এখন হাজার গলি, হাজার বাজারে পরিণত হয়েছে; এবং পরিণত হয়েছে কংক্রিটের জঙ্গলে। এর মধ্যেও রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সব প্রাচীন গাছ এখনো শহরের ফুসফুস হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে ভোরের আলো ফুটতেই এ গাছগুলোতে শুরু হয় পাখিদের কলতান; যান্ত্রিক শব্দের নিচে চাপা পড়লেও পথচারীরা সেই সুরে এক ধরনের প্রশান্তি খুঁজে পান।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, এ শহরের বুক চিরে বয়ে চলা খালগুলোতে ছিল স্বচ্ছ পানি, ছোট-বড় মাছ আর জলজ উদ্ভিদের সমারোহ। অথচ দখল আর দূষণের আগ্রাসনে আজ সেসব খাল মৃতপ্রায়; ম্যাপের অনেক খালই হারিয়ে গেছে, যেগুলো কোনোভাবে টিকে আছে, সেগুলো কালো দুর্গন্ধযুক্ত পানি ও আবর্জনার স্তূপে স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে। এত অবহেলার মধ্যেও প্রকৃতি পুরোপুরি হাল ছাড়েনি; কোথাও কোথাও তার অস্তিত্বের নীরব প্রতিরোধ এখনো নজরে পড়ছে। যেমন দিয়াবাড়ি বা পূর্বাচলের মতো কিছু এলাকায় শরৎ এলেই কাশফুল ফুটতে দেখা যায়। আবার শীত নামলেই দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথি পাখির ভিড়ও নজরে পড়ে চিড়িয়ানার লেকে। পাখিদের উড়ে বেড়ানো আর ডাকাডাকিতে বোঝা যায়, প্রকৃতি এখনো শহরের ভেতর প্রাণের স্পন্দন ধরে রেখেছে। এ দৃশ্যগুলো মানুষের হৃদয়কে খানিকটা হলেও শান্ত করে।
আবার রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া কিংবা জারুল গাছগুলো ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে ফুলে ফুলে ভরে লাল, হলুদ আর বেগুনি রঙে রাঙিয়ে তোলে আশপাশের ধূসর পরিবেশটাকে। তখন কংক্রিটের জঙ্গলে ঢাকা শহরটা এক মুহূর্তের জন্য হলেও বদলে সবুজ রঙিন মায়াবী নগরে পরিণত হয়।
এই সামান্য সৌন্দর্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অবহেলা আর ক্ষতির সম্মুখীন হলেও প্রকৃতি এখনো শহরটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। প্রকৃতির চেষ্টার সঙ্গে মানুষও যদি একটু সচেতন হতো, তবে এ প্রাণচাঞ্চল্যের বিস্তৃতি ব্যাপকভাবে ঘটত।
প্রকৃতির এই সামান্য ইঙ্গিতে বোঝা যায়, যান্ত্রিকতার এ যুগেও মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায়নি, বরং তা নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ঢাকা শহরের দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। কংক্রিটের জঙ্গলে ঘেরা এ নগরীর হাজার হাজার বাড়ির ছাদ এখন ছোট ছোট সবুজ বাগানে পরিণত হয়েছে। এগুলো এখন আর শুধু শখের বাগান নয়; অর্থনৈতিক সাপোর্টের পাশাপাশি শহরের অতিরিক্ত তাপ কমাতে, বাতাসে অক্সিজেন বাড়াতে এবং পরিবেশকে কিছুটা হলেও সহনীয় করে তুলতে বেশ ভূমিকা রাখছে।
এ ছাদবাগানগুলো এখন ছোট পাখি ও পতঙ্গদের জন্য হয়ে উঠেছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। টুনটুনি, চড়ুই, বুলবুলি কিংবা মৌটুসির মতো ছোট পাখিরা এসব বাগান থেকেই খাবার সংগ্রহ করছে, বাসা বাঁধছে এবং কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। যদি এ সামান্য সবুজ গাছপালা না থাকত, তাহলে এদের অস্তিত্ব মারাত্মক চ্যালেঞ্জেরে মুখে পড়ত। অথচ যদি শুরু থেকেই নগর পরিকল্পনা প্রকৃতিবান্ধব হতো, তাহলে পাখিদের খাবারের জন্য এভাবে ছাদের ওপর নির্ভর করতে হতো না।
বাস্তবতা হলো, মানুষের বসবাসের চাপে ঢাকা শহর দিন দিন প্রকৃতির জন্য অনুপযোগী হয়ে উঠছে। যেখানে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য শহরের জন্য অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা জরুরি, সেখানে ঢাকায় সবুজের পরিমাণ অত্যন্ত কম। ফলে মানুষ তো বটেই, অন্যান্য প্রাণীর টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় ছাদবাগানগুলোই প্রকৃতির শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে- যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি এখনো একে অপরের পাশাপাশি থাকার সুযোগ খুঁজে নিচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান ধুলোবালি ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে গাছপালার কোনো বিকল্প নেই; কথাটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য হচ্ছে সেই চাহিদা পূরণে রাজধানী বহু আগেই ব্যর্থ হয়েছে। তথাপিও নগরবাসীকে থেমে থাকলে চলবে না। জীববৈচিত্র্যের সমারোহ ঘটানোর জন্য জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে প্রথাগত চিন্তার বাইরে এসে ছাদবাগান, রাস্তার পাশে স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে কংক্রিটের জঙ্গলের শহরটি আবারও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পথে এগোতে পারবে।
খেয়াল রাখতে হবে ঢাকার বাস্তুসংস্থান পুনরুজ্জীবিত করতে বিদেশি আকাশমণি বা ইউক্যালিপটাস বর্জন করে বকুল, শিমুল, নিম, সোনালু ও কদমের মতো দেশি প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে। এসব গাছ স্থানীয় প্রজাতির পাখি ও পতঙ্গদের জন্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল নিশ্চিত করে এবং শহরের পরিবেশকেও টেকসই করে তোলে। পাখিদের খাদ্যসংকট দূর করতে বিভিন্ন উদ্যানে কিংবা অব্যবহৃত কোণে বট, পাকুড়, আম, জাম ও কামরাঙার মতো ফলদ বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। তাহলে খাদ্যের নিশ্চয়তা পেয়ে পাখিরা শহরেই তাদের স্থায়ী নীড় গড়ে তুলবে।
প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে জমির স্বল্পতা নিয়ে। এ ক্ষেত্রে জাপানি ‘মিয়াওয়াকি’ পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় ঘন বন তৈরি করা যেতে পারে। স্কুলের মাঠের কোণ কিংবা সরকারি অফিসের খোলা জায়গায় এ ‘পকেট ফরেস্ট’ গড়ে তুলতে হবে। তাতে ঢাকার বাতাসের মান উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বহুতল ভবনের দেয়ালে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে লম্বালম্বি বাগান বা ভার্টিকাল ফরেস্ট গড়ে তোলাও সম্ভব, যা ভবনের তাপমাত্রা হ্রাস করবে এবং ক্ষুদ্র জীবদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করবে।
গাছ লাগানোর পাশাপাশি জলাধার সংরক্ষণে কঠোর নজরদারি করতে হবে। অবশিষ্ট পুকুর ও খালগুলো অবিলম্বে খনন ও দূষণমুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নগরীর সবুজ এলাকা নষ্ট করার চেষ্টা রোধে কঠিন আইন তৈরি করতে হবে। ভবন নির্মাণের সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গায় বাগান রাখা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর বাধ্যতামূলক নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ঢাকা শুধু বসবাসের জায়গা নয়, এটি আমাদের আবেগ ও স্মৃতির শহর। কিন্তু দিন দিন এ শহর যান্ত্রিকতার দখলে চলে যাচ্ছে। তাই ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে হলে আমাদের আবার প্রকৃতির দিকে ফিরে তাকাতে হবে।
ইট-পাথরের ভিড়ে যে অল্প একটু সবুজ এখনো টিকে আছে, সেটাকে রক্ষা করতে হবে। যা আমাদের নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। ইচ্ছে করলে আমরা একটি ছোট চারাগাছ লাগিয়ে অথবা প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে সে দায়িত্বটা পালন করতে পারি। নগরবাসীকে বোঝাতে পারি যে, প্রকৃতি বাঁচলে তবেই ঢাকা বাঁচবে; আর আগামীর ঢাকা পরিণত হবে আরও সবুজ, আরও সতেজ এক শহরে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও
জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট
[email protected]
.jpg)
.jpg)
