সংসদের অন্দরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি বই বা একটি বক্তৃতাকে ঘিরে নয়। এটি আসলে শাসক ও বিরোধীর মধ্যকার বিশ্বাসের সংকট, সংসদীয় শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক আক্রমণের সীমারেখা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরীক্ষাক্ষণ...

অতি সম্প্রতি ভারতের সংসদের বাজেট অধিবেশনের আবহে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে ওঠে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সাম্প্রতিক একটি বক্তৃতাকে কেন্দ্র করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের সঙ্গে কংগ্রেসের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারতের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু গত সপ্তাহে শুক্রবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে সরকার আনুষ্ঠানিক নোটিস দেবে। অভিযোগ- ভারতের লোকসভায় একটি অপ্রকাশিত বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি নিয়ম ভঙ্গ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে ‘দেশ বিক্রি’ ইত্যাদি মন্তব্য করেছেন, যা সংসদের মর্যাদাহানিকর। রাহুল গান্ধীকে আজীবন নির্বাচন লড়াইয়ের বাইরে রাখার দাবিও তুলেছেন বিজেপি নেতারা।
এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নারাভানের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি Four Stars of Destiny। কংগ্রেস নেতা দাবি করেছেন, বইটিতে ২০২০ সালের ভারত-চীন সীমান্তসংকটের সময় প্রধানমন্ত্রী দায় এড়িয়েছেন, এমন ইঙ্গিত রয়েছে। বিজেপি শিবিরের অভিযোগ, এ দাবি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার প্রচেষ্টা।
‘নিয়মভঙ্গ’ অভিযোগে সরকারের নোটিস সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কিরেন রিজিজু বলেছেন, ‘তিনি (রাহুল) একটি অপ্রকাশিত বই থেকে অবৈধভাবে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এটি স্পষ্ট নিয়মভঙ্গ। পাশাপাশি বাজেট বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে দেশ বিক্রি প্রভৃতি অর্থহীন মন্তব্য করেছেন।’ তার বক্তব্য, এ আচরণ সংসদের রীতি ও মর্যাদার পরিপন্থি।
রিজিজু আরও জানান, সরকার নিজে একটি প্রস্তাব আনার কথা ভেবেছিল। কিন্তু বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে ব্যক্তিগত সাংসদ (প্রাইভেট মেম্বার) হিসেবে ‘সাবস্ট্যানটিভ মোশন’ আনায় আপাতত সরকার তার নিজস্ব প্রস্তাব স্থগিত রেখেছে। রিজিজুর ভাষায়, ‘প্রস্তাবটি স্পিকারের কাছে গৃহীত হলে আমরা লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব, এটি প্রিভিলেজ কমিটি, নাকি এথিক্স কমিটিতে পাঠানো হবে, নাকি সরাসরি সদনে আলোচনা হবে।’
সরকারি শিবিরের এ অবস্থান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, বিষয়টি নিছক রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের পর্যায়ে নেই। সংসদীয় প্রক্রিয়ার কঠোর পথ ধরেই এগোতে চাইছে বিজেপি।
সরল ভাষায়, এটি এমন একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব যা স্পিকার গ্রহণ করলে তা নিয়ে বাধ্যতামূলক আলোচনা ও ভোটাভুটি হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রস্তাব কার্যকর হয়। সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ ও সংসদীয় নিয়মাবলি মিলিয়ে লোকসভার সদস্যদের শৃঙ্খলাভঙ্গ বা গুরুতর অসদাচরণের ক্ষেত্রে বহিষ্কারের ক্ষমতা রয়েছে।
নিশিকান্ত দুবে তার নোটিসে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে ‘দেশকে অস্থিতিশীল করার ধারাবাহিক অপকর্ম’-এর অভিযোগ তুলেছেন এবং আজীবন নির্বাচনে লড়ার অযোগ্য ঘোষণাসহ বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন। যদিও আজীবন নির্বাচনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রশ্নে সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতা রয়েছে: এটি কেবল লোকসভার সিদ্ধান্তে সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞমহলে বিতর্ক আছে।
নারাভানের বই ঘিরে বিতর্ক- এই সমগ্র বিতর্কের সূচনা রাহুল গান্ধীর সেই বক্তৃতা, যেখানে তিনি জেনারেল এম এম নারাভানের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির উল্লেখ করেন। জানা গেছে, ‘ফোর স্টারস অব ডেসটিনি’ পাণ্ডুলিপিটি ২০২৩ সাল থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অনুমোদনের অপেক্ষায়। জেনারেল নারাভানে এখনো বইটি প্রকাশ করেননি এবং প্রকাশের আগেই এর পিডিএফ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ায় দিল্লি পুলিশ মামলা দায়ের করেছে।
রাহুল গান্ধী লোকসভায় বইটির একটি মুদ্রিত কপি দেখিয়েছিলেন। তার দাবি, বইয়ে সীমান্ত সংকটের সময় সরকারের ভূমিকা নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ রয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্নের মুখে ফেলাবে। বিজেপি পাল্টা অভিযোগ করে বলেছে, এই দাবি ‘অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে সাবস্ট্যানটিভ মোশনের মাধ্যমে সদস্য বহিষ্কারের নজির রয়েছে। ২০২৩ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে নগদ-প্রশ্ন কেলেঙ্কারির অভিযোগে লোকসভা এথিক্স কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সদনের ভোটে বহিষ্কার করা হয়। সে ক্ষেত্রেও সাবস্ট্যানটিও মোশন ব্যবহাত হয়েছিল।
এ ছাড়া বিরোধীরা অতীতে উপরাষ্ট্রপতি ও রাজ্যসভা চেনারম্যান জগদীপ ধানখড়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা নোটিস দিয়েছিল। বর্তমানে লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধেও অনাস্থা আনার কথা শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ, সাবস্ট্যানটিক মোশন কেবল শাসক দলের অস্ত্র নয়, বিরোধীরাও প্রয়োজনে এ পথ বেছে নিয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্পষ্টভাবে এনডিএর হাতে। ফলে স্পিকার প্রস্তাব গ্রহণ করলে এবং ভোটাভুটি হলে ফলাফল কোন দিকে যাবে, তা আন্দাজ করা কঠিন নয়। ইতোমধ্যেই রাহুল গান্ধীর বক্তৃতার কিন্তু আপ স্পিকার ‘এক্সপাঞ্জ’ করেছেন। অর্থাৎ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি ইঙ্গিত নেয়, সভাপতির দৃষ্টিতে বক্তব্যের কিছু অংশ সংসদীয় শালীনতার সীমা অতিক্রম করেছে।
তবু বহিষ্কার চূড়ান্ত ও বিরল শাস্তি। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতে চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রশ্ন উঠতে পারে অপ্রকাশিত বই থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া কি এতটাই গুরুতর অপরাধ যে তা সদস্যপদ কেড়ে নেওয়ার মতো শাস্তি ডেকে আনবে?
কংগ্রেসের পাল্টা সুর: বিজেপির কড়া অবস্থানের জবাবে রাবুল গান্ধী সাংবাদিকদের উদ্দেশে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তার বক্তব্য, ‘আপনারা এখনো পুরোপুরি বিজেপির চাকর হননি। অন্তত কিছুটা নিরপেক্ষতা দেখান। প্রতিদিন ওদের দেওয়া শব্দ নিয়ে অনুষ্ঠান চালাবেন না। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে. সি. ভেনুগোপালও বলেছেন, ‘আমরা কোনো প্রস্তাবে ভীত নই। আমাদের ফাঁসি দিতে চাইলে তাতেও প্রস্তুত।’
এ ভাষ্য থেকে স্পষ্ট, কংগ্রেস বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবেই দেখছে। তাদের অভিযোগ, সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করায় বিরোধী নেতাকে চুপ করাতে সংসদীয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
সংসদের মর্যাদা বনাম বাকস্বাধীনতা: এখানেই মূল প্রশ্ন; সংসদের মর্যাদা রক্ষার দায় ও সদস্যের বাকস্বাধীনতার সীমানা কোথায় মিলিত হয়। সাংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ সংসদ সমস্যদের বক্তব্যের স্বাধীনতা দেয়, তবে সেই স্বাধীনতা ‘সংসদের নিয়মাবলি ও স্থায়ী আদেশের অধীন। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ অবাধ নয়।
অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃতি, তা যদি সত্যিই অনুমোদনবিহীন হয় তবে তা নৈতিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। কিন্তু সেই প্রশ্ন কি রাজনৈতিক বিতর্কের মাধ্যমে মীমাংসিত হওয়া উচিত, নাকি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে? বিশেষত যখন বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সংকটের মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গে জড়িত।
আগামীর পথ: এখন নজর স্পিকার ওম বিড়লার সিদ্ধান্তের দিতে। তিনি যদি নিশিকান্ত দুবের সাবস্ট্যানটিভ মোশন গ্রহণ করেন, তবে তা নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটি অবশ্যম্ভাবী। সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রিভিলেজ কমিটি বা এথিক্স কমিটিতে পাঠানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এ সংঘাত আগামী সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিরোধী রাজনীতিকে আরও তার করবে। রাহুল গান্ধীকে ঘিরে বিজেপির আক্রমণাত্মক কৌশল যেমন সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে পারে, তেমনি কংগ্রেসও এটিকে ‘গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইবে।
সংসদের অন্দরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি বই বা একটি বক্তৃতাকে ঘিরে নয়। এটি আসলে শাসক ও বিরোধীর মধ্যকার বিশ্বাসের সংকট, সংসদীয় শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক আক্রমণের সীমারেখা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরীক্ষাক্ষণ।
শেষ পর্যন্ত রাহুল গান্ধীর সদস্যপদ থাকবে কি না, তা নির্ধারণ করবে সংখ্যার অঙ্ক ও সংসদীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু যে প্রশ্নটি বৃহত্তর সংসদের ভিতরে মতভেদের জায়গা কতটা প্রসারিত থাকবে। তার উত্তর নির্ভর করবে রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও সংযমের ওপর। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এ এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।
এথিক্স কমিটির তদন্ত: কমিটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিশদ অনুসন্ধান চালায়। প্রয়োজনে সাক্ষী ডাকা হয়, প্রাসঙ্গিক নথি খতিয়ে দেখা হয় এবং অভিযুক্ত সাংসদকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। সব তথ্যপ্রমাণ বিচার করে কমিটি একটি রিপোর্ট তৈরি করে, যেখানে সুপারিশ উল্লেখ থাকে।
লোকসভায় রিপোর্ট: এ রিপোর্ট লোকসভায় পেশ করা হয়। যদি কমিটি মনে করে সাংসদ দোষী এবং বহিষ্কারের সুপারিশ করে, তা হলে সেই সুপারিশ গ্রহণের জন্য সভায় প্রস্তাব আনা হয়। উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন গেলে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
অতীত বিতর্ক: রাহুল গান্ধীর ক্ষেত্রে আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে সরাটের একটি আদালত ফৌজদারি মানহানির মামলায় তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়। অভিযোগ ছিল, ‘মোদি’ পদবি নিয়ে মন্তব্যের জেরে এই মামলা। জন প্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-এর ৮(৩) ধারায় বলা আছে, দুই বছর বা তার বেশি সাজা হলে সাংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য ঘোষিত হন। সেই সূত্রেই তার লোকসভার সদস্যপদ খারিজ হয়।
তবে রাহুল গান্ধী পরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। শীর্ষ আদালত সাজা স্থগিত রাখায় তার সাংসদ পদ পুনর্বহাল হয় এবং তিনি ফের সংসদে যোগ দেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশিকান্ত দুবের নোটিস কতদূর গড়ায়, তা নির্ভর করবে সংসদীয় প্রক্রিয়া ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কের ওপর। তবে বিধি মেনে এগোলে বহিষ্কার সম্ভব এ কথা স্পষ্ট।
নিশিকান্ত দুবের অভিযোগ, রাহুল গান্ধী বিদেশি সংস্থা, যেমন সোরোস ফাউন্ডেশন, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, ইউএসএআইডি-এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও আমেরিকার মতো দেশে নিয়মিত সফর করেন। তার বক্তব্য, এসব যোগসূত্র দেশের স্বার্থবিরোধী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। সেই কারণেই তার সংসদীয় সদস্যপদ বাতিল এবং আজীবন নির্বাচনে লড়াইয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি তোলা হয়েছে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক
.jpg)
.jpg)
