ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, ইতিহাস কারও জন্য অপেক্ষা করে না। যে জনগোষ্ঠী নিজেকে যথার্থ জাতি হিসেবে গড়তে বিলম্ব করে, ইতিহাস সে জনগোষ্ঠীকে কেবল একটি দীর্ঘ প্রশ্নচিহ্নে পরিণত করে রাখে। আমরা আর সেটি হতে চাই না। আমাদের তরুণরা যে রক্তস্রোত আন্দোলনের মধ্যদিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তাবায়নে দেশপ্রেমিক সব রাজনৈতিক দলকে যৌক্তিক আচরণ প্রদর্শন করতে হবে প্রতিটি ক্ষেত্রে।...
বহুল প্রতিক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে রাজনৈতিক মাঠে যেন ততই দ্বন্দ্ব আর সংঘাত বেড়ে চলছে। ইতোমধ্যে প্রতিপক্ষ হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক সংঘাত থেকে আমাদের রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা কতটা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং কতটা ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছেন সেটি এক বিরাট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জুলাই আন্দোলনের রক্ত ঝরানো, ত্যাগ ও অপরিসীম ধৈর্য্য আর কষ্টসহ্য... তাই মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগায় এসবই কি বৃথা? অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ও তৎপর হতে হবে। ভোটের মাঠে আতঙ্ক দূর করতে হবে। প্রশ্ন আসছে এখনো ভোট নিয়ে এভাবে আতঙ্ক কেন? আমরা জানি এ ধরনের আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করলে ভোটাররা ভোট দিতে আবারও উৎসাহ হারাবেন।
জুলাই বিপ্লবের পর দেশে আমরা যা দেখেছি তারই চিত্র ফুটে উঠেছে সেই ১০৮ বছর আগে লেখা ‘ইস্টার ১৯১৬’ কবিতায়। বিপ্লবের দ্বৈত চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে কবিতাটিতে। একদিকে তা মুক্তির প্রতীক অন্যদিকে তা ধ্বংস, রক্তপাত ও অনিয়মের উৎস। স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। ইতিহাসের বিচারে এটি নিতান্ত কম সময় নয়। বিশ্বের অনেক দেশই এ সময়ের মধ্যেই নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সুসংহত করেছে, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নাগরিক চরিত্র গড়ে তুলেছে, আত্মমর্যাদাবোধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। কিন্তু আমাদের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে’ আমরা কি সুসংহত জাতি হয়ে উঠতে পেরেছি? এখনো কেন পারিনি? উত্তর হবে ‘নষ্ট রাজনীতি’। এ নষ্ট রাজনীতি থেকে বের হওয়ার জন্যই ছিল জুলাই বিপ্লব। কিন্তু আমাদের সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বহু ত্যাগের বিনিময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ এসেছে। কোনো অবস্থাতেই এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। বিগত তিনটি মারাত্মক বিতর্কিত ও সম্পূর্ণ আগ্রহণযোগ্য নির্বাচনে গণমানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল। ১৫৪ জন সাংসদ রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। রাতের ভোট, আমি ভোট, ডামি ভোট ইত্যাদি পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের পবিত্র অধিকারকে লুণ্ঠন করা হয়েছিল যদিও ফিজিক্যাল স্ট্রাকচারে কোথাও কোথাও কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রশ্ন আসে তারা কীভাবে দেশের আইন তৈরি করেছেন নিজেরা বেআইনি হয়ে? সেই কঠিন ও কঠোর বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি একটি উৎসবমুখর, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে অনড় অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষ আস্থা স্থাপন করেছে এ সরকারের ওপর।
দেশের রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে। এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে তারা স্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করেছে, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে, সেসব বিষয় তারা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে। তারা এ নির্বাচনের মাধ্যমে একদিকে সংসদ সদস্য নির্বাচন হবেন ৩০০ আসনে এবং প্রথম দিন থেকেই সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে। এ ১৮০ কর্মদিবসে জুলাই জাতীয় সনদের যেসব বিষয় নিয়ে গণভোট হবে, সেগুলো যদি পাস হয়, তাহলে তারা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। তারা যেহেতু লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছেন, এগুলো পূর্ণ বাস্তবায়ন করবেন বলে জনগণ বিশ্বাস করে। জনগণকে তারা যেন কোনোভাবে ধোঁকা না দেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন ধারণা ও ধারা নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান কিংবা প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে যেসব ধারণা ও প্ল্যানের কথা আমরা শুনছি সেগুলোতে নতুনত্ব কম দেখা যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনার কথা আমরা শুনছি না। নতুন বাংলাদেশ গড়ার চিন্তায় বিভোর পুরো জাতি। অথচ তা কেমনে হবে? যে সমাজে তরুণদের সংখ্যা বেশি, সেই সমাজে দ্রুত উন্নয়নের সম্ভাবনাও বেশি। কারণ তরুণরাই ঝুঁকি নিতে পারে, তরুণরাই দুঃসাহসী হতে পারে, তাদের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করতে পারে।
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, ইতিহাস কারও জন্য অপেক্ষা করে না। যে জনগোষ্ঠী নিজেকে যথার্থ জাতি হিসেবে গড়তে বিলম্ব করে, ইতিহাস সে জনগোষ্ঠীকে কেবল একটি দীর্ঘ প্রশ্নচিহ্নে পরিণত করে রাখে। আমরা আর সেটি হতে চাই না। আমাদের তরুণরা যে রক্তস্রোত আন্দোলনের মধ্যদিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তাবায়নে দেশপ্রেমিক সব রাজনৈতিক দলকে যৌক্তিক আচরণ প্রদর্শন করতে হবে প্রতিটি ক্ষেত্রে। এখানে আবেগ, নিবুর্দ্ধিতা, পেশি শক্তি, ভয়ভীতি দলের দু-চারজনকে অতি সাময়িককালের জন্য কিছু রিটার্ন হয়তো দিতে পারে কিন্তু গোট দেশ ও সমাজের জন্য তা মারাত্মক ক্যানসার। লক্ষণ সেনের যুগের দিকে না তাকালেও অতি সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতেই হবে। সেখানে ব্যত্যয় ঘটলে ইতিহাস, দেশ ও জনগণ কাউকে ক্ষমা করবে না। জুলাই অভ্যুত্থানকে আমরা নানাভাবে সমালোচনা করতে পারি কিন্তু ইয়েটসের মতো ‘অ্যা টেরিবল বিউটি ইজ বর্ন’ না বলে যেন বলতে পারি ‘অ্যা ট্রু বিউটি ইজ বর্ন’ থ্রু জুলাই আন্দোলন।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং
প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন
অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)

